ষাটগম্বুজের ঐতিহ্য নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ
মসজিদেও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের উৎপাত!
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২২-০৯-২০২৬ ০৩:১৬:১৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২২-০৯-২০২৬ ০৪:০১:৫৬ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ। শত শত বছরের ইতিহাস, অনন্য স্থাপত্যশৈলী ও ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে শুধু দেশের নয়, আন্তর্জাতিক দর্শনার্থীদের জন্য মসজিদটি আকর্ষণীয় স্থাপনা। হজরত খানজাহান আলীর স্মৃতিবিজড়িত এই মসজিদ দেখতে প্রতিদিনই আসেন দেশ-বিদেশের শত শত দর্শনার্থী।
তবে ঐতিহাসিক ও পবিত্র এই স্থাপনাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও তৈরির নামে কিছু দর্শনার্থীর আচরণ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলের। তাদের অভিযোগ, মসজিদের ভেতরে ও দেয়ালসংলগ্ন এলাকায় অশালীনভাবে কেউ কেউ টিকটক, রিলসসহ বিভিন্ন ধরনের ভিডিও ধারণ করছেন। এর মধ্যে অশোভনীয় অঙ্গভঙ্গি, উচ্চ শব্দ এবং মসজিদের ধর্মীয় পরিবেশের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়রা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা অর্জন করতে ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানে ছবি ও ভিডিও ধারণ এখন স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু ষাটগম্বুজ মসজিদের মতো একটি বিশ্ব ঐতিহ্য, ধর্মীয় স্থান ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনায় ছবি বা ভিডিও ধারণের সময় স্থানটির মর্যাদা ও পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সচেতন নাগরিকরা।
গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) আসরের নামাজের পরে দেখা যায়, অসংখ্য দেশি-বিদেশি দর্শনার্থী ঘুরে দেখছেন বিশ্ব ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদে। মসজিদের প্রধান ফটকের পাশে রয়েছে বিশাল দুটি মেহগনি গাছ। দেখা যায়, এই গাছের পাশে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন অশালীন অঙ্গভঙ্গিতে ভিডিও ধারণ করছেন দুই দর্শনার্থী। তাদের সঙ্গে কথা বলতেই তারা জানান, এভাবে ভিডিও বানালে সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত ভাইরাল হয় ও ভিউ হয় অনেক বেশি। ধর্মীয় স্থাপনায় এ ধরনের ভিডিও কেন করছেন প্রশ্নের জবাব না দিয়েই চলে যান তারা।
কিছুটা হাঁটতেই দেখা যায়, মসজিদের পশ্চিম পাশের দেয়ালের সঙ্গে হেলে দাঁড়িয়ে আছেন দুই তরুণী। বিভিন্ন অশালীন অঙ্গভঙ্গিতে ছবি তুলছেন তারা। এভাবে মসজিদের পবিত্র দেয়ালে ছবি তুলছেন কেন প্রশ্ন করলে তারা জবাব দেন, এটা আমাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। মসজিদের পবিত্রতা সম্পর্কে জানতে চাইলে কোনো উত্তর না দিয়ে চলে যান তারা।
খুলনা থেকে ষাটগম্বুজ মসজিদে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী রাইয়ান ইসলাম বলেন, এই মসজিদ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। এখানে শুধু বাংলাদেশ নয় বিদেশ থেকেও অনেক দর্শনার্থী আসে। আমিও পরিবার নিয়ে এসেছি কিন্তু এখানে এসে দেখছি নানা ভঙ্গিমায় ছেলে, মেয়েরা ছবি ভিডিও বানাচ্ছে। এমন একটি ঐতিহাসিক জায়গায় এমন কার্যকলাপ কাম্য নয়।
কোনো একক মসজিদ হিসেবে নয়, বরং বাগেরহাটের ঐতিহাসিক মসজিদ নগরীর অংশ হিসেবে ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় ষাটগম্বুজ মসজিদ। মধ্যযুগীয় মুসলিম স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন হিসেবে এ নগরী আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে এ অঞ্চল ‘খলিফাতাবাদ’ নামে পরিচিত। ১৫ শতকে উলুঘ খান জাহান বা খানজাহানের উদ্যোগে এখানে একটি সমৃদ্ধ মুসলিম নগর গড়ে ওঠে। মসজিদ, সমাধি, রাস্তা, সেতু ও জলাধারসহ বিভিন্ন স্থাপনার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ওই নগরীর সবচেয়ে পরিচিত স্থাপনাগুলোর একটি ষাটগম্বুজ মসজিদ।
নাম ষাটগম্বুজ হলেও মূল ছাদে রয়েছে ৭৭টি গম্বুজ। চার কোণের চারটি গম্বুজসহ মোট গম্বুজের সংখ্যা ৮১টি। মসজিদের ভেতরে রয়েছে ৬০টি স্তম্ভ।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত নজরদারি থাকার পরও মসজিদের ভেতরে বা দেয়ালসংলগ্ন এলাকায় এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠা উদ্বেগজনক। বিষয়টি খতিয়ে দেখে নজরদারি আরও কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মসজিদের পশ্চিম পাশে রয়েছে বিশাল দিঘি। দিঘিটি ঘোড়াদিঘি নামে পরিচিত। দিঘির পাড়ে রয়েছে ইটের সমন্বয়ে নান্দনিক রাস্তা ও বসার জন্য ছাউনি ঘর। সংরক্ষিত এলাকার বাইরে রয়েছে পান, সিগারেট ও খাবারের দোকান। ভিতরে থাকা দর্শনার্থীরা সেখান থেকে ক্রয় করে ভিতরে বসেই ধূমপান করছেন অনেকে।
ষাটগম্বুজ মসজিদের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাস্টডিয়ান মোহাম্মদ যায়েদ বলেন, অনেক সময় দর্শনার্থীরা গোপনে টিকটক, রিলস ও ছবি ধারণ করেন। অশোভনীয় অঙ্গভঙ্গির বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ বিষয়ে আমরা তৎপর রয়েছি। ভবিষ্যতে আরও সচেতনভাবে নজরদারি করা হবে।
ষাটগম্বুজ বায়তুশ শরীফ আদর্শ আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মোহাম্মদ আসলাম হোসেন বলেন, ষাটগম্বুজ আমাদের বাগেরহাটের গৌরব। কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে যদি এখানে এ ধরনের ঘটনা ঘটে, তাহলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা রক্ষা হুমকির মুখে পড়বে। পাশাপাশি অশালীনতাও ছড়িয়ে পড়বে। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, স্থাপনাটির পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষায় কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি দর্শনার্থীদেরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স