গঙ্গামতিতে বিমানবন্দর করার প্রস্তাবনা: নতুন দিগন্তের সূচনা
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৯-০৯-২০২৬ ০৪:০১:৫৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৯-০৯-২০২৬ ০৫:২৫:২৬ অপরাহ্ন
ফোকাস বাংলা নিউজ
সাগরকন্যা কুয়াকাটাকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলে পর্যটন, বন্দর, শিল্প, বিদ্যুৎ, মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতির যে নতুন বলয় গড়ে উঠছে, সেখানে এখনও বড় ঘাটতি দ্রুত ও সহজ আকাশ যোগাযোগ। এমন বাস্তবতার নিরিখে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় সৈকতের পূর্বদিকে গঙ্গামতি-ধুলাসার-কাউয়ার চর এলাকায় সরকারি খাস জমিতে একটি আধুনিক বিমানবন্দর নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রস্তাব উঠেছে। প্রস্তাবিত এলাকাটি কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের জিরো পয়েন্ট থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় ৫ হাজার একরেরও বেশি সরকারি খাস জমি রয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে কারিগরি ও পরিবেশগতভাবে উপযোগী প্রমাণিত হলে বিমানবন্দর নির্মাণে ভূমি অধিগ্রহণের ব্যয় ও জটিলতা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে কুয়াকাটা মাস্টারপ্ল্যানে চাকামইয়া ইউনিয়নের গামুরিবুনিয়া এলাকায় একটি সম্ভাব্য বিমানবন্দরের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই স্থান পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার এবং কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। এর বিপরীতে গঙ্গামতি-ধুলাসার-কাউয়ার চর এলাকা সমুদ্রসৈকতের খুব কাছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এ এলাকার কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সক্ষমতা যাচাই করে বিমানবন্দরের বিকল্প স্থান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
যে কারণে কুয়াকাটার কাছে বিমানবন্দর
পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা থেকে বরিশাল যাতায়াত দ্রুত ও অনেক সহজ হয়েছে। কিন্তু বরিশাল থেকে কুয়াকাটা-কলাপাড়া-পায়রা অঞ্চলে এখনও প্রায় ১২০ কিলোমিটার সড়কপথ পাড়ি দিতে হয়। এতে প্রায় তিন ঘণ্টা সময় ব্যয় হয়। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটক-দর্শনার্থী ছাড়াও বিদেশি পর্যটক, বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী এবং পায়রা বন্দর ও শিল্পাঞ্চলসংশ্লিষ্টদের দ্রুত যোগাযোগের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
অথচ কলাপাড়া-পায়রা-কুয়াকাটা এখন আর শুধু একটি পর্যটন এলাকা নয়। পায়রা সমুদ্রবন্দর, সাবমেরিন ল্যান্ডিং স্টেশন, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বানৌজা শের-ই-বাংলা ঘাঁটি, রাডার স্টেশন, মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড), বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেডের পৃথক ১৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতাও রয়েছে। অর্থাৎ অঞ্চলটি ধীরে ধীরে বন্দর-বিদ্যুৎ-শিল্প-পর্যটননির্ভর একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। চালু হচ্ছে অর্থনৈতিক করিডর।
পায়রা সমুদ্রবন্দরের উন্নয়নে ইতোমধ্যে ৫ হাজার ৯০৪ একর ভূমি অধিগ্রহণে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। বন্দরকে ঘিরে নাব্যতা উন্নয়ন, রেগুলার ড্রেজিং, যোগাযোগ অবকাঠামো সম্প্রসারণসহ নানা কার্যক্রম চলছে। প্রথম টার্মিনালের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য নির্মাণাধীন ফোরলেন সেতু প্রকল্পও এ অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করছে। পাশাপাশি বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ এবং পটুয়াখালীতে ৪১৩ দশমিক ০৩ একর জমির ওপর ইপিজেড নির্মাণের কার্যক্রম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
পর্যটনের সঙ্গে অর্থনীতির সংযোগ
কুয়াকাটার বিশেষত্ব শুধু দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত নয়। একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ, চর বিজয়, লাল কাঁকড়ার আবাসস্থল, অতিথি পাখি, উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য এবং এীতহ্যবাহী রাখাইন জনগোষ্ঠীর ভিন্নমাত্রার জীবনশৈলী এ অঞ্চলকে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করেছে। রাখাইন জনগোষ্ঠীর বৌদ্ধবিহার ও মঠসহ বিভিন্ন পুরাকির্তী দর্শনে বাড়ছে পর্যটক দর্শনার্থীর সংখ্যা।
সমুদ্রপথে সুন্দরবন, দুবলার চরসহ অন্যান্য পর্যটন এলাকার সঙ্গে সংযোগ এবং সমন্বিত শুঁটকি পল্লী, সি অ্যাকুরিয়াম, অ্যামিউজমেন্ট পার্কসহ বিভিন্ন পর্যটন অবকাঠামো গড়ে উঠলে কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত পর্যটন বলয় তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিমানবন্দর হলে পর্যটকদের অবস্থানকাল বাড়ানো, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং পর্যটননির্ভর ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গঙ্গামতিতে জমির বড় সুবিধা
কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও কলাপাড়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, প্রস্তাবিত বিমা বন্দর নির্মাণের জন্য গঙ্গামতি-ধুলাসার-কাউয়ার চর এলাকায় ৫ হাজার একরেরও বেশি সরকারি খাস জমি রয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে কাউয়ার চর মৌজায় বেড়িবাঁধের অভ্যন্তরে প্রায় ১ হাজার একর জমি রয়েছে। উল্লেখযোগ্য স্থাপনা না থাকায় প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া গেলে অধিগ্রহণ ব্যয়ও তুলনামূলক কম হতে পারে।
তবে শুধু জমির প্রাপ্যতা বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য যথেষ্ট নয়। রানওয়ের প্রয়োজনীয় দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ, ভূমির উচ্চতা, মাটির গঠন, জোয়ার-ভাটা, পানি নিষ্কাশন, বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, আকাশসীমা, বিমান চলাচলের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সুযোগ—সবকিছু সমন্বিতভাবে পরীক্ষা করতে হবে।
বিশেষ করে উপকূলীয় এ এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি থাকায় বিমানবন্দরের রানওয়ে ও অন্যান্য অবকাঠামোর উচ্চতা এবং দুর্যোগ-সহনশীল নকশা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে এলাকার উপকূলীয় প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য, জলপ্রবাহ ও পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও নিরূপণ করতে হবে।
বিমানবন্দর ঘিরে ‘ইন্টিগ্রেটেড ট্যুরিজম সিটি’
প্রস্তাবে শুধু বিমানবন্দর নির্মাণ নয়, এর সঙ্গে সম্ভাব্য রেলওয়ে স্টেশন, আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম এবং কুয়াকাটা মাস্টারপ্ল্যানে নির্ধারিত স্পোর্টস জোনকে সমন্বিত করে একটি ‘ইন্টিগ্রেটেড ট্যুরিজম অ্যান্ড স্পোর্টস সিটি’ গড়ে তোলার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথাও বলা হয়েছে।
এ ধরনের সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে হোটেল-মোটেল, রেস্টুরেন্ট, পর্যটন পরিবহন, কনভেনশন ও বিনোদনকেন্দ্রসহ বিভিন্ন সেবা খাত গড়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিমানবন্দরটির সঙ্গে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ অবকাঠামো স্থাপনের সম্ভাবনাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারিগরি ও কৌশলগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরীক্ষা করার প্রস্তাব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কক্সবাজার বিমানবন্দর ও মালদ্বীপের ভেলানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানবন্দরটি শুধু কুয়াকাটার পর্যটনের জন্য নির্মাণ না করে পায়রা বন্দর, ইপিজেড, বিদ্যুৎ-জ্বালানি, শিল্প, মৎস্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এর অর্থনৈতিক ব্যবহার বহুগুনে বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। এতে বিমানবন্দরের যাত্রী ও কার্গো চাহিদার একটি বহুমাত্রিক ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
চরগঙ্গামতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আশীষ কীর্তনীয়া বলেন, গঙ্গামতি এখন সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন সৈকত। নৈসর্গিক দৃশ উপভোগে প্রতিদিন শত শত পর্যটক-দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। সৈকতের পরিধি দিনকে দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখানে দাঁড়িয়ে রাবনাবাদ চ্যানেল উপভোগ করা যায়। তাই এখানে বিমানবন্দর নির্মিত হলে কুয়াকাটায় আসা পর্যটকের জন্য সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হবে।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ইমপ্লয়িজ এসোসিয়েশন সাধারণ সম্পাদক জুয়েল ফরাজি বলেন, ‘ কুয়াকাটাকে আন্তার্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্রে উন্নীতের লক্ষ্যে গঙ্গামতি-কাউয়ার চর এলাকায় বিমানবন্দর নির্মাণ এখন প্রধান কাজ। আর ওখানে পর্যাপ্ত পরিমানে সরকারের খাস জমি রয়েছে। এটি সরকারের জন্য ইতিবাচক দিক।
কুয়াকাটা ট্যুর অপারেটর এসোসিয়েশন অব কুয়াকাটা ( টোয়াক) প্রেসিডেন্ট ও কুয়াকাটা উন্নয়ন ফোরাম যুগ্ম আহ্বায়ক রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, ‘ কুয়াকাটায় বিমানবন্দর স্থাপনের জন্য গঙ্গামতি সৈকত লাগোয়া স্পটটি খুবই বাস্তবসম্মত। এই দাবিটি আমরা দীর্ঘদিন থেকে সরকারের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।’ এটির বাস্তবায়ন এখন কুয়াকাটার টেশসই উন্নয়নের প্রধান কাজ বলে মনে করেন এই পর্যটন উদ্যোক্ত।
সব মিলিয়ে, কুয়াকাটার পর্যটন বিকাশের পাশাপাশি পায়রা-কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে একটি বিমানবন্দর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হয়ে উঠবে। তবে এর স্থান নির্বাচন হতে হবে তথ্য-উপাত্ত, পরিবেশগত ভারসাম্য, বিমান চলাচলের নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রয়োজন বিবেচনায়। এ জন্য গঙ্গামতি, ধুলাসার ও কাউয়ার চর এলাকার ওপর দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ ফিজিবিলিটি স্টাডি এবং সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা গেলে কুয়াকাটার আকাশপথের সম্ভাবনা বাস্তবতার আলোয় যাচাই করা সম্ভব হবে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স