দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে ডাকাতিয়া
বদলে গেছে নদীর চেহারা
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১১-১০-২০২৬ ০১:৩৯:৩০ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১১-১০-২০২৬ ০১:৪৪:০৪ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
একসময় খরস্রোতা ডাকাতিয়া নদী ছিল চাঁদপুরের নৌযোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। নদীপথে চলাচল করতো যাত্রীবাহী লঞ্চ, পণ্য পরিবহনে চলতো শত শত নৌকা ও মালবাহী ট্রলার। দুই পাড়জুড়ে ছিল খোলা পরিবেশ ও স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। নদীর দুই পাড় দখল করে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, দোকানপাট, রিসোর্ট, ঘরবাড়ি ও কলকারখানাসহ নানা স্থাপনা। দখল-দূষণে সংকুচিত হয়ে নদীটি এখন অস্তিত্বের সংকটে।
নদীর বিভিন্ন স্থানে অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় কোথাও সংকুচিত হয়েছে এর প্রস্থ, কোথাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। কমেছে নাব্যতা, তৈরি হচ্ছে ভরাট ও চর জাগার প্রবণতা। নদীর গতিপথের পরিবর্তনে কোথাও কোথাও দেখা দিচ্ছে ভাঙন। বছরের পর বছর ধরে এসব দখল চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। যদিও এরই মধ্যে ৭৩৬টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ অবস্থায় ডাকাতিয়া নদীকে দখলমুক্ত করতে বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযানের উদ্যোগ নিয়েছে চাঁদপুর জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন ও জেলা নদী রক্ষা কমিটির সিদ্ধান্তের পর যৌথ জরিপে চাঁদপুর বড়স্টেশন মোলহেড থেকে গাছতলা ব্রিজ পর্যন্ত নদীর দুই পাড়ে ৭৩৬টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। চলতি মাসের মধ্যেই এসব স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রশাসন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় ডাকাতিয়া নদী ছিল চাঁদপুরের নৌপথে যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। যাত্রীবাহী লঞ্চের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে অসংখ্য নৌযান চলাচল করতো এ নদীতে। কিন্তু কয়েক দশকে নদীর দুই পাড়ে একের পর এক স্থাপনা গড়ে ওঠায় বদলে গেছে নদীর চেহারা।
চাঁদপুর শহরের বাসিন্দা জামিলুর রহমান বলেন, ‘ডাকাতিয়া নদী আগে অনেক প্রশস্ত ছিল। যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করতো। কিন্তু কয়েক দশক ধরে নদীর দুই পাড়ে প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে জায়গা দখল করে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। এ কারণে নদী এখন সংকুচিত হয়ে গেছে। বিআইডব্লিউটিএ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কার্যকর কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। কোথাও কোথাও সংস্থাটির কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে প্রভাবশালীরা সরকারি জায়গা দখল করেছেন এবং এখনও করছেন।’
চাঁদপুর সরকারি কলেজের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী তানজিম হাসান বলেন, ‘চাঁদপুর শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ডাকাতিয়া নদী শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু নদীর পাড় দখল ও চ্যানেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এর স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে নদীকে আগের রূপে ফিরিয়ে আনা হোক।’
আরেক শিক্ষার্থী হাসিবুর রহমান বলেন, ‘বিভিন্ন স্থানে নদীতে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। দখল ও দূষণের কারণে ডাকাতিয়া অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। নদীটিকে দখল ও দূষণমুক্ত করার দাবি জানাই।’
নদী রক্ষায় উচ্ছেদ অভিযান যেন লোকদেখানো কর্মসূচিতে পরিণত না হয়, সে দাবি জানিয়েছেন পরিবেশ আন্দোলনকর্মীরা। তাদের ভাষ্যমতে, শুধু অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে দিলেই হবে না; দখলদারদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে খনন বা ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নিতে হবে।
স্থানীয় পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ও বাবুরহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মোশারেফ হোসেন বলেন, ‘উচ্ছেদ অভিযান যেন লোকদেখানো কার্যক্রমে পরিণত না হয়। আইনি প্রক্রিয়ায় নদী দখলদারদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে খনন করে ডাকাতিয়া নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।’
চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘যারা ডাকাতিয়া নদী ও এর তীর অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন, তাদের সবাইকে উচ্ছেদ করতে প্রশাসনকে বলা হয়েছে। দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে উচ্ছেদ করা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
ডাকাতিয়া নদী দখলমুক্ত করতে এবার বড় পরিসরে অভিযানের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। আদালতের আদেশ ও জেলা নদী রক্ষা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যৌথ জরিপের মাধ্যমে অবৈধ স্থাপনার সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে।
চাঁদপুর বিআইডব্লিউটিএর উপপরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘চাঁদপুর পৌর এলাকার বড়স্টেশন মোলহেড থেকে গাছতলা ব্রিজ পর্যন্ত নদীর দুই পাড়ে ৭৩৬টি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় শিগগিরই উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হবে।’
তিনি জানান, শুধু পৌর এলাকার এই অংশেই নয়, ডাকাতিয়া নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে চাঁদপুর থেকে শাহরাস্তি পর্যন্ত নদীর পাড়ে ধাপে ধাপে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
নদীর সীমানা পুনর্দখল ঠেকাতে বড়স্টেশন মোলহেড থেকে গাছতলা ব্রিজ পর্যন্ত ইতিমধ্যে ৬২টি সীমানাখুঁটি স্থাপন করা হয়েছে। আরও ২৮টি সীমানাখুঁটি স্থাপনের কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
চাঁদপুর জেলা নদী রক্ষা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, ‘ডাকাতিয়া নদীকে দখল ও দূষণমুক্ত করার বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। অনেক সময় দখলমুক্ত করার পরও একই জায়গা আবার দখল হয়ে যায়। এবার যাতে এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে জন্য পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। আমরা এখন হোমওয়ার্ক করছি। এই মাসের মধ্যেই আমরা উচ্ছেদ অভিযানে যাবো।’
এই নদীটি আসলে চাঁদপুরের প্রাণ উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ‘দখল পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি নদীকে দূষণমুক্ত করার চেষ্টা করা হবে। ইতিমধ্যে নদী দূষণকারীদের বিরুদ্ধে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি স্থানে কচুরিপানার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সেসব কচুরিপানা অপসারণ করে নদীকে সচল ও গতিশীল করার পরিকল্পনাও আছে।’
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স