ঢাকা , শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ , ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

​জাপানে ফের গোপন বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারের কর্মকর্তারা

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ১৬-১০-২০২৬ ০৪:২১:০১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৬-১০-২০২৬ ০৪:২৩:৪৭ অপরাহ্ন
​জাপানে ফের গোপন বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারের কর্মকর্তারা ​ছবি: সংগৃহীত
জাপানের টোকিওতে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। এটি ছিল গত এক মাসের মধ্যে তাদের দ্বিতীয় বৈঠক।

২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর যে জেনারেলদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ছিন্ন করেছিল, তাদের সঙ্গে ওয়াশিংটন পুনরায় যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। খবর রয়টার্সের।

রয়টার্সের আগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে অনুষ্ঠিত আগের আলোচনায় মূলত একজন মার্কিন ব্যবসায়ীর মুক্তি নিশ্চিত করা এবং আমেরিকানদের লক্ষ্য করে গড়ে ওঠা প্রতারণামূলক কেন্দ্রগুলো (স্ক্যাম সেন্টার) বন্ধ করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে এই আলোচনা মিয়ানমারের বিরল খনিজ সম্পদের মতো আরও বিস্তৃত বিষয়ের আলোচনার পথ প্রশস্ত করতে পারে।

এই আলোচনার বিষয়ে অবগত তিনজন ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, গত সপ্তাহের বৈঠকে ঠিক কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট নয়। বৈঠকের সংবেদনশীলতার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে একজন মার্কিন কর্মকর্তাও রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির তথ্য অনুযায়ী, টোকিওতে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের গোয়েন্দা ও গবেষণা বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল ভ্যান্স। এই আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের এক ডজনেরও বেশি কর্মকর্তা অংশ নিয়েছিলেন। তবে মিয়ানমারের পক্ষে কে প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তা রয়টার্স নিশ্চিত হতে পারেনি।

সর্বশেষ এই আলোচনার বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কোনো সাড়া দেয়নি। তবে তারা জানিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে তারা মিয়ানমারের সব পক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ বজায় রাখে। মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত সরকারের একজন মুখপাত্রও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।

আলোচনা আয়োজনে নিজেদের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইমেইলের মাধ্যমে জানায়, তারা উভয় পক্ষের সঙ্গেই ‘প্রয়োজনীয় যোগাযোগ’ বজায় রেখেছে। তবে সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক আলোচনা বা আদান-প্রদান নিয়ে তারা কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এর আগে রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, গত মাসে নেপিদোতে মাইকেল ভ্যান্স এবং মিয়ানমারের অভ্যুত্থানকারী নেতা ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের মধ্যকার বৈঠকটি আরও বিস্তৃত আলোচনার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। টোকিওতে দ্রুত পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার ঘটনাটি ইঙ্গিত দেয়, উভয় পক্ষই এই সংলাপ চালিয়ে যেতে আগ্রহী।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রচেষ্টার একটি বড় লক্ষ্য হলো—মিয়ানমারে গড়ে ওঠা প্রতারণামূলক কেন্দ্রগুলো বন্ধ করতে মিয়ানমারের সহায়তা নেওয়া। এসব কেন্দ্র থেকে রোমান্টিক প্রতারণাসহ বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতি চালানো হয়, যার মাধ্যমে আমেরিকানদের কাছ থেকে কয়েক বিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। 

গবেষকদের মতে, অনেক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড এমন সব এলাকায় পরিচালিত হয়, যা সেনাবাহিনী-সমর্থিত মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ সামরিক বাহিনীর কাছে পৌঁছায়। মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত সরকার জানিয়েছে, তারা প্রতারণামূলক কেন্দ্রগুলো দমনের লক্ষ্যে একটি বহুজাতিক প্রচেষ্টায় অংশ নিচ্ছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা মিয়ানমারে থাকা ভারি বিরল উপাদানের বিশাল মজুত নিয়ে আলোচনার সুযোগ খুঁজছেন। বৈদ্যুতিক যানবাহন থেকে শুরু করে উইন্ড টারবাইন—এমন নানা পণ্য তৈরিতে এই উপাদানগুলো ব্যবহৃত হয়। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধা রয়েছে। এই খনিজ মজুতগুলো মূলত এমন সব অঞ্চলে অবস্থিত, যা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে। এ ছাড়া মিয়ানমারের বিরল মৃত্তিকা উপাদানের প্রধান ক্রেতা চীন—তারাও হয়তো মিয়ানমারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকাকে ভালোভাবে নেবে না।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের এক ব্যবসায়ীর মেয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। ওই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দেশটির সামরিক বাহিনীকে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, এই পদক্ষেপটি মিয়ানমারের বিষয়ে তাদের নতুন কৌশলের অংশ।

স্টেট ডিপার্টমেন্ট এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে বলেছে, ‘এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে জড়িত সব পক্ষের সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে, দেশটিতে নিজেদের প্রধান স্বার্থ রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে যেসব উপায় বা কৌশল ব্যবহার করে এসেছে, সেগুলোকে নতুন করে পর্যালোচনা করার প্রতিশ্রুতিও এতে রয়েছে।’

মিন অং হ্লাইং এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘন, সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানো, পরবর্তী সময়ে গণঅভ্যুত্থান দমন করা এবং ২০১৬-২০১৭ সালে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর গণহত্যা ও তাদের দেশ থেকে বিতাড়িত করার ঘটনায় তার ভূমিকা রয়েছে—যা ওয়াশিংটন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী বিমান হামলায় হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে, যা দেশটিতে ব্যাপক গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটিয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ান থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘লোউই ইনস্টিটিউটের’ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক পরিচালক হান্টার মার্সটন মনে করেন, জাপানে সাম্প্রতিক এই আলোচনাগুলো প্রমাণ করে যে, ট্রাম্প প্রশাসন মিয়ানমারকে কেবল একটি ‘লেনদেনভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি’ থেকে দেখছে।

মার্সটন বলেন, ‘মিয়ানমারে থাকা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল মৃত্তিকা উপাদানগুলোকে সম্ভবত সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার প্রতি ওয়াশিংটনের বিশেষ আগ্রহ রয়েছে।’

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ