মণিপুরে নাগা-কুকি সংঘর্ষ, ২৪ ঘণ্টায় নিহত বেড়ে ৯
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
১১-১০-২০২৬ ০১:৩০:০৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১১-১০-২০২৬ ০১:৩০:০৫ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
ভারতের মণিপুর রাজ্যের তিন জেলায় নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষে ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ছয়জন নাগা, দুজন কুকি এবং একজন নেপালি বংশোদ্ভূত ব্যক্তি। কর্মকর্তাদের ও স্থানীয় গ্রাম স্বেচ্ছাসেবকদের তথ্য অনুযায়ী, কামজং ও কাংপোকপি জেলায় চারজন করে এবং উখরুল জেলায় একজন নিহত হয়েছেন।
রোববার (১১ অক্টোবর) হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়, এ প্রাণহানির ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এদিকে দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেছেন মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচাঁদ সিং। বৈঠকের পর তিনি বলেছেন, ‘রাজ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা এগিয়ে নিতে সরকার তার সংকল্পে অটল রয়েছে।’
মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে জানায়, মুখ্যমন্ত্রী নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের হত্যাকাণ্ড এবং সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং শান্তি-শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে অবিলম্বে ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন।
কামজং জেলায় সংঘর্ষ
শুক্রবার রাতে নাগা-অধ্যুষিত কামজং জেলার চাসাদ থানার কাছে নিরাপত্তা বাহিনী ও একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলির সময় ৪২ বছর বয়সী এক কুকি নারী নিহত হওয়ার পর সহিংসতা শুরু হয়।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, চাসাদ থানার কাছে নির্মিত অবৈধ বাংকার ধ্বংস করতে রাজ্য পুলিশ, ইন্ডিয়ান রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন (আইআরবি) ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) অভিযান চালায়। এ সময় একদল নারী অভিযান ব্যাহত করার চেষ্টা করেন। কর্মকর্তারা তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় অজ্ঞাত হামলাকারীরা নিরাপত্তাকর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। জবাবে নিরাপত্তাকর্মীরাও পাল্টা গুলি চালান বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পাঁচ সন্তানের মা ডমখোনেই তৌথাং সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।’ কুকি সম্প্রদায়ের নারীদের নিয়ে গঠিত নাগরিক সংগঠন কুকি উইমেন ইউনিয়নের দাবি, ২৩ বছর বয়সী কুকি যুবক মাইকেল এনগামমিনলেন হাওকিপকেও গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে দুই সম্প্রদায়ের সদস্যদের অন্তত ১৪টি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় অজ্ঞাত ব্যক্তিরা। শনিবার সকালেও সহিংসতা অব্যাহত থাকে। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে প্রাথমিক সংঘর্ষস্থল থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে নিংচৌ চিন্ডং গ্রামে দুই নাগা গ্রামরক্ষী নিহত হন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের ওপার থেকে আসা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এ হামলায় জড়িত থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করা হয়নি। তদন্ত চলছে।’
কাংপোকপিতে সহিংসতা
প্রতিবেশী কাংপোকপি জেলায় শনিবার ভোর ৫টার দিকে মাকুই গ্রামে হামলায় তিন নাগা গ্রামরক্ষী নিহত হন বলে কর্মকর্তারা ও ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। কুকি-জো অধ্যুষিত জেলা হলেও কাংপোকপিতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নাগা জনগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, নিহত গ্রামরক্ষীদের একজনের শরীর বিকৃত করা হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে এক গ্রামরক্ষীর বিকৃত মরদেহের পাশে রাইফেল হাতে একদল পুরুষকে দেখা যায়। ভিডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি হিন্দুস্তান টাইমস।
এর প্রায় এক ঘণ্টা পর মাকুই গ্রামকে সহায়তা করতে তাপোন থেকে যাত্রা করা নাগা গ্রাম স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় সন্দেহভাজন কুকি সশস্ত্র সদস্যরা। তাপোন থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে এ হামলায় থালোন গ্রামের ৩৫ বছর বয়সী মাচুংওয়াংবৌ নিহত হন। আহত হন আরও দুই স্বেচ্ছাসেবক।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অজ্ঞাত সশস্ত্র ব্যক্তিদের হামলার মুখে মাকুই গ্রাম রয়েছে- এমন খবর পেয়ে স্বেচ্ছাসেবকেরা সেখানে যাচ্ছিলেন। পথে আগে থেকে ওত পেতে থাকা সন্দেহভাজন কুকি সদস্যরা তাদের ওপর হামলা চালায়।
কর্মকর্তারা জানান, আহত দুই স্বেচ্ছাসেবক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাদের চিকিৎসার জন্য সেনাপতি জেলা সদর দপ্তরে নেয়া হয়েছে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ওই এলাকায় গোলাগুলি চলছিল বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সহিংসতা বাড়তে থাকায় কুকি সংগঠন কমিটি অন ট্রাইবাল ইউনিটি (কোটিইউ) শনিবার থেকে কাংপোকপি জেলায় ২৪ ঘণ্টার সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করে।
উখরুলে যাত্রী নিহত
অন্য একটি ঘটনায় শনিবার সকালে উখরুল জেলার কনজাং গ্রামে অজ্ঞাত সশস্ত্র হামলাকারীদের অতর্কিত হামলায় এক যাত্রী নিহত হন। এর আগে একই দিনে কুকি ও নাগা সম্প্রদায়ের মোট ৪৮ জন বেসামরিক নাগরিককে দুই সম্প্রদায়ের যেকোনো এক পক্ষের লোকজন জিম্মি করে। দুই দিন পর উভয় সম্প্রদায়ের ১৪ জন করে মুক্তি পান। তবে ১৪ জন কুকি ও ছয়জন নাগা তখনও আটক ছিলেন।
জিম্মিদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ২৭ দিন ধরে বিক্ষোভ চলার পর ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল (ইউএনসি) এবং অন্যান্য নাগা নাগরিক সংগঠন ৯ জুন ১৪ জন কুকি বেসামরিক নাগরিককে মুক্তি দেয়। কিন্তু ১০ জুন ছয় নাগা জিম্মির ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার হলে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স