ঢাকা , শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬ , ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বদলাচ্ছে কৃষকের ভাগ্য

এক বাজারেই দিনে অর্ধকোটি টাকার জলপাই বিক্রি

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১০-১০-২০২৬ ০৩:৫৭:৪৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১০-১০-২০২৬ ০৪:১৩:২৫ অপরাহ্ন
এক বাজারেই দিনে অর্ধকোটি টাকার জলপাই বিক্রি ছবি : সংগৃহীত
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার দেবদারুতলায় প্রতিদিন বসছে জলপাইয়ের বিশাল বাজার। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্ষুদ্র চাষি, ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের পদচারণায় মুখর থাকছে পুরো এলাকা। প্রতিদিন গড়ে ৫০ লাখ টাকার জলপাই কেনাবেচা হচ্ছে এ বাজারে। লাভজনক হওয়ায় বাড়ছে জলপাই বাগানের পরিধি, সৃষ্টি হচ্ছে কর্মসংস্থান, আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা।

উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় মৌসুমি ফলের বাজার হিসেবে পরিচিত দেবদারুতলায় জলপাইয়ের পাশাপাশি কেনাবেচা হচ্ছে জাম্বুরা, কলা, পেঁপেসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল। তবে এ বাজারের মূল আকর্ষণ জলপাই। আকার, মান ও স্বাদের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ এলাকার জলপাইয়ের চাহিদা রয়েছে। প্রতিদিন এখান থেকে বিপুল পরিমাণ জলপাই দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, প্রতিদিন দেবীগঞ্জের এ বাজারে ৭০ থেকে ১০০ টন জলপাই কেনাবেচা হয়। প্রকারভেদে প্রতি কেজি জলপাই বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ৪০ টাকায়। প্রায় এক হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী স্থানীয় বাগান থেকে জলপাই সংগ্রহ করে বাইরের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেন। সড়ক ও রেলপথে পরিবহনের সুবিধা থাকায় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে জলপাই কিনতে আসেন।

মৌসুম শুরুর আগেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ব্যবসায়ীরা বাগানমালিকদের অগ্রিম টাকা দিয়ে জলপাই বাগান কিনে নেন। ফল পরিপক্ব হলে শ্রমিক দিয়ে বাগান থেকে জলপাই সংগ্রহ করে নিজেদের আড়তে নিয়ে যান তারা। এতে কৃষকদের ফল সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণের ঝামেলা কমে যায়। একই সঙ্গে আগাম অর্থ পাওয়ায় অনেক বাগানমালিকের আর্থিক নিরাপত্তাও তৈরি হয়।

আশ্বিনের শুরুতে বাজারে জলপাই আসতে শুরু করে। মৌসুমের শেষ পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। লাভজনক চাষ ও সহজ বিপণনব্যবস্থার কারণে দেবীগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় নতুন নতুন জলপাই বাগান গড়ে উঠছে। এসব বাগান ও বাজারকেন্দ্রিক কার্যক্রমে স্থানীয় বেকার ও কর্মহীন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

দেবীগঞ্জের জলপাই বাগানের মালিক আমিরুল ইসলাম বলেন, প্রায় ১৫ বছর ধরে তিনি জলপাই চাষ ও বাজারজাত করছেন। পরিচর্যা ও ঝুঁকি তুলনামূলক কম হওয়ায় মৌসুমে জলপাই বিক্রি করে যে আয় হয়, তা দিয়ে তার সারা বছরের খরচ চলে যায়। বড় বড় আচার কোম্পানির প্রতিনিধিরা মানসম্মত জলপাই কেনার জন্য তাকে আগাম টাকা দেন। মৌসুম শুরু হলে চুক্তি অনুযায়ী তাদের কাছে জলপাই সরবরাহ করেন তিনি।

জলপাই কিনতে চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা ব্যবসায়ী মোমিনুল হক বলেন, দেবীগঞ্জের জলপাই আকার ও স্বাদে ভালো হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা রয়েছে। মৌসুমজুড়ে এখান থেকে জলপাই কিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করেন তিনি। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজারে জায়গার সংকট, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাব, চাঁদাবাজি ও অতিরিক্ত মাসুল আদায়ের কারণে তাদের নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধান এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো গেলে বাইরের ব্যবসায়ীদের আগ্রহ আরও বাড়বে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আব্দুল মতিন বলেন, দেবীগঞ্জে ছোট-বড় অসংখ্য জলপাই বাগান রয়েছে। নতুন নতুন বাগানও গড়ে উঠছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় চাহিদা এবং ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে জলপাই চাষের আগ্রহ বাড়ছে। চলতি বছর পরিমিত বৃষ্টিপাতের কারণে ফলন ভালো হয়েছে। এতে কৃষকরা আশাতীত লাভের মুখ দেখবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

কৃষি বিভাগ জানায়, জলপাইয়ের পাশাপাশি ড্রাগন ফল, মাল্টা, কমলা, পেয়ারা ও জাম্বুরা চাষেও এ অঞ্চলে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এসব ফলের চাষ সম্প্রসারণে কৃষকদেরকে পরামর্শ দেয়ার পাশাপাশি তদারকিও বাড়ানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেবদারুতলার জলপাই বাজারের অবকাঠামো ও বিপণনব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা এবং পরিবহন সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আয় আরও বাড়বে। এতে দেবীগঞ্জের জলপাই বাজার শুধু স্থানীয় অর্থনীতিই নয়, দেশের মৌসুমি ফলের বাণিজ্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ