ঢাকা , মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতে একের পর এক ঐতিহাসিক মসজিদ ভাঙার হিড়িক

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ২৯-০৯-২০২৬ ০৬:০৭:৩৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৯-০৯-২০২৬ ০৬:০৭:৩৬ অপরাহ্ন
ভারতে একের পর এক ঐতিহাসিক মসজিদ ভাঙার হিড়িক ​ছবি: সংগৃহীত
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সড়ক প্রশস্তকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সরকারি প্রকল্পের আওতায় ধর্মীয় স্থাপনা অপসারণ নিয়ে বিতর্ক চলছে। 

এর মধ্যেই মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো শাহী মসজিদের একটি অংশ অপসারণকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করেছে। এ ঘটনায় ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তুরস্কের বেসরকারি সংবাদ সংস্থা ইহলাস নিউজ এজেন্সি (আইএইচএলএএস)-এর প্রতিবদনের বরাতে এ তথ্য জানা যায়।

উজ্জয়িনীর শাহী মসজিদের একটি অংশ অপসারণের সময় স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। 

পুলিশ বলছে, একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তাকর্মীদের লক্ষ্য করে পাথর ছোড়েন। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে।

মসজিদের একটি অংশ ভেঙে রাস্তা প্রশস্ত করার উদ্যোগের প্রতিবাদে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাত থেকে বিপুলসংখ্যক মুসলিম বাসিন্দা সেখানে অবস্থান নেন। 

সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকালে প্রশাসন ওই অংশ অপসারণের প্রক্রিয়া শুরু করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বাধে।

পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তাকর্মীদের লক্ষ্য করে পাথর ছোড়েন। এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। এ ঘটনায় ১৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং পাথর ছোড়াসহ সংঘর্ষের ঘটনায় সাতটি মামলা করা হয়েছে। 

সংঘর্ষে কারা জড়িত ছিলেন, তা শনাক্ত করতে নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজ ও আকাশ থেকে ধারণ করা ভিডিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং মসজিদের চারপাশে ব্যারিকেড দিয়ে চলাচল সীমিত করা হয়েছে।

উজ্জয়িনী প্রশাসন বলছে, পুরো শাহী মসজিদ ভাঙা হচ্ছে না। সড়ক প্রশস্তকরণের নির্ধারিত অংশের মধ্যে পড়া মসজিদের একটি ছোট অংশ অপসারণ করা হচ্ছে। 

উজ্জয়িনীর জেলা প্রশাসক রোশন সিং জানিয়েছেন, ওই অংশটি মসজিদ কমিটির সম্মতিতে সরানো হচ্ছে।

পুলিশ বলছে, মসজিদের যে অংশটি প্রকল্পের আওতায় পড়েছে, তা মোট মসজিদ চত্বরের ১০ শতাংশেরও কম। মসজিদ কমিটি প্রথমে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর ওই অংশ সরাতে সম্মত হয়েছিল। 

পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরো মসজিদ ভেঙে ফেলার দাবি ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজনা বাড়ে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

কেন মসজিদের অংশ সরানো হচ্ছে 

উজ্জয়িনীর শাহী মসজিদের অংশ অপসারণের কাজটি একটি বড় সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের অংশ। ২০২৮ সালের সিংহস্থ ধর্মীয় সমাবেশকে সামনে রেখে শহরের সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে। ওই প্রকল্পের আওতায় সড়কটি ১৫ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রশাসনের দাবি, সিংহস্থ উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক মানুষ উজ্জয়িনীতে আসবেন। তাদের চলাচল, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সড়ক প্রশস্ত করা প্রয়োজন। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টও মসজিদের অংশ অপসারণের বিরুদ্ধে করা আবেদন খারিজ করার সময় জননিরাপত্তা ও যাতায়াত ব্যবস্থাপনার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছে।

৬০০ বছরের পুরোনো মসজিদ নিয়ে আপত্তি

মুসলিম প্রতিনিধিদের দাবি, শাহী মসজিদটি প্রায় ছয় শতাব্দী বা ৬০০ বছরের পুরোনো এবং ওয়াকফ সম্পত্তি। মসজিদের যে অংশটি সরানোর কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে নামাজের কক্ষের একটি অংশ, প্রায় ১২০ ফুট উঁচু মিনার ও মাজহার চৌক এলাকার অংশ রয়েছে।

মসজিদ কমিটি ও স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দারা বলছেন, মসজিদ অক্ষত রেখে রাস্তার বিপরীত পাশ থেকে জমি নিয়ে সড়ক প্রশস্ত করা সম্ভব। তাদের প্রশ্ন, বিকল্প ব্যবস্থা না নিয়ে ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনার অংশ কেন সরাতে হবে।

মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি মোহাম্মদ জাকির বলেন, তারা মসজিদটি রক্ষার চেষ্টা করছেন। এ কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে রাতভর মসজিদ এলাকায় অবস্থান করেন।

ইমাম মোহাম্মদ ইব্রাহিমও ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষার দাবি জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, এর আগে সড়ক প্রশস্ত করার কাজে সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে আশপাশের দোকান ও অন্যান্য সম্পত্তি ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

আদালতেও গড়িয়েছে বিরোধ

শাহী মসজিদের অংশ অপসারণের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ইন্দোর বেঞ্চে আবেদন করে আদালতের দ্বারস্থ হয় মসজিদ কমিটি।। ৯ সেপ্টেম্বর আদালত ওই আবেদনগুলো খারিজ করে দেয়। আদালত বলেছে, উজ্জয়িনী পৌর কর্তৃপক্ষ আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।

আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, একই সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের আওতায় এরই মধ্যে ১০টি মন্দির ও একটি মসজিদের অংশ অপসারণ করা হয়েছে। 

উজ্জয়িনীতে প্রায় ৮০টি ধর্মীয় স্থাপনা-সংক্রান্ত নির্মাণের বিরুদ্ধেও কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিয়েছে বলে আদালত উল্লেখ করেছে। আদালত আরও বলেছে, শুধু ধর্মীয় স্থাপনা হওয়ার কারণে কোনো স্থাপনা আইনসম্মত উন্নয়ন প্রকল্পের আওতার বাইরে থাকবে—এমন নয়।

মুসলিম বাসিন্দাদের আপত্তি

স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দা ও মসজিদ প্রতিনিধিরা অবশ্য মসজিদের অংশ অপসারণের বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের দাবি, মসজিদ অক্ষত রেখে সড়কের বিপরীত পাশ থেকে জমি নিয়ে রাস্তা প্রশস্ত করার বিকল্প রয়েছে।

মসজিদ রক্ষার দাবিতে স্থানীয় মুসলিমদের একটি অংশ রাতভর সেখানে অবস্থানও করেন। পরে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর মসজিদ কমিটি ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সরানোর বিষয়ে সম্মত হলেও বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ অব্যাহত থাকে।

ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙা নিয়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিতর্ক

উজ্জয়িনীর ঘটনা ভারতে ধর্মীয় স্থাপনা ও মুসলিমদের সম্পত্তি অপসারণ নিয়ে চলমান বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে। 

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে আসাম, দিল্লি, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশে ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও বিক্ষোভের পর ১২৮টি সম্পত্তি ভাঙার তথ্য নথিবদ্ধ করা হয়। 

এসবের মধ্যে মুসলিমদের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থান ছিল। সংস্থাটি বলেছে, এসব ঘটনায় অন্তত ৬১৭ জন ক্ষতিগ্রস্ত হন।

অ্যামনেস্টি এসব ভাঙাকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ও শাস্তিমূলক উচ্ছেদ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তবে এটি সংস্থাটির নিজস্ব গবেষণা ও মূল্যায়ন—ভারতীয় কর্তৃপক্ষের স্বীকৃত সরকারি পরিসংখ্যান নয়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৫ সালের ভারতবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের কয়েকটি রাজ্যে মুসলিমদের বাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া ভেঙে ফেলার ঘটনা ঘটেছে। 

সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে, ২০২৪ সালের নভেম্বরে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বাড়িঘর ভাঙার আগে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের নির্দেশনা দেয়।

সড়ক প্রশস্তকরণেও মসজিদ-মাজার অপসারণ

সড়ক প্রশস্তকরণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ধর্মীয় স্থাপনা অপসারণের সাম্প্রতিক আরও কিছু ঘটনাও সংবাদে এসেছে। এসব ক্ষেত্রে অবশ্য কর্তৃপক্ষ সাধারণত সরকারি জমি, রাস্তার নির্ধারিত সীমানা বা কথিত অবৈধ নির্মাণ অপসারণকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

২০২৬ সালের জুনে গুজরাটের আহমেদাবাদে সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের আওতায় তিনটি মাজার ও একটি কবরস্থানের অংশ অপসারণের খবর প্রকাশ করে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। 

প্রশাসনের বক্তব্য ছিল, স্থাপনাগুলো সরকারি জমিতে ছিল এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

২০২৬ সালের মে মাসে ফরিদাবাদে সড়ক ও দ্রুতগতির রেলপথ প্রকল্পের জন্য একটি মসজিদ ও একটি মন্দিরসহ ধর্মীয় স্থাপনা অপসারণের খবরও প্রকাশ করে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। 

সেখানে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ আগাম নোটিশ না পাওয়ার অভিযোগ করেন। কর্তৃপক্ষ অবশ্য স্থাপনাগুলোকে কথিত অবৈধ নির্মাণ হিসেবে উল্লেখ করে।

বারাণসীতেও সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের আওতায় মসজিদ অপসারণের ঘটনা সামনে এসেছে। 

টাইমস অব ইন্ডিয়া ২০২৬ সালের জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে জানায়, একটি মসজিদের অংশ স্বেচ্ছায় ভেঙে ফেলার কাজ শুরু হয়। 

একই প্রকল্পে এর আগে আরও পাঁচটি মসজিদ পুরোপুরি বা আংশিকভাবে অপসারণ করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

উজ্জয়িনীতে এখনো উত্তেজনা

শাহী মসজিদের অংশ অপসারণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পর উজ্জয়িনীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। 

পুলিশ জানিয়েছে, সংঘর্ষে জড়িতদের শনাক্ত করতে সিসিটিভি ও আকাশ থেকে ধারণ করা ভিডিও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব বা উসকানিমূলক তথ্য ছড়ানোর বিষয়ও তদন্ত করা হচ্ছে।

পুলিশের দাবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরো শাহী মসজিদ ভেঙে ফেলার কথা বলে কৃত্রিমভাবে তৈরি কিছু ভিডিও ছড়ানোর পর উত্তেজনা বেড়ে যায়। 

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাস্তবে সড়ক প্রশস্তকরণের আওতায় পড়া মসজিদের একটি অংশই অপসারণ করা হচ্ছে।

তবে মসজিদ কমিটি ও স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দাদের কাছে মূল বিষয় হলো ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনাটির অংশ সংরক্ষণ। 

অন্যদিকে প্রশাসন ২০২৮ সালের সিংহস্থকে সামনে রেখে উন্নয়ন প্রকল্প এগিয়ে নেয়ার কথা বলছে। আদালতও বর্তমানে সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের আইনগত প্রক্রিয়াকে অনুমোদন করেছে।

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচকে/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ