ঢাকা , রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬ , ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বনের গাছ ও পাহাড় কেটে তৈরি হচ্ছে রিসোর্ট

পাহাড়ের বুকে ক্ষত!

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১১-১০-২০২৬ ০৩:০২:৩১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১১-১০-২০২৬ ০৩:০২:৩১ অপরাহ্ন
পাহাড়ের বুকে ক্ষত! ছবি : সংগৃহীত
পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ালে চারদিকে কেবল সবুজের সমুদ্র। দূরে পাহাড়ের সারি। কোথাও মেঘের ভেলা, কোথাও গভীর খাদ। নিচে ঝিরি-ছড়া, ঝর্ণার কলকল শব্দ। এই নিসর্গই বান্দরবানে পর্যটন ব্যবসার সবচেয়ে বড় পুঁজি। আর সেই পুঁজি ঘিরেই পাহাড়ের বুকে গড়ে উঠছে একের পর এক রিসোর্ট, কটেজ ও মাচাংঘর।

পাহাড়ের একটুকরো জায়গা থাকলেই যেন সেখানে রিসোর্ট গড়ে তোলার সুযোগ। পাহাড়ের চূড়ায়, ঢালে, পাহাড়ের কিনার ঘেঁষে আর ন্যাড়া পাহাড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠছে রং-বেরঙের কটেজ। নাম দেওয়া হচ্ছে ‘ইকো রিসোর্ট’। অথচ পরিবেশবান্ধব পর্যটনের ধারণার সঙ্গে এসব স্থাপনার বাস্তবতার  বিস্তার ফারাক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিকাংশ স্থানে প্রাকৃতিক ঢাল কেটে নির্মাণ করা হয়েছে সড়ক ও প্ল্যাটফর্ম। আবার অনেক স্থাপনায় নেই পরিকল্পিত বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা। ফলে প্রকৃতিকে উপভোগ করতে গিয়ে প্রকৃতির ওপরই বাড়ছে চাপ।

কারো জায়গার কাগজপত্র রয়েছে, কারো তাও নেই। জেলা প্রশাসনের কাছে নামমাত্র আবেদন।

সেই আবেদনের ভিত্তিতেই বছরের পর বছর চলছে পর্যটন ব্যবসা। অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর ধরে ‘ম্যানেজ’ প্রক্রিয়ায়  নির্মাণ করা হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ কটেজ ও রিসোর্ট।

এদিকে পাহাড়ের জমি ব্যবহারের ধরনেও রয়েছে বৈচিত্র্য। কোথাও রাবার বাগান বা হর্টিকালচারের নামে লিজ নেওয়া পাহাড়ে গড়ে উঠেছে পর্যটন স্থাপনা, আবার কোথাও দখল করা খাস পাহাড়েও নির্মাণ করা হয়েছে রিসোর্ট ও কটেজ।

স্থানীয়রা জানায়, বান্দরবানে এখন যেখানে পাহাড়, সেখানেই রিসোর্ট—এমন প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এসব স্থাপনার বড় অংশের বৈধতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। কারো হাতে জেলা প্রশাসনের কাছে করা আবেদনপত্র, কারো ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স; কেউ আবার বছরের পর বছর ধরে ব্যবসা করছেন অনুমোদন ছাড়াই। ফলে ‘কাগজ আছে, আবার কাগজ নেই- এমন অদ্ভুত ব্যবস্থার মধ্যেই পাহাড়ে বাড়ছে রিসোর্ট ব্যবসা।

পর্যটন সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে পাঁচ শতাধিক  রিসোর্ট, কটেজ ও মাচাংঘর গড়ে উঠেছে। অথচ জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী অনুমোদিত হোটেল ও রিসোর্টের সংখ্যা ৭৯। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র ৩২টির। ফলে বিপুলসংখ্যক স্থাপনার বৈধতা ও অনুমোদন নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা।

সম্প্রতি বান্দরবান সদর, লামা, আলীকদম, রুমা, থানচি, রোয়াংছড়ি ও নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন পর্যটন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ভালো ভিউ পয়েন্ট পাওয়া যায়- পাহাড়ের এমন চূড়া বা ঢালই এখন রিসোর্ট ব্যবসার প্রধান লক্ষ্য। কোথাও পাহাড়ের কিনার ঘেঁষে ঝুঁকিপূর্ণ মাচাংঘর, কোথাও ইট-কংক্রিট আবার বাঁশ-কাঠ-ছন দিয়ে কটেজ। সামান্য জায়গা পেলেই নির্মাণ করা হচ্ছে টংঘর।

পর্যটকদের কাছে এসব কটেজে রাতপ্রতি ভাড়া পাঁচ হাজার থেকে শুরু করে অবস্থান ও সুযোগ-সুবিধাভেদে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত। বাঁশ, ছন ও টিনের ছোট মাচাংঘরের ভাড়াও ১২০০ থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। এভাবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঘিরে চলছে কোটি টাকার পর্যটন বাণিজ্য।

লামার মিরিঞ্জা এলাকায় রিসোর্টের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। মিরিঞ্জা ভ্যালি রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী জিয়াউর রহমান বলেন, এলাকায় প্রায় ৮৯টি রিসোর্ট রয়েছে। এসবের অনেকেই ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করছেন। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন বা ফায়ার সার্ভিসের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই অনেকের।

লামা রিসোর্ট মালিক সমিতির আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন রফিক বলেন, ‘এখানে মোট কতটি রিসোর্ট বা কটেজ রয়েছে,  তার হিসাব আমাদের কাছেও নেই। সমিতি থাকলেও কেউ কারো  কথা শুনছে না।’

রিসোর্ট গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে জমির ব্যবহার নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। রিসোর্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্তদের তথ্যমতে, মিরিঞ্জা পাহাড় এলাকার অনেক জমি বিভিন্ন সময়ে রাবার প্লান্টেশনের জন্য লিজ নেওয়া হয়েছে। পরে কোনো কোনো জায়গায় জুমঘর বা ছোট কাঠামো নির্মাণ করে পর্যটকদের আকর্ষণ করা শুরু হয়। কোথাও খাস পাহাড় দখল করে রিসোর্ট-কটেজ নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে। 

পরিবেশবিদ উয়ই সিং বলেন, পাহাড় কাটা, গাছ কাটা ও ঝিরি-ছড়া ভরাটের কারণে নষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। একই সঙ্গে ধ্বংস হচ্ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। রিসোর্টের বর্জ্য নদী-নালা ও ঝিরিতে মিশে যাওয়ায় পানি দূষিত হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের বান্দরবান শাখার সভাপতি জুয়ামলিয়ান আমলাই বলেন, গত কয়েক বছরে বড় বড় পাহাড়ের চূড়ায় একের পর এক ‘ইকো’ নামের রিসোর্ট ও কটেজ গড়ে উঠেছে। অনেকেরই পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন নেই। এভাবে চলতে থাকলে কটেজের নামে পাহাড়ি এলাকা অপরিকল্পিতভাবে ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠবে। দ্রুত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করা প্রয়োজন।

রিসোর্টগুলোর বর্জ্য ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাপনাও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক স্থাপনায় পর্যাপ্ত ডাস্টবিন নেই। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন ও খাবারের প্যাকেট পড়ে থাকছে পাহাড়ের ঢাল, খাদ ও ঝিরির পাশে। কোথাও বর্জ্য পোড়ানোর অভিযোগও রয়েছে।

লামার ইয়াংছা পাড়ার বাসিন্দা মংচিং মার্মা জানান, রিসোর্টের বর্জ্য ঝিরি ও ছড়ায় গিয়ে পড়ায় তাদের একমাত্র পানির উৎস দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে। রান্নাসহ দৈনন্দিন কাজে বাধ্য হয়ে সেই পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে।

মিরিঞ্জাসহ নতুন পর্যটন স্পটগুলোর অনেক রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণ করা হয়েছে কাঠ, বাঁশ, ছন ও টিন দিয়ে। কিন্তু এসব স্থাপনার অনেকগুলোতেই নেই নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা। দুর্গম পাহাড়ে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যাওয়ার মতো সড়কও নেই।

বান্দরবান জেলা ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. আবদুল মান্নান আনসারী বলেন, জেলায় ঠিক কয়টি হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে, তার সঠিক তথ্য নেই। তবে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নবায়ন করেছে প্রায় ৬০টি হোটেল-রিসোর্ট।

সহকারী পরিচালক বলেন, কাঠ, বাঁশ, ছন ও টিনের অনেক কটেজে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। দুর্গম পাহাড়ে অগ্নিনির্বাপণ যান চলাচলের উপযোগী সড়ক না থাকায় আগুন লাগলে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়বে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের বান্দরবান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক নুর হাসান সজীব বলেন, জেলায় ৩২টি রিসোর্ট পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়েছে। তবে আইনি কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে বাকি রিসোর্টগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির আলোকে ২০১৪ সালের ২৮ আগস্ট তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে স্থানীয় পর্যটন খাতকে হস্তান্তর করা হয়,  কিন্তু এক যুগ পার হলেও পর্যটন স্থাপনা ও ব্যবস্থাপনায় জেলা পরিষদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এখনও নেই।

অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে এবিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাম্যাচিং। তবে পর্যটনশিল্পের বিকাশে নানা প্রতিবন্ধকতার কথা স্বীকার করেন জেলা পরিষদ সদস্য লুসাই মং মারমা। তিনি বলেন, পর্যটনশিল্পের প্রসারে বিদ্যমান বাধা দূর করতে প্রশাসন ও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে কাজ করার চেষ্টা করছে জেলা পরিষদ।

বান্দরবান জেলা প্রশাসক মো. সানিউল ফেরদৌস বলেন, বান্দরবানে পর্যটন করপোরেশন বা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের আলাদা স্থানীয় কার্যালয় নেই। ফলে হোটেল-রিসোর্টের বিষয়গুলো জেলা প্রশাসন ও পার্বত্য জেলা পরিষদ দেখভাল করে।

জেলা প্রশাসক বলেন, বর্তমানে ৭৯টি হোটেল ও রিসোর্ট অনুমোদন নিয়েছে। বাকি হোটেল-রিসোর্টগুলোকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়ার জন্য অক্টোবর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ