ইলিশ নেই সাগরে : সংকটে চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী মাছঘাট
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৯-০৯-২০২৬ ০৩:১৪:১৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৯-০৯-২০২৬ ০৩:১৪:১৯ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
চাঁদপুরের ইলিশের খ্যাতি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছে বিদেশেও। ইলিশের পর্যাপ্ত সরবরাহ আর উন্নত যোগাযোগের কারণে ব্রিটিশ আমলেই ডাকাতিয়া নদীর তীরে গড়ে ওঠে চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন মাছঘাট। এখান থেকে সারা দেশে পৌঁছে যায় রূপালী ইলিশ। এতে সমৃদ্ধ হয়েছিল চাঁদপুরের অর্থনীতি।
কিন্তু চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন মাছঘাটে সেই অবস্থা এখন আর নেই। এক সময় এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মণ মাছ বিক্রি হতো। তবে এখন মাছের তীব্র সংকট। ক্রমাগত লোকসানে বেশিরভাগ আড়তদার প্রায় সর্বস্বান্ত। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকা শত শত শ্রমিক হারিয়েছেন কর্মসংস্থান।
এ ঘাটে মৌসুমে এক সময় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার মাছ বিক্রি হলেও সাম্প্রতিক বছরে আশঙ্কাজনক হারে কমেছে ইলিশের সরবরাহ। ক্রমাগত লোকসানের মুখে পড়েছে আড়তদারসহ বাজার ঘিরে গড়ে ওঠা অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও। এতে ঐতিহ্যবাহী বাজারটি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। ইলিশ ব্যবসায়ীদের দাবি, চাঁদপুর মাছঘাটের সেই আভিজাত্য এখন নেই। জৌলুস হারাচ্ছে এ ঘাট। এ সংকট সমাধানে নদীদূষণ রোধ, নদীর নাব্য সংকট নিরসন এবং ইলিশ রক্ষা অভিযান জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
মৎস্য বিভাগ বলছে, নদীর নাব্য ফেরাতে একটি কারিগরি দল কাজ করছে। তবে এবার ইলিশ রক্ষা অভিযান সফল করতে নানা সমস্যায় পড়তে হয়ে মৎস্য বিভাগকে। এতে তারা হতাশাগ্রস্ত।
চাঁদপুর ঘাটে আসা ইলিশের ক্রেতা শহিদুল ইসলাম বলেন, এখন ভরা মৌসুম। কিন্তু তুলনামূলক মাছ অনেক কম। ফলে মাছের দাম অনেক বেশি। এ কারণে মাছ না ক্রয় করে চলে যাচ্ছি।
আরেক ক্রেতা কেএম সালাউদ্দিন বলেন, আজ থেকে ১৫ দিন আগে ঘাটে এসেছিলাম মাছ কেনার জন্য। তখনো মাছের দাম বেশি ছিল। ওই সময় বিক্রেতাদের সাথে কথা বলেছিলাম, তারা বলেছিল এখন মাছের দাম কমবে। কিন্তু দেখি এখনো মাছের দাম বাড়তি। তাই আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের মাছ কেনাটা কষ্টকর। মাছের দাম দেখে হতাশ হয়েছি। এখন মাছ না কিনেই চলে যাচ্ছি।
ইলিশের আড়তদার সম্রাট বেপারী বলেন, এখন ইলিশের ভরা মৌসুম। সেই তুলনায় মাছ অনেক কম। মাছ কম থাকার কারণে দামও অনেক বেশি। তাই ইলিশ রক্ষা করতে হলে অবৈধ জাল বন্ধ করতে হবে।
ইলিশ বিক্রেতা মাসুম বেপারী বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর ইলিশের সরবরাহ একেবারেই কম হয়েছে। সরবরাহ কম হওয়ায় দামও অনেক বেশি। বর্তমানে মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে ইলিশ এখন আকাশচুম্বী হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি সরকার এখনই পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে কিছুদিন পর হয়তো আমরা আর ইলিশ পাব না। ইলিশ রক্ষায় নদীতে সরকার প্রতি বছর দুটি অভিযান পরিচালনা করে। এই অভিযানগুলো দায়িত্বরতরা ঠিকমতো পালন করেন না। এ সময় অসাধু জেলেদের কিছু দুষ্ট লোক সহযোগিতা করে, যার কারণেই ছোট ছোট ইলিশ নিধন হয়। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বরতদের সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
ইলিশ ব্যবসায়ী শাহাবুদ্দিন বলেন, নদীতে ইলিশ নেই বললেই চলে। অল্প পরিমাণ মাছ ঘাটে সরবরাহ করা হয়। ফলে ইলিশের দাম অনেক বেশি। ইলিশ রক্ষা করতে হলে নদীর ডুবোচরগুলো খনন করতে হবে। এ ছাড়াও অবৈধ কারেন্ট জালের কারখানা বন্ধ করতে হবে। ইলিশ রক্ষা অভিযানগুলো কঠোরভাবে পরিচালনা করতে হবে।
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী শবেবরাত সরকার বলেন, ইলিশের মূল মৌসুম এখন। কিন্তু এই সময়ে এখন ইলিশ নেই বললেই চলে। এর কারণ হচ্ছে নদী দূষিত হচ্ছে, নদীতে ডুবোচর পড়ছে, নদীর নাব্য সংকট চলছে। এসব বিষয়ে আমরা মৎস্য কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছি। এ ছাড়াও ইলিশ রক্ষার অভিযানের সময়ে অসাধু জেলেরা মাছ ধরে ফেলে। তাই ইলিশ রক্ষা অভিযানগুলো জোরালোভাবে পালন করতে হবে।
চাঁদপুর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, গত বছর আমরা কঠোরভাবে ইলিশ রক্ষা অভিযান পরিচালনা করেছি। আমাদের অভিযান সফল হয়েছে। এবারও সামনে ইলিশ রক্ষার অভিযান পরিচালনা করা হবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, প্রাকৃতিক কারণ, বন্যা ও বৃষ্টি না হওয়ায় ইলিশ আগের মতো ধরা পড়ছে না। এ ছাড়াও নদীর নাব্য সংকট, ডুবোচর ও নদী দূষণের প্রভাবে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। ইলিশ রক্ষায় নদীর নাব্য ফিরে পেতে, নদীকে দূষণমুক্ত ও ডুবোচরমুক্ত করতে চাঁদপুরে ইতিপূর্বে একটি টেকনিক্যাল টিম পরিদর্শন করেছে। আমরা আশা করি, অচিরেই এই সমস্যার সমাধান হবে। ইলিশ রক্ষায় পূর্বের অভিযানগুলো সফল হওয়ার কারণেই এখন কিছুটা ইলিশ পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, আগামী অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে মা ইলিশ রক্ষার অভিযান শুরু হচ্ছে। তবে এই অভিযান নিয়ে আমরা হতাশায় ভুগছি। কারণ ইলিশ রক্ষার একটি প্রকল্প ছিল। সেটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়নি। ইলিশ রক্ষার অভিযানের কার্যক্রমে ওই প্রকল্পে একটি বাজেট ছিল। তা দিয়ে ইলিশ রক্ষার কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। প্রকল্পটি বন্ধ হওয়ায় রাজস্ব খাত থেকে প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। তা ছাড়া মৎস্য বিভাগের প্রয়োজনীয় জনবলও কম। ইতিপূর্বে আমরা জেলা প্রশাসক ও মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি অবহিত করেছি। ইলিশ রক্ষার অভিযান পরিচালনার জন্য স্পিডবোটের চালকও নেই। ফলে আগামী অক্টোবর মাসে মা ইলিশ রক্ষা অভিযান নিয়ে আমরাও উদ্বিগ্ন।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স