সামিটের নেতৃত্বে সাবমেরিন ক্যাবলের অবৈধ কনসোর্টিয়াম
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
২৬-০৯-২০২৬ ০১:৪৭:১৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৬-০৯-২০২৬ ০১:৪৭:১৬ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
দেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থায় বিকল্প সংযোগ বা ‘রিডান্ডেন্সি’ তৈরি এবং পাইকারি ব্যান্ডউইথ বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বেসরকারি পর্যায়ে সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সামিট, সিডিনেট ও মেটাকোরকে লাইসেন্স দেওয়া হয়। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এ লাইসেন্স দেয়।
গণমাধ্যম-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের এক সূত্র ধরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ এই তিন প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়টি তদন্তের জন্য ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে বিটিআরসিকে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
তবে চিঠি দেওয়ার দুই সপ্তাহেও সাড়া দেয়নি বিটিআরসি। ইতোমধ্যে সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত সামিট গ্রুপ, পলাতক সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলি আরাফাত ও নাফিজ শরাফতের সিডিনেট এবং পলাতক সাবেক এমপি ও রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের ছেলের মেটাকোর বিরুদ্ধে উঠে এসেছে আরো বড় একটি অভিযোগ। সামিটের নেতৃত্বে এই তিন প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক সংযোগে রিডান্ডেন্সি সৃষ্টির যে উদ্দেশ্যে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, ব্যবসায়িক স্বার্থে তার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর অবৈধ এক কনসোর্টিয়াম গঠন করেছে।
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে ৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এই বিভাগের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের এক বক্তব্যের সূত্র ধরে অনুসন্ধান শুরু করে আমার দেশ। যেখানে বের হয়ে আসে অবৈধ কনসোর্টিয়াম গঠনের এই চাঞ্চল্যকর চিত্র। সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেন, তিনটি প্রতিষ্ঠানকে তিনটি আলাদা লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। তারা যে কনসোর্টিয়ামটি করেছে, তা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া। এককভাবে লাইসেন্স পাওয়ার পর একীভূত হয়ে যৌথ ব্যবসা পরিচালনা করা নিয়মবহির্ভূত।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত
টেলিযোগাযোগ খাতের শ্বেতপত্র প্রণয়ন টাস্কফোর্সের প্রধান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. কামরুল হাসানের কাছে কনসোর্টিয়ামের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি মেসেজে জানান, এ বিষয়ে শ্বেতপত্রে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনটি প্রতিষ্ঠান পৃথক লাইসেন্স নিয়ে পরবর্তী সময়ে কনসোর্টিয়াম গঠন করে একটি মাত্র সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন করছে। অথচ বিটিআরসি চাইলে তিনটি পৃথক লাইসেন্সের পরিবর্তে একটি লাইসেন্স দিতে পারত। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে একাধিক লাইসেন্স দেওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ওপর সরকারের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা তলব
অবৈধ এই কনসোর্টিয়াম গঠনের বিষয়ে গত ২৩ আগস্ট বিটিআরসির কাছে ব্যাখ্যা তলব করেছে মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ স্বাক্ষরিত পত্রে পৃথকভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত তিনটি প্রতিষ্ঠানকে কনসোর্টিয়াম গঠনের অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে বিটিআরসির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিটিআরসি যে জবাব দিয়েছে, তাতে কনসোর্টিয়াম গঠনের বিষয়ে সুস্পষ্ট ও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। বরং সেখানে রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত তিন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি প্রতীয়মান হয়েছে।
সামিটের উপস্থিতিতে বিটিআরসির বিশেষ সভা
২০২৩ সালের ২ এপ্রিল বিটিআরসির তৎকালীন ডিজি (ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এহসানুল কবিরের সভাপতিত্বে সামিট, সিডিনেট ও মেটাকোরের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে কোনো সরকারি প্রতিনিধি কিংবা কমিশনের কমিশনারের উপস্থিতি ছিল না। তবে এ সভার সিদ্ধান্ত পরবর্তী সময়ে কমিশন বা সরকারের অনুমোদন ছাড়াই বিটিআরসির সিদ্ধান্ত হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়।
ওই সভায় দেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থার নিরাপত্তা ও রিডান্ডেন্সির মতো কৌশলগত বিষয়কে উপেক্ষা করে বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক সুবিধাকে একপক্ষীয়ভাবে প্রাধান্য দেওয়া হয়। সেখানে সিডিনেটের সিইও মশিউর রহমান তিনটি লাইসেন্সধারী অপারেটর নিয়ে কনসোর্টিয়াম গঠন করে মিয়ানমার কোস্ট লাইন থেকে বাংলাদেশ ব্রাঞ্চ ইউনিট পর্যন্ত প্রায় ১,১০০ কিমি আন্ডারওয়াটার ক্যাবল স্থাপন এবং কক্সবাজারে একটি অভিন্ন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন করার পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন। বিটিআরসি এই উদ্যোগের আইনি ভিত্তি বা পূর্বানুমোদন নিয়ে কোনো প্রশ্ন না তুলে বরং উল্টো সিদ্ধান্ত দেয়, একই স্থানে সিএলএস স্থাপন করা হলেও প্রত্যেক অপারেটরকে নিজস্ব নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টারে যন্ত্রপাতি আলাদাভাবে স্থাপন ও পরিচালনা করতে হবে, যা তিনটি পৃথক প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়ার মূল উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
রিডান্ডেন্সির লক্ষ্য ব্যর্থ
দেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগে নিরবচ্ছিন্ন সেবা ও বিকল্প সংযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্স দেওয়া হলেও বাস্তবে তিনটি প্রতিষ্ঠানের অবৈধ কনসোর্টিয়াম একই ট্রাংক ক্যাবল, একই ক্যাবল মালিক ও একই ব্রাঞ্চ ক্যাবলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। পৃথক ক্যাবল ব্যবস্থার পরিবর্তে কক্সবাজারে একটি অভিন্ন ব্রাঞ্চ ক্যাবল ও একক ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই অবকাঠামোয় তিন প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ও সংযোগ নির্ভরতার ফলে ক্যাবল কাটা বা ট্রাংক কিংবা ব্রাঞ্চ ক্যাবলে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে তিন পক্ষের সেবাই একসঙ্গে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এতে বিকল্প সংযোগের সুবিধা পাওয়ার পরিবর্তে সৃষ্টি হয়েছে একক ব্যর্থতার ঝুঁকি, যা বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্স দেওয়ার ঘোষিত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
লাইসেন্সিং কাঠামোর সরাসরি লঙ্ঘন
সাবমেরিন ক্যাবল লাইসেন্সিং গাইডলাইনের বিধান অনুযায়ী একাধিক প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কনসোর্টিয়াম হিসেবে লাইসেন্স নিতে চাইলে আবেদনকালেই কনসোর্টিয়াম হিসেবে আবেদন করতে হয় এবং সদস্যদের পরিচয়, ভূমিকা, পারস্পরিক সম্পর্ক ও মালিকানা কাঠামোসহ সার্বিক বিষয় লাইসেন্স দেওয়ার আগেই মূল্যায়িত হতে হয়। অথচ সংশ্লিষ্ট তিনটি পৃথক লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স পাওয়ার প্রায় এক বছর পর (২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর) একটি সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন কনসোর্টিয়াম গঠন করে, যা লাইসেন্স আবেদনের সময় কমিশনের মূল্যায়নের অংশ ছিল না এবং এভাবে পৃথক লাইসেন্স পাওয়ার পর নতুন করে যৌথ কাঠামো বা কনসোর্টিয়াম গঠন লাইসেন্সিং কাঠামোর নির্ধারিত প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
কনসোর্টিয়াম সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর প্রচার
বিটিআরসি গত ২৪ আগস্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো পত্রে বিদেশি কয়েকটি কনসোর্টিয়ামের সদস্যপদের উদাহরণ দিয়ে যৌথভাবে ব্রাঞ্চ ক্যাবল বা ল্যান্ডিং স্টেশন নির্মাণের পক্ষে যুক্তি দেয়। তবে ওই আন্তর্জাতিক রুটভিত্তিক উদাহরণগুলো কোনো দেশের একক ব্রাঞ্চ ক্যাবল বা ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ভারত, ফ্রান্স, জাপান, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোর ক্যাবল নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে একাধিক কোম্পানির যৌথ ব্রাঞ্চ ক্যাবল বা একই স্থানে অভিন্ন ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপনের কোনো নজির নেই; বরং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন স্থানে আলাদা ব্রাঞ্চ ক্যাবল ও ল্যান্ডিং স্টেশন স্থাপন করে থাকে, যার ফলে কৌশলগত নিরাপত্তা ও রিডান্ডেন্সি উপেক্ষা করে কনসোর্টিয়াম গঠনের বিটিআরসির যুক্তিটি আন্তর্জাতিক বাস্তবতার পরিপন্থী। ইতিহাসেরবই পড়ুন
ডেটা সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
সিডিনেটের সিইও মশিউর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী ব্রাঞ্চ ক্যাবলের প্রায় পুরো অংশ মিয়ানমারের সমুদ্রসীমায় অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক গেটওয়ের একটি অংশ সরাসরি দেশের এখতিয়ারের বাইরে থাকছে, যা ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন বা দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনার সময় ডেটা সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশ্লেষকরা জানান, এ অবস্থায় লাইসেন্স দেওয়ার পর গঠিত কনসোর্টিয়ামের আইনগত ভিত্তি, প্রয়োজনীয় সরকারি ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং মূল লাইসেন্সের শর্তের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য পূর্ণাঙ্গভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে, পৃথক লাইসেন্স দেওয়ার পর নতুন যৌথ কাঠামো গঠনের ক্ষেত্রে কোনো পূর্বানুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না এবং কোন বিধানের ভিত্তিতে এ ধরনের কাঠামো গঠন করা হয়েছে, তা নথিপত্রের ভিত্তিতে তদন্ত করে নির্ধারণ করা জরুরি। সূত্র: আমার দেশ
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স