জুলাই পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ২৭ লাখ ৪১ হাজার কেজি চা
রেকর্ড উৎপাদনের পথে চা
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১১-০৯-২০২৬ ০২:৩৫:৫৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১১-০৯-২০২৬ ০৩:২৫:০৯ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
সবুজ পাতায় ভরে উঠেছে দেশের ১৭৩টি চা বাগান। অনুকূল আবহাওয়া, আগাম বৃষ্টিপাত, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও চা বোর্ডের নিয়মিত তদারকিতে চলতি মৌসুমে চা উৎপাদনে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের সম্ভাবনা। জুলাই পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ২৭ লাখ ৪১ হাজার কেজি চা, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬৮ লাখ ৩৩ হাজার কেজি বেশি। উৎপাদনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে রেকর্ড উৎপাদনের আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে উৎপাদন বাড়লেও বাড়তি খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম না পাওয়ায় শঙ্কায় পড়েছেন বাগান মালিকরা।
আগাম বৃষ্টিপাত ও অনুকূল আবহাওয়ায় দেশের ১৭৩টি এবং মৌলভীবাজারের ৯২টি চা বাগানে এখন সবুজ পাতার সমারোহ। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাগানে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন শ্রমিকরা। কেউ কচি পাতা সংগ্রহ করছেন, কেউ ব্যস্ত কারখানায় পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণে। আবার কখনো সর্দারের ডাকে ওজন দিতে ছুটে আসছেন চা-চয়নকারীরা।
এবার অনুকূল আবহাওয়ায় চা পাতার ফলন ভালো হওয়ায় শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততাও বেড়েছে। নির্ধারিত পরিমাণের বাইরে অনেক শ্রমিক ৪০ থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত পাতা সংগ্রহ করতে পারছেন। এতে হাজিরার পাশাপাশি বাড়তি আয়ও হচ্ছে তাদের।
চা শ্রমিক বিনা বাউরী, স্বপ্না দোসাদ ও স্বপ্না মুন্ডা জানান, আগাম বৃষ্টি হওয়ায় এবার শুরু থেকেই বাগানে ভালো পাতা এসেছে। প্রতিদিনের নির্ধারিত পাতার পরও তারা ৭০ থেকে ৮০ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত পাতা তুলতে পারছেন। বাগানভেদে অতিরিক্ত প্রতি কেজি কাঁচা পাতার জন্য চার থেকে পাঁচ টাকা করে পাওয়া যায়। এতে বাড়তি আয় হওয়ায় তারা খুশি।
অন্যদিকে ভালো ফলনে লাভের মুখ দেখছেন বাগান মালিকরাও। সব মিলিয়ে চলতি মৌসুমে চা বাগানজুড়ে বিরাজ করছে স্বস্তি ও আশাবাদের পরিবেশ।
উৎপাদনে বড় উল্লম্ফন
চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দেশে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি। জুলাই পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ২৭ লাখ ৪১ হাজার কেজি। গত বছরের একই সময়ে উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৮ হাজার কেজি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন বেড়েছে ৬৮ লাখ ৩৩ হাজার কেজি।
২০২৫ সালে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০ কোটি ৩০ লাখ কেজি। ওই বছর মোট উৎপাদন হয় ৯ কোটি ৪৯ লাখ ২৭ হাজার কেজি। এর আগে ২০২৪ সালে ১০ কোটি ৮০ লাখ কেজি লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে উৎপাদন হয় ৯ কোটি ৩০ লাখ ৪২ হাজার কেজি।
নিলামেও বাড়ছে বিক্রি
উৎপাদনের পাশাপাশি নিলামেও চায়ের বিক্রি বেড়েছে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্রে ৩ কোটি ২৭ লাখ ৮১৩ কেজি চা বিক্রি হয়েছে, যার গড় মূল্য ছিল কেজিপ্রতি ২৭৫ টাকা। একই সময়ে শ্রীমঙ্গল নিলাম কেন্দ্রে ৬ লাখ ৭৮ হাজার ২১৩ কেজি চা বিক্রি হয়েছে, যার গড় মূল্য ২৬০ টাকা এবং পঞ্চগড় নিলাম কেন্দ্রে বিক্রি হয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫০ কেজি, যার গড় মূল্য প্রায় ২৫২ টাকা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে ৯ কোটি ৬ লাখ ৭২ হাজার কেজি, যার গড় মূল্য ২৪৫ টাকা।
রপ্তানিতেও ইতিবাচক প্রবণতা
চা রপ্তানিতেও সাম্প্রতিক সময়ে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৩ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা রপ্তানি করে আয় হয়েছে ৩৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার কেজিতে; আয় হয় ৪৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি হয়েছে ৬ লাখ ৮০ হাজার কেজি, যার বিপরীতে আয় হয়েছে ১৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে ৫ লাখ ৯০ হাজার কেজি, বিপরীতে আয় হয়েছে ১৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
উৎপাদন বাড়লেও দুশ্চিন্তা দাম নিয়ে
তবে উৎপাদন ও বিক্রি বাড়লেও চা শিল্পের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে উৎপাদন খরচ। বাগান মালিকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ, সার, তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়েছে। কিন্তু নিলামে সেই অনুপাতে দাম পাওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশীয় চা সংসদ, ধলই ব্রাঞ্চের চেয়ারম্যান ও পাত্রখলা চা বাগানের ব্যবস্থাপক ইউসুফ খান বলেন, উৎপাদন খরচের তুলনায় তারা যথেষ্ট দাম পাচ্ছেন না। বাড়তি বিদ্যুৎ, সার, তেল ও গ্যাসের খরচ এবং লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সেই প্রকৃত খরচ অনুযায়ী নিলামে চা বিক্রি না হওয়ায় বাগান মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
অন্যদিকে শ্রমিক নেতারা জানান, উৎপাদন ও বিক্রি বাড়লেও এর সুফল শ্রমিকদের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে, তা তারা জানতে পারেন না।
শমসেরনগর চা বাগান পঞ্চায়েত নেতা গোপাল কানু বলেন, বাগানের লাভের হিসাব শ্রমিকদের জানানো হয় না। অনেক শ্রমিকের বকেয়া পাওনা রয়েছে, আবার অনেক বাগান বন্ধও রয়েছে। নিলামে তুলনামূলক ভালো দামে চা বিক্রি হলে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ এবং বন্ধ বাগানগুলো খুলে দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
চা শ্রমিক সর্দার লক্ষন মাদ্রাজী, শ্যামল ভৌমিক ও আব্দুল আহাদ বলেন, বর্তমানে পাতা ভালো হওয়ায় শ্রমিকরা প্রতিদিন নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে বেশি পাতা তুলতে পারছেন। এতে তাদের বাড়তি আয় হচ্ছে। তবে শ্রমিকদের অন্যান্য ন্যায্য পাওনাও নিশ্চিত করা জরুরি।
উৎপাদন বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ
বাংলাদেশীয় চা সংসদ, সিলেট অঞ্চলের চেয়ারম্যান গোলাম মাওলা শিবলী বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার পাশাপাশি চা বোর্ডের নিয়মিত তদারকি, বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম এবং বাগান মালিকদের দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের উন্নয়ন ইউনিটের পরিচালক ড. একেএম রফিকুল হক বলেন, চা শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করায় উৎপাদন, নিলাম ও রপ্তানিতে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে। এই ধারা ধরে রাখতে বাগান ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিকদের আরো উৎসাহিত করা প্রয়োজন। ডিজিটালম্যাপ দেখুন
বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, উৎপাদন বাড়াতে চা বোর্ডের পক্ষ থেকে বাগানগুলোতে নিয়মিত তদারকি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত জাতের চারা রোপণ এবং চা বাগান ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত দেশ চা উৎপাদনে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ এগিয়ে আছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে চা রপ্তানি বাড়াতে সরকার ও চা বোর্ড কাজ করছে। চায়ের গুণগত মান ধরে রাখতে পারলে দেশীয় বাজারে ভালো দাম পাওয়ার পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হবে। বর্তমানে দেশের চা উৎপাদনের বড় অংশই অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হচ্ছে।
চা-সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, অনুকূল আবহাওয়া, সঠিক ব্যবস্থাপনা, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ এবং নিলামে ভালো দাম—এই চারটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে দেশের চা শিল্প নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চায়ের রপ্তানিও আরো বাড়ানো সম্ভব হবে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স