ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬ , ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

​হুরাসাগরে ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ, বদলে গেল ছয় যুবকের ভাগ্য

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০৮-১০-২০২৬ ০৪:৫০:০০ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৮-১০-২০২৬ ০৪:৫০:০০ অপরাহ্ন
​হুরাসাগরে ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ, বদলে গেল ছয় যুবকের ভাগ্য ​ছবি: সংগৃহীত
পাবনার বেড়া উপজেলার বৃ-শালিখা পয়েন্টে হুরাসাগর নদের বুকে ভাসছে ১৩০টি খাঁচা। এসব খাঁচায় চাষ হচ্ছে রুই, কাতল, কই ও মনোসেক্স তেলাপিয়া। নদীর স্রোতে দুলতে থাকা এই ভাসমান খামার বদলে দিয়েছে ছয় যুবকের ভাগ্য। তাদের সাফল্য দেখে উপজেলার অনেক বেকার যুবকও আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

সরেজমিনে বৃ-শালিখা ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, হুরাসাগর নদের স্বচ্ছ পানিতে সারি সারি ভাসমান খাঁচা। প্লাস্টিকের ড্রামের ওপর লোহার ফ্রেম তৈরি করে তার ভেতরে নাইলনের জাল বসানো হয়েছে। সেই জালের মধ্যেই বেড়ে উঠছে হাজার হাজার মাছ। ডিঙ্গি নৌকায় দাঁড়িয়ে চাষিরা মাছকে খাবার দিচ্ছেন। খাবার পেতেই মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁক বেঁধে ছুটে আসছে মাছ। নদীর পাড়ের মানুষের কাছেও ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষের এই দৃশ্য এখন বেশ আকর্ষণীয়।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, বেড়া উপজেলায় বর্তমানে একমাত্র বৃ-শালিখা পয়েন্টেই বাণিজ্যিকভাবে খাঁচায় মাছ চাষ হচ্ছে। সেখানে ছয়জন চাষি ১৩০টি খাঁচায় মাছ চাষ করছেন।

চাষিরা হলেন বৃ-শালিখা গ্রামের মো. সালিমুল ইসলাম, এ. এম. এমদাদুল হক পান্না, সান্যাল পাড়ার মো. মিলন মোল্লা, একই এলাকার মো. মাহাবুব আলম, বনগ্রামের মো. মনিরুজ্জামান ও হাটুরিয়ার মো. আব্দুল মুন্নাফ। প্রত্যেকের বাড়ি বেড়া উপজেলা এলাকায়। হুরাসাগর নদে বৃ-শালিখা ঘাটসংলগ্ন এলাকায় তাদের খামার রয়েছে।

খাঁচার আকার ও খরচ সম্পর্কে চাষি মো. সালিমুল ইসলাম জানান, এখানে দুই ধরনের খাঁচা ব্যবহার করা হয়। ছোট খাঁচার দৈর্ঘ্য সাত মিটার, প্রস্থ চার মিটার ও গভীরতা তিন মিটার। বড় খাঁচার দৈর্ঘ্য আট মিটার, প্রস্থ পাঁচ মিটার ও গভীরতা তিন মিটার। লোহার অ্যাঙ্গেল, প্লাস্টিকের ড্রাম ও নাইলনের জাল দিয়ে এসব খাঁচা তৈরি করা হয়। একটি খাঁচা তৈরিতে ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। আকার ও উপকরণের ওপর নির্ভর করে খরচ কম-বেশি হয়ে থাকে।

তিনি আরও জানান, এই পদ্ধতিতে পুকুরের তুলনায় রোগবালাই অনেক কম হয়। নদীর চলমান পানিতে মাছ দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং মাছের স্বাদও ভালো থাকে।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এসব খাঁচায় মূলত মনোসেক্স তেলাপিয়া, রুই, কাতল ও কই মাছ চাষ করা হয়। এসব মাছ দ্রুত বড় হয় এবং বাজারে চাহিদাও বেশি। প্রতিটি খাঁচায় এক হাজার থেকে দুই হাজার পোনা ছাড়া হয়। নিয়মিত পরিচর্যা ও সুষম খাবার দিলে চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিটি মাছ ৬০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের হয়। এরপর তা বাজারজাত করার উপযোগী হয়ে ওঠে। বছরে দুই থেকে তিনবার মাছ বিক্রি করতে পারেন চাষিরা।

একেকটি খাঁচা থেকে দুই থেকে তিন লাখ টাকার মাছ বিক্রি করা সম্ভব। পাবনা, সিরাজগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় এসব মাছের চাহিদা তুলনামূলক বেশি এবং বাজারদরও ভালো। চলমান নদীতে চাষ হওয়ায় মাছের গুণগত মানও ভালো বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

বেড়ায় খাঁচায় মাছ চাষের ইতিহাস সম্পর্কে মৎস্য অফিস জানায়, ২০১৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম খাঁচায় মাছ চাষ শুরু হয়। নানা জটিলতা, প্রশিক্ষণের অভাব ও বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে কিছুদিন পর তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০১৮ সালে উপজেলা মৎস্য অফিসের নতুন উদ্যোগে পুনরায় বাণিজ্যিকভাবে এই পদ্ধতিতে মাছ চাষ শুরু হয়। এরপর থেকে সফলভাবে এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ হয়ে আসছে।

খাঁচা পদ্ধতিতে মাছ চাষের কারণে নদীর পানি দূষিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জানান, দূষণের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এটি একটি চলমান নদী হওয়ায় পানি সবসময় প্রবাহিত থাকে। ফলে বর্জ্য জমে থাকার সুযোগ কম। এছাড়া উপজেলা মৎস্য অফিস থেকে নিয়মিত খাঁচা পরিদর্শন করা হয়। ব্যবহৃত জাল পরিষ্কার রাখা হচ্ছে কি না এবং কী ধরনের খাদ্য ব্যবহার করা হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করে চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়। পরিবেশবান্ধব খাদ্য ব্যবহারে তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।

সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে মৎস্য অফিস জানায়, আগে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে চাষিদের প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহায়তা দেওয়া হতো। বর্তমানে ওই প্রকল্প না থাকায় সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে নিয়মিতভাবে চাষিদের কারিগরি পরামর্শ, রোগবালাই দমন এবং আধুনিক চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

মৎস্য চাষি মো. মিলন মোল্লা জানান, খাঁচায় মাছ চাষ একটি অত্যন্ত লাভজনক পেশা। তবে বর্তমানে মাছের খাদ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। প্রতি বস্তায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় লাভ কিছুটা কম হচ্ছে। তিনি বলেন, "খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকলে এবং সরকারি সহজ শর্তে ঋণ ও ভর্তুকি পেলে বেড়ায় ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে। হুরাসাগর নদে আরও শত শত খাঁচা করার সুযোগ আছে। এটি দেশের আমিষের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং বহু বেকারের কর্মসংস্থান হবে।"

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এইচকে/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ