জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে লাতিন আমেরিকার প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমাল আইএমএফ
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
১৩-১০-২০২৬ ১১:৪২:১০ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
১৩-১০-২০২৬ ১১:৪২:১০ পূর্বাহ্ন
ফাইল ছবি
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এতে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। রয়টার্স জানায়, এ পরিস্থিতিতে চলতি বছর ও আগামী বছরের জন্য এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
সংস্থাটি বলেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার থেকে এ অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশ তেমন সুবিধা পাচ্ছে না। অথচ এআই খাতে বিনিয়োগ ও এর ব্যবহার বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের অর্থনীতিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে তৈরি জ্বালানিসংকটের ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করছে। মঙ্গলবার সকালে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে প্রকাশিত বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস প্রতিবেদনে আইএমএফ এসব তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের অর্থনীতি ২ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়তে পারে। ২০২৫ সালে এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ছিল ২ দশমিক ৫ শতাংশ। গত জুলাইয়ে ২০২৬ সালের জন্য ২ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল আইএমএফ। এবার তা কমানো হয়েছে।
২০২৭ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও ২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। তবে এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমালেও বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কিছুটা বাড়িয়েছে আইএমএফ। চলতি বছরের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ১ শতাংশ করা হয়েছে।
আইএমএফের মতে, জ্বালানি সরবরাহের পথ পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতিকে বিভিন্ন সংকটের ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করছে। তবে সব দেশ সমানভাবে এ সুবিধা পাচ্ছে না।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় অপরিশোধিত তেলের দাম এখন প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি।
জ্বালানি ও বিদ্যুতের বাড়তি খরচে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো চাপে পড়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন বেশি থাকতে পারে—এমন আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে ঋণ নেওয়ার খরচও বেড়েছে।
আইএমএফ বলেছে, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। এর মধ্যে রয়েছে, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানি করে বাড়তি আয় করা দেশগুলো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ক্ষতি কতটা পুষিয়ে দিতে পারবে।
এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর নেওয়া পদক্ষেপের ওপর মানুষের আস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। আইএমএফের ভাষ্য, এ অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশ প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার থেকে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে না। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সবচেয়ে বেশি কমিয়েছে আইএমএফ।
সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালে আর্জেন্টিনার অর্থনীতি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছিল। ২০২৬ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধি কমে ২ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। গত জুলাইয়ে চলতি বছরের জন্য ৩ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল আইএমএফ।
২০২৭ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। তবে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি কমতে পারে বলে ধারণা করছে সংস্থাটি। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আর্জেন্টিনায় মূল্যস্ফীতি ছিল ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা কমে ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে।
ব্রাজিলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়েছে আইএমএফ। ২০২৬ সালের জন্য প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে। ২০২৭ সালের পূর্বাভাস ২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৯ শতাংশ করা হয়েছে। গত জুলাইয়ে আইএমএফ আশা করেছিল, চলতি বছর ব্রাজিলের অর্থনীতি ভালো অবস্থানে থাকবে। তবে নতুন পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী বছর দেশটির অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আরও ধীর হতে পারে।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছে সংস্থাটি। মূল্যস্ফীতি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় নামিয়ে আনতে ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। পাশাপাশি সরকার আর্থিক সহায়তা কমিয়ে আনছে। বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তাও দেশটির প্রবৃদ্ধিতে চাপ তৈরি করছে।
অন্যদিকে, মেক্সিকোর ক্ষেত্রে চলতি বছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে আইএমএফ। ২০২৬ সালের জন্য দেশটির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। আইএমএফ জানিয়েছে, মেক্সিকোর রপ্তানি বাড়ার সম্ভাবনা এ পূর্বাভাসে ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত পণ্যও রয়েছে। পাশাপাশি আগামী বছর প্রবৃদ্ধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশটির বিনিয়োগ পরিস্থিতি স্থিতিশীল হতে পারে।
তবে ২০২৭ সালের জন্য মেক্সিকোর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ১ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৮ শতাংশ করা হয়েছে। আইএমএফ বলেছে, বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দেশটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা হয়ে থাকতে পারে।
আইএমএফের প্রতিবেদনে চিলি ও বলিভিয়ার অর্থনীতি নিয়েও উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চিলির অর্থনীতি ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছিল। তবে ২০২৬ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধি কমে মাত্র ০ দশমিক ৬ শতাংশ হতে পারে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালে বলিভিয়ার অর্থনীতি ১ দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হয়েছিল। ২০২৬ সালে দেশটির অর্থনীতি আরো ৩ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ।
ভেনেজুয়েলায় মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে পারে। ২০২৫ সালে দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ২৫২ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ৪৬৭ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। আইএমএফ বলেছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে এখনো বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সংস্থাটি সতর্ক করেছে, আর্থিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে এসব দেশের সরকারের ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়বে। একই সঙ্গে নিজস্ব মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হবে এবং দেশের ভেতরে ঋণ পাওয়া আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আইএমএফের মতে, জ্বালানির বাড়তি দাম, মূল্যস্ফীতি ও বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা সামলাতে দেশগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে যেসব দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাদের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স