ঢাকা , রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬ , ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২০০ কোটি টাকার উন্নয়নযজ্ঞে বদলে যাবে কুয়াকাটার চেহারা

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১১-১০-২০২৬ ০৩:৩০:৪৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১১-১০-২০২৬ ০৩:৩০:৪৭ অপরাহ্ন
২০০ কোটি টাকার উন্নয়নযজ্ঞে বদলে যাবে কুয়াকাটার চেহারা কচ্ছপখালী খাল ঘিরে নতুন ভাবনা। ছবি ফোকাস বাংলা
একদিকে সমুদ্রের নীল জলরাশি, অন্যদিকে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের অপার সৌন্দর্য। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে রাখাইন সংস্কৃতি, লেম্বুর বন, কচ্ছপখালী খালসহ বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশ। দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটাকে ঘিরে তাই বাড়ছে মানুষের আগ্রহ। বাড়ছে পর্যটকের চাপ, বাড়ছে নাগরিকসেবার চাহিদাও। এই বাস্তবতায় কুয়াকাটা পৌরসভায় চলছে প্রায় ২০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। সড়ক, ড্রেনেজ, পানি সরবরাহ, সাইক্লোন শেল্টার, খাল পুনঃখনন, ফুটপাত ও সৌন্দর্যবর্ধনসহ নানা খাতে বাস্তবায়ন হচ্ছে একাধিক প্রকল্প। পটুয়াখালীর পর্যটন সমৃদ্ধ কলাপাড়া উপজেলায় এই উন্নয়ন কাজ সম্পাদন হলে বদলে যাবে কুয়াকাটার চেহারা। আধুনিক কুয়াকাটা গড়তে এই উন্নয়নের যেন বিকল্প নেই।

কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে উপকূলীয় শহর জলবায়ু সহিষ্ণু প্রকল্প (সিটিসিআরপি)-এর আওতায় ১২০ কোটি টাকা, ইউআইআইপি কুয়েত প্রজেক্টে ৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, এসইউইউআইডিপি টেকসই উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টে ২৫ কোটি টাকা, এডিপির ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) মাধ্যমে ৪৮ কোটি টাকার কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে কিছু কিছু প্রকল্পের উন্নয়ন কাজ ডিপিপি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কোন কোন কাজের দরপত্র সম্পাদন করা হয়েছে।

বদলে যাচ্ছে পৌরসভার অবকাঠামো

সূত্রমতে, সিটিসিআরপি প্রকল্পের আওতায় কুয়াকাটার বিভিন্ন এলাকায় চলছে সড়ক ও ড্রেনেজ অবকাঠামোর উন্নয়ন। পরিবেশগত প্রশমন কাজে ব্যয় হচ্ছে ১৪ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। ইউনিব্লকের মাধ্যমে উন্নয়ন করা হচ্ছে প্রায় পৌনে চার কিলোমিটার সড়ক। রাখাইন পল্লী কেরানীপাড়ার অভ্যন্তরে ৪৮৫ মিটার আরসিসি রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে দেড় কোটি টাকা। ৯ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪ কিলোমিটার ২৪৫ মিটার সড়কে করা হচ্ছে বিটুমিনাস কার্পেটিং।

উপকূলীয় দুর্যোগ মোকাবিলায়ও নেওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। পাঞ্জুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তিনতলা বিশিষ্ট সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ২৮ লাখ ৩ হাজার ৬৭৩ টাকা। মীরাবাড়ি মাদ্রাসায় তিনতলা সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৫ কোটি ৩৭ লাখ ১১ হাজার ৫৩৯ টাকা।

এ ছাড়া প্রায় ৮০০ মিটার সড়কের আরসিসি নির্মাণকাজ চলছে। ৩ কিলোমিটার ৭১০ মিটার আরসিসি ড্রেন ও ফুটপাথ নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৫ কোটি ৪৮ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। তিনটি আরসিসি আর্চ ব্রিজ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ কোটি ৪ লাখ ৮২ হাজার টাকা। দুটি আবাসনে ৫৮৮ মিটার দীর্ঘ সড়ক নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৮০ লাখ টাকা।

কচ্ছপখালী খাল ঘিরে নতুন ভাবনা

প্রশাসক ইয়াসীন সাদেক জানান, কুয়াকাটার উন্নয়নে পর্যটকের মূল আকর্ষণ হবে কচ্ছপখালী লেকের সৌন্দর্যবর্ধণ প্রকল্প। যা ইতোমধ্যে ডিপিপিভুক্ত করা হয়েছে। কুয়াকাটা পৌরশহরের প্রাণখ্যাত প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ কচ্ছপখালীর ড্রেণেজ খালকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে এমন বড় পরিকল্পনা। ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে খালটি পুনঃখনন, পাড় সংরক্ষণ, ওয়াকওয়ে, বেঞ্চ ও ঘাটলা নির্মাণ, প্যাডল বোট সরবরাহ এবং বৃক্ষরোপণসহ সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে।

কুয়াকাটার অন্যতম সৌন্দর্যময় খাল হিসেবে পরিচিত কচ্ছপখালীকে রক্ষার পাশাপাশি পর্যটকদের কাছে এটিকে একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে সমুদ্রসৈকতের বাইরে পর্যটকদের জন্য কুয়াকাটায় নতুন বিনোদনকেন্দ্র তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া পৌরসভার প্রাণকেন্দ্রে লতাচাপলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের খাস পুকুরের চারদিকে ওয়াকওয়ে ও ঘাটলা নির্মাণসহ সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৬৪ লাখ ১৩ হাজার টাকা। পশ্চিম কুয়াকাটায় ডিবিএল ল্যান্ড-সংলগ্ন খাস জমিতে শিশুপার্ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি টাকা। এসব বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে কুয়াকাটার চেহারা বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া দোভাষীপাড়া ব্রিজ পর্যন্ত সড়কে এবং সমুদ্রবাড়ি রিসোর্ট থেকে নীলাঞ্জনা সড়ক পর্যন্ত ড্রেনের ওপর প্রশস্ত ফুটপাত নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ৪২ লাখ ১০ হাজার টাকা।

নিরাপদ পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাতেও বড় বিনিয়োগ

পর্যটন শহরের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ নিরাপদ পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। এ খাতেও চলছে বড় ধরনের অবকাঠামোগত কাজ। কুয়াকাটা পৌরসভায় নিরাপদ পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ডিপিএইচইর উদ্যোগে ৮টি পরীক্ষামূলক নলকূপ নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ১৫ লাখ ১৩ হাজার ৭০০ টাকা। চারটি উৎপাদক নলকূপে ৯৭ লাখ ৭৬ হাজার ২৯২ টাকা এবং চারটি পাম্প হাউস নির্মাণে ৯৯ লাখ ১৬ হাজার ৪৬৬ টাকা ব্যয় হচ্ছে।

এ ছাড়া ৮ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৪২ লাখ ৪৭ হাজার ২০ টাকা। যার কাজ চলমান রয়েছে। এক হাজার গৃহসংযোগ বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৩ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। প্রক্রিয়াধীন রয়েছে একটি গ্রাউন্ড ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, ওভারহেড ওয়াটার ট্যাংক, ২ কিলোমিটার সঞ্চালন পাইপলাইন ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
উন্নয়নের সঙ্গে প্রয়োজন পর্যটনবান্ধব পরিকল্পনা ।

কুয়াকাটা হোটেল মোটেল ওনার্স এসোসিয়েশন সভাপতি মোতালেব শরীফ বলেন, ‘প্রায় ২০০ কোটি টাকার চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কুয়াকাটার অবকাঠামোতে পরিবর্তনের উজ্জল সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে পর্যটননগরীর ভবিষ্যৎ বিকাশের জন্য শুধু সড়ক-ড্রেনেজ নির্মাণই যথেষ্ট নয়। পর্যটকের বিনোদন, হাঁটার পরিবেশ, রাতের নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।’

কুয়াকাটা উন্নয়ন ফোরামের অন্যতম সদস্য ও কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে কুয়াকাটায় একটি দৃষ্টিনন্দন ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা যেতে পারে। পৌরসভা বাসস্ট্যান্ড থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ওয়াকওয়ে, বৃক্ষরোপণ এবং দৃষ্টিনন্দন সড়কবাতি স্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে। এতে পর্যটকদের হাঁটার নিরাপদ ও আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি হবে।’

কুয়াকাটা ট্যুর গাইড এসোসিয়েশন সভাপতি ও পরিবেশ কর্মী কেএম বাচ্চু বলেন, এছাড়াও জিরো পয়েন্ট চৌরাস্তা থেকে লেম্বুর বনাঞ্চল সৈকত পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ সড়কটি সৌরবিদ্যুৎচালিত বাতির মাধ্যমে আলোকিত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ জন্য অন্তত ১ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে পৌরসভার সব সড়কে সৌরবাতি স্থাপন করা হলে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি কুয়াকাটার রাতের সৌন্দর্যও বাড়বে। এটির বাস্তবায়ন জরুরি।

কুয়াকাটার পর্যটন বিকাশ এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ, নিরাপত্তা, নাগরিকসেবা ও পর্যটন ব্যবস্থাপনাকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনা জরুরি। চলমান প্রায় ২০০ কোটি টাকার প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রয়োজন বিবেচনায় নতুন অবকাঠামো যুক্ত করা গেলে কুয়াকাটাকে আরও আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও পর্যটকবান্ধব শহর হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।

এখানকার সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ কুয়াকাটাকে পরিকল্পিতভাবে আধুনিক পর্যটনকেন্দ্রে উন্নীতের জন্য সরকার সকল ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কুয়াকাটা পৌরসভাকে প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীতের কাজ চলছে। একটি আধুনিক মানের ফায়ার সার্ভিস স্টেশন নির্মাণে চুড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে জায়গা চিহ্নিত করা হয়েছে।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ