ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আফ্রিকান বুনো কুকুরের রেকর্ড ৪,০০০ কিলোমিটার যাত্রা

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ১৫-০৯-২০২৬ ০৩:৪১:২৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৫-০৯-২০২৬ ০৩:৪১:২৩ অপরাহ্ন
আফ্রিকান বুনো কুকুরের রেকর্ড ৪,০০০ কিলোমিটার যাত্রা ​ছবি: সংগৃহীত
আফ্রিকার বুকে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার ক্ষেত্রে আফ্রিকান বুনো কুকুরের জুড়ি মেলা ভার। সম্প্রতি বিজ্ঞানী ও গবেষকরা এই প্রজাতির তিনটি পুরুষ বুনো কুকুরের এক বিস্ময়কর যাত্রা প্রত্যক্ষ করেছেন। প্রজনন সঙ্গী ও নতুন অঞ্চলের খোঁজে জাম্বিয়ার বুক চিরে প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার (২,৪৮৫ মাইল) পথ অতিক্রম করেছে তারা। গবেষকদের মতে, এটি এ পর্যন্ত রেকর্ড করা কোনো আফ্রিকান স্থলচর স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রজনন সঙ্গী অনুসন্ধানে অতিক্রম করা দীর্ঘতম দূরত্ব।

অবিরাম নতুন বাসস্থানের ছক আঁকা এবং জটিল পরিবেশ অতিক্রম করা এই অবিশ্বাস্য ভ্রমণ যেমন বিজ্ঞানীদের আশার আলো দেখাচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে উন্মোচন করছে বিলুপ্তপ্রায় এই বন্যপ্রাণিদের জীবনধারণের কঠিন বাস্তবতা।

প্রজনন সঙ্গীর খোঁজে দীর্ঘ অভিযান

আফ্রিকান বুনো কুকুর অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী হলেও প্রজননের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব কিছু প্রাকৃতিক নিয়ম রয়েছে। এরা যে দলে বা 'প্যাকে' জন্মায়, সেখানে প্রজনন করতে পারে না। ফলে দুই বা তিন বছর বয়সে পৌঁছালে এদের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে- হয় নিজের দলে অপেক্ষায় থাকা, যাতে ভবিষ্যতে দলের দায়িত্ব নেওয়া যায়, অথবা দল ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন এলাকায় প্রজনন সঙ্গী ও নতুন টেরিটরি বা ভূমির খোঁজে বেরিয়ে পড়া।

প্রকৃতিবিজ্ঞানের ভাষায় এই একমুখী ভ্রমণকে বলা হয় 'ডিপারচার'। এটি ঋতুভিত্তিক স্থানান্তরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ পরিযায়ী প্রাণীরা খাদ্য বা বাসস্থানের জন্য নির্দিষ্ট সময় পরপর একই পথে আসা-যাওয়া করে, কিন্তু 'ডিপারচার'-এর ক্ষেত্রে প্রাণীরা চিরতরে নতুন জীবনের উদ্দেশ্যে নতুন ভূখণ্ডের দিকে যাত্রা করে।

জাম্বিয়ায় দেখা যাওয়া তিনটি ভাইয়ের এই যাত্রায়, সোজা হিসাব করলে তারা মাত্র ২৬০ মাইলের মতো পথ অতিক্রম করেছিল। কিন্তু চারপাশের পরিবর্তিত পরিবেশ, বন উজাড় এবং প্রতিবন্ধকতার কারণে আঁকাবাঁকা পথে চলতে গিয়ে আট মাসে তারা প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে বাধ্য হয়।

প্রতিকূল ভূখণ্ড ও নগরায়ণ এড়ানোর দক্ষতা

এই অভিযানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বুনো কুকুরগুলোর পথচলার কৌশল। জাম্বিয়ার দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূদৃশ্য, যেখানে মানুষের উপস্থিতি দিন দিন বাড়ছে, সেখানে নিজেদের বাঁচিয়ে এগিয়ে গেছে তারা।

গবেষণায় দেখা গেছে, জিপিএস ট্র্যাকিং কলার পরিহিত এই তিনটি কুকুর দেশের প্রধান প্রধান বনাঞ্চলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। চলার পথে তারা দক্ষতার সঙ্গে এড়িয়ে গেছে বড়ো বড়ো শহরের সীমানা। এমনকি জাম্বিয়ার রাজধানী লুসাকা এবং বড়ো ধরনের শিল্পাঞ্চলগুলোর মতো মানুষের তীব্র ব্যস্ততা ও কোলাহলপূর্ণ এলাকাগুলোকেও সুন্দরভাবে পাশ কাটিয়ে গেছে তারা। তাদের এই আচরণ প্রমাণ করে যে, প্রতিকূল পরিবেশ সত্ত্বেও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এরা চরম বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিচ্ছে।

চোরাশিকার ও ফাঁদের মারাত্মক হুমকি

যাত্রাপথ অতিক্রমের দিক থেকে এই সাফল্য আশাব্যঞ্জক হলেও, গবেষণায় লুকিয়ে থাকা করুণ চিত্রটিও ফুটে উঠেছে। বুনো কুকুরদের এই দীর্ঘ অভিযান মোটেও বিপদমুক্ত ছিল না। মানুষের তৈরি অবৈধ তারের ফাঁদ তাদের জন্য সবচেয়ে বড়ো কালো হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই একই গবেষণায় তিনটি নারী বুনো কুকুরের ওপর নজর রাখা হয়েছিল। তারা প্রায় একই ধরনের একটি মহাকাব্যিক যাত্রা সম্পন্ন করার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, তাদের একজন তারের ফাঁদে আটকে পড়ে।

গবেষকরা দেখেছেন, যখন কোনো সঙ্গী ফাঁদে আটকে মারা যায়, তখন বেঁচে থাকা অন্য সদস্যরা বারবার সেই একই স্থানে ফিরে আসে। জিপিএস ট্র্যাকিংয়ে এই আচরণ পর্যবেক্ষণ করেই গবেষকরা তাদের সঙ্গীর করুণ মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হন। নারী কুকুর তিনটির মধ্যে দুজনই এই অবৈধ ফাঁদে পড়ে প্রাণ হারায়। এই চিত্রটি স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয় যে, এই বিপন্ন প্রজাতির চলাচলের পথে মানুষ কতটা বড়ো বাধা ও আতঙ্কের কারণ।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বুনো কুকুরের পরিভ্রমণ

বিশ্বজুড়ে অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের পরিভ্রমণের তুলনায় আফ্রিকান বুনো কুকুরের এই 'ডিপারচার' অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পরিযায়ী পরিভ্রমণ জাতিসংঘের কনভেনশন অন মাইগ্রেটরি স্পিসিজ এর তথ্যমতে, আফ্রিকার দীর্ঘতম স্থানান্তর ঘটে ওয়াইল্ডবিস্ট বা হরিণজাতীয় প্রাণীদের ক্ষেত্রে। তারা খাদ্য ও জলের খোঁজে তানজানিয়া ও কেনিয়ার মধ্যে ৪০০ মাইলেরও বেশি পথ যাতায়াত করে। বিশ্বে একক স্থলচর প্রাণী হিসেবে দীর্ঘতম পরিযায়ী পথ পাড়ি দেয় 'ক্যারিবু' (এক ধরনের রেইনডিয়ার), যারা বছরে ৮৩৯ মাইলের বৃত্তাকার ভ্রমণ সম্পন্ন করে।

আফ্রিকান বন্য কুকুরেরা অসাধারণ দূরত্ব অতিক্রমকারী প্রাণী। অন্যদিকে ধূসর নেকড়ে এক বছরে ৪,৩৫০ মাইলেরও বেশি পথ অতিক্রম করার রেকর্ড রয়েছে। প্রজননমূল ভ্রমণ, তবে আফ্রিকান বুনো কুকুরের এই ৪,০০০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রমের ঘটনাটি কোনো ঋতুভিত্তিক স্থানান্তরের অংশ নয়, বরং সেরেফ বংশবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে একমুখী ভ্রমণের এক নতুন বিশ্বরেকর্ড।

সংরক্ষণে নতুন আশার আলো ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ

বিজ্ঞান সাময়িকী ইকোলজি তেল প্রকাশিত এই গবেষণা আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবাদীদের জন্য একটি বড়ো বার্তা বহন করছে। ডিন বি সায়েন্স অ্যান্ড আর্টস এবং মন্টানা স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর স্কট ক্রিল, যিনি ১৯৯১ সাল থেকে আফ্রিকান বুনো কুকুর নিয়ে গবেষণা করছেন, তিনি সতর্কতামূলক আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

তাঁর মতে, সংরক্ষিত ও দেয়াল ঘেরা এলাকাগুলো ছাড়া পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার সমস্ত প্রধান বুনো কুকুরের দলগুলো যে এখনো একে অপরের সাথে দূর থেকে হলেও সংযুক্ত হতে পারে, এটি তারই প্রমাণ। তবে একই সাথে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, সংরক্ষণ বিজ্ঞানে গ্লাসটি একই সাথে অর্ধেক পূর্ণ এবং অর্ধেক খালি। একদিকে প্রাণীদের বেঁচে থাকার লড়াই, অন্যদিকে চোরাশিকারীদের ফাঁদের আতঙ্ক-দুই মিলে পরিবেশ এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বর্তমানে পুরো আফ্রিকাজুড়ে মাত্র ৬, ০০০টির মতো আফ্রিকান বুনো কুকুর অবশিষ্ট রয়েছে। ফলে তারা আফ্রিকার অন্যতম বিরল শিকারি প্রাণীতে পরিণত হয়েছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য গবেষণায় 'ওয়াইল্ডলাইফ করিডোর' বা বন্যপ্রাণী চলাচলের প্রাকৃতিক পথ তৈরির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। ইনভাইরনমেন্টাল চ্যারিটি 'দ্য নেচার কনজারভেন্সি'-র রে কনজারভেশন ডিরেক্টর এবং গবেষণাপত্রের কুয়ে-লেখক ব্রুস সওএন্ডার

বুনো কুকুর বা হাতির মতো প্রাণী, যারা বিশাল এলাকা জুড়ে ঘুরে বেড়ায়, তাদের ভবিষ্যতে টিকিয়ে রাখতে হলে সংযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশের কোনো বিকল্প নেই। আমরা সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলোকে বিচ্ছিন্ন 'দ্বীপ' হিসেবে দেখে দীর্ঘমেয়াদে সুফল আশা করতে পারি না। আমাদের চিন্তাভাবনার পরিধি আরও বাড়াতে হবে।

মানুষের বসতি, শিল্পায়ন এবং কৃষিকাজের জন্য বনাঞ্চলগুলো আলাদা টুকরোয় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এই বিচ্ছিন্ন বনগুলোর মধ্যে যদি সুরক্ষিত প্রাকৃতিক করিডোর তৈরি করা যায়, তবে বুনো কুকুরসহ অন্যান্য বিপন্ন প্রজাতিগুলো নিরাপদে প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির সুযোগ পাবে। জাম্বিয়ার বুনো কুকুরদের এই রেকর্ড ভাঙা যাত্রা আমাদের পথ দেখাচ্ছ,প্রকৃতিকে সামান্য সুযোগ ও সুরক্ষা দিলেই তারা নিজেদের অস্তিত্বের লড়াইয়ে জিতে যেতে পারে। 

সূত্র : বিবিসি

বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ