পূজা এলেই ব্যস্ততা, তারপরই অনিশ্চিত জীবন
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১০-১০-২০২৬ ০৩:২৫:২৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১০-১০-২০২৬ ০৩:২৫:২৩ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
লালমনিরহাটের কিসমত চোঙ্গাদারা গ্রামের ২০টি পরিবারের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন মৃৎশিল্প। প্রায় ১০০ বছর ধরে পূর্বপুরুষের পেশা আঁকড়ে থাকলেও বিশেষ মাটির সংকট, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি আর প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে এখন টিকে থাকাই দায়। পূজা এলেই ব্যস্ততা বাড়ে, কিন্তু সেই আয় দিয়ে মেটে না সংসারের চাহিদা। লোকসান আর ঋণের বোঝায় অনেকে পেশা ছেড়ে চলে গেছেন ঢাকায়। ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে অবশিষ্ট পরিবারগুলো।
সদর উপজেলার হারাটি ইউনিয়নের কিসমত চোঙ্গাদারা গ্রামের ২০টি পরিবারে বাস করেন প্রায় ১০০ জন মানুষ। এদের আয়-রোজগারের একমাত্র ভরসা এই মৃৎশিল্প। পূজা এলেই এই বাড়িগুলোতে শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। বয়োবৃদ্ধরা যখন পরম মমতায় মাটির চাকা ঘোরাতে ব্যস্ত, তখন তাদের সাহায্য করছে পরিবারের শিশুটিও। আর নারীরা ব্যস্ত তুলির আঁচড়ে মাটির সামগ্রী রঙিন করতে। নারী-পুরুষ ও শিশুদের এই সম্মিলিত অংশগ্রহণে এলাকাটিতে ফুটে উঠেছে আবহমান বাংলার এক অপরূপ গ্রামীণ সংস্কৃতি।
তবে পূজার এই ব্যস্ততার আড়ালেই লুকিয়ে আছে মৃৎশিল্পীদের দীর্ঘশ্বাসের গল্প। মাটির তৈরি পণ্যের চাহিদা এখন আর আগের মতো নেই। যে বিশেষ মাটি দিয়ে এসব সামগ্রী নিখুঁতভাবে তৈরি হয়, তা লালমনিরহাটে সহজলভ্য নয়। বাধ্য হয়ে রংপুরের শ্যামপুর থেকে চড়া দামে কিনে আনতে হয় এই মাটি। মাটি কেনা থেকে শুরু করে পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করা পর্যন্ত যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়, অনেক সময় সেই উৎপাদন খরচ ওঠানোই দায় হয়ে পড়ে। ফলে সামান্য আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বী এই পরিবারগুলো।
পেশার বর্তমান অবস্থা নিয়ে ৫৫ বছর বয়সি মৃৎশিল্পী উপেন চন্দ্র রায় বলেন, বাপ-দাদার আমল থেকে এই কাজ করে আসছি। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই এ কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছি। তবে প্লাস্টিকের বাজার আসায় আমাদের পণ্যের চাহিদা একদম কমে গেছে। আগে হোটেল-রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন দোকানে মাটির জিনিসের কদর ছিল, এখন সব প্লাস্টিকের দখলে। বেচাবিক্রি কমে যাওয়ায় এই কাজ করে যেটুকু আয় হয়, তা দিয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছি।
মৃৎশিল্পী শ্রীমতী জোনাকি জানান তার হতাশার কথা। তিনি বলেন, মাটির কাজ দিয়ে বর্তমান সংসার চালানো খুব কষ্টকর হয়ে গেছে। মাটি না থাকলে কাজ বন্ধ থাকে, আর এখন এই মাটি পাওয়াই কঠিন। আগামী দিনগুলো যে কী হবে জানা নেই। শুধু পূজা এলেই আমরা দলবদ্ধভাবে কাজ করি। ঐতিহ্যটাকে তো বাঁচিয়ে রাখতে হবে, তাই যতদিন চলে এভাবেই কাজ করে যেতে চাই।
একসময় গ্রামীণ ক্ষুদ্র এলাকায় পূজা উপলক্ষে মন্দিরের আশপাশে মেলা বসত। মাটির হাঁড়ি-পাতিল, ব্যাংক আর খেলনার পসরা সাজিয়ে বসতেন শিল্পীরা। এখন সেই মেলার জৌলুস যেমন কমেছে, তেমনি আধুনিক ও সস্তা প্লাস্টিকের খেলনার কারণে মাটির পণ্যের চাহিদা একেবারে তলানিতে। লোকসানের ভার সইতে না পেরে বাধ্য হয়ে অনেকে বাপ-দাদার শত বছরের এই পেশা ছেড়ে পাড়ি জমাচ্ছেন ঢাকায়।
বয়োজ্যেষ্ঠ মৃৎশিল্পী শ্রীমতী মনীষা বলেন, বিয়ের পর এই পরিবারে এসে কাজগুলো শিখেছি। আগে অনেক ব্যস্ত থাকতাম। এখন আর আগের মতো সম্ভব হচ্ছে না। অনেক পরিবারের সন্তানরাই এই কাজ ছেড়ে ঢাকায় চলে গেছে। বাজারে চাহিদা নেই, মাটিও ঠিকমতো পাওয়া যায় না। এনজিও থেকে টাকা ধারদেনা করে মাটি কিনে এনে পূজার সময়টাতে কাজ করি আমরা।
গত কয়েক বছরের ক্ষতির কথা উল্লেখ করে মৃৎশিল্পী শ্রী পরেশ বলেন, গত দুই বছর আমরা ঠিকভাবে মেলা করতে পারিনি। নতুন করে কাজ শুরু করতে মাটি ও রং কিনতে হয়, যা ধারদেনা করেই করতে হচ্ছে। সরকারের অনেক সুযোগ-সুবিধার দপ্তর থাকলেও আমাদের কাছে তা পৌঁছায় না। সন্তানদের লেখাপড়া, পরিবারের চিকিৎসা আর খাদ্যের জোগান দেওয়া এখন বড়ই কষ্টকর। সরকারের উচিত আমাদের এই শিল্প ও মানুষগুলোর দিকে নজর দেওয়া।
শত প্রতিকূলতার মাঝেও যে কয়েকটি পরিবার মাটি কামড়ে পড়ে আছেন, তাদের উদ্দেশ্য একটাই- পূর্বপুরুষদের স্মৃতি আর ঐতিহ্যবাহী এই কর্মকে বাঁচিয়ে রাখা। প্রতি বছর পূজা এলেই তারা নতুন উদ্যমে কাজে নেমে পড়েন। তবে এখনই প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক সহযোগিতা না পেলে হয়তো একদিন সত্যিই হারিয়ে যাবে আবহমানকালের এই মৃৎশিল্প।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মুহ. রাশেদুল হক প্রধান বলেন, লালমনিরহাটের প্রতিমার কারিগররা আসলেই অভাব-অনটনে দিন পার করছেন। আমরা এলাকায় ঘুরে ঘুরে দেখেছি। তাদের মধ্যে আর্থিক সংকট আছে আমরা সেটি জানতে পেয়েছি। বিষয়টি আমরা সরকারের নিকট তুলে ধরব। পরবর্তীতে তারা যেন আর্থিক সহায়তা পান।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স