সাত দশক পর অস্তিত্বের শিকড়ে টান
সংকটে অ্যালুমিনিয়াম শিল্প
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৮-০৯-২০২৬ ০৩:৫০:১২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৮-০৯-২০২৬ ০৩:৫০:১২ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
এক সময় অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্রের জন্য দেশজুড়ে পরিচিত ছিল বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলার তালোড়া বন্দর। ১৯৫৪ সালে এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দেশের প্রথম অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্রের কারখানা। এরপর একে একে গড়ে ওঠে আরও বেশ কয়েকটি কারখানা। পাতিল, কড়াই, বালতি, মগসহ নানা ধরনের তৈজসপত্র তৈরি করে এসব কারখানার পণ্য ছড়িয়ে পড়ত উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার বাজারে। কিন্তু সেই ঐতিহ্যে এখন ধস নেমেছে।
তালোড়ার ছোট বড় ১১টি অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্রের কারখানার মধ্যে গত চার বছরে বন্ধ হয়ে গেছে ১০টি। এতে কর্মহীন হয়েছেন পাঁচ শতাধিক শ্রমিক। টিকে থাকা একমাত্র সৌরভ অ্যালুমিনিয়াম ওয়ার্কসও চলছে লোকসান গুনে। মালিক শ্রমিকদের আশঙ্কা, দ্রুত জ্বালানি ও গ্যাস সমস্যার সমাধান না হলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে শেষ কারখানাটিও।
ব্যবসায়ীদের হিসাবে, ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে এক কেজি অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্র উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ১৬ টাকা। একই পণ্য গ্যাসে উৎপাদন করলে খরচ নেমে আসে ৮ থেকে ৯ টাকায়।
বগুড়া শহরের শিল্পকারখানাগুলো গ্যাস সুবিধা পাওয়ায় সেখানকার উদ্যোক্তারা তুলনামূলক কম খরচে পণ্য উৎপাদন করতে পারছেন। অথচ শহর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরের তালোড়ায় নেই গ্যাস সংযোগ।
ফলে একই বাজারে পণ্য বিক্রি করেও তালোড়ার উদ্যোক্তাদের উৎপাদন খরচ বেশি পড়ছে। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
তালোড়ার সৌরভ অ্যালুমিনিয়াম কারখানার সেলস ম্যান বীরেন চন্দ্র প্রায় ২৫ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করছেন। কারখানাটি চালুর সময় থেকেই তিনি সেখানে রয়েছেন।
তিনি বলেন, আগে ফার্নেস অয়েল, অ্যাসিড, সালফার, কস্টিক ও নাইট্রিকসহ বিভিন্ন কাঁচামালের দাম তুলনামূলক অনেক কম ছিল। এখন এসবের দাম কয়েক গুণ বেড়েছে। কিন্তু সে তুলনায় অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্রের দাম বাড়ানো সম্ভব হয়নি।
বীরেন চন্দ্র বলেন, আগে সালফারের দাম ছিল প্রায় ২ হাজার টাকা। এখন সেই সালফার ১২ হাজার টাকা। নাইট্রিকের দাম ছিল ২ হাজার ৫০০ টাকা, এখন প্রায় ৫ হাজার ৫০০ টাকা। কস্টিকের দামও ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা থেকে বেড়ে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার টাকা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের ব্যবসাটা মূলত বিনিময়ভিত্তিক। আগে ১০০ কেজি ভাঙারির বিপরীতে ৬২ থেকে ৬৩ কেজি পণ্য দিতে হতো। এখন কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় একই ১০০ কেজি ভাঙারির বিপরীতে ৬৮ থেকে ৬৯ কেজি পণ্য দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ চার-পাঁচ কেজি বেশি পণ্য দিতে হচ্ছে। এতে আমাদের উৎপাদন খরচ আরও বাড়ছে।
তালোড়ায় আগে আরও কয়েকটি অ্যালুমিনিয়াম কারখানা ছিল জানিয়ে বীরেন চন্দ্র বলেন, পাঁচটি কারখানার মধ্যে চারটিই বন্ধ হয়ে গেছে। এখন এই একটি কারখানা কোনো রকমে চলছে। একদিন গালাই উৎপাদন হয়, আরেকদিন হয় না। কাঁচামালের সংকট আছে। মাস গেলেই লোকসান।
তিনি আরও বলেন, মালিকও বন্ধ করতে পারছেন না, আবার এভাবে চালিয়েও যেতে পারছেন না। একটা সংকটের মধ্যে পড়ে গেছে প্রতিষ্ঠানটি। কতদিন এভাবে চালানো সম্ভব হবে, সেটাও বলা যাচ্ছে না।
কারখানার শ্রমিক রতন মিয়ার সংসারও এখন নির্ভর করছে অনিয়মিত কাজের ওপর। তিনি বলেন, এখানে একদিন মেশিন চলে, আরেকদিন চলে না। বিদ্যুতের সমস্যা, জ্বালানির সমস্যা সব মিলিয়ে নিয়মিত কাজ হয় না। কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী ভালোভাবে মাল দিতে পারে না। আমরা আগে যেভাবে কাজ করতাম, এখন সেভাবে কাজ করতে পারি না।
রতন মিয়া বলেন, আগে সংসার ভালো চলত। এখন সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে। ফ্যাক্টরি বন্ধ বন্ধ অবস্থায় আছে। সরকার যদি গ্যাস বা জ্বালানির ব্যবস্থা করে, তাহলে আরও কয়েকটি ফ্যাক্টরি চালু হতে পারে।
দুই বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রগতি অ্যালুমিনিয়ামের মালিক জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে কারখানা চালু রাখা সম্ভব হয়নি। বগুড়া বিসিক শিল্পনগরীতে প্লট না পাওয়ায় অন্যত্র সরিয়েও নিতে পারেননি তিনি।
তালোড়া অ্যালুমিনিয়ামের মালিক পবন প্রসাদ পোদ্দার বলেন, উপজেলা পর্যায়ের কারখানাগুলোতে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার বিষয়ে সরকারের অনাগ্রহের কারণেই অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে শত শত শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন।
তালোড়ায় টিকে থাকা একমাত্র প্রতিষ্ঠান সৌরভ অ্যালুমিনিয়াম ওয়ার্কসের মালিক সুভাষ প্রসাদ কানু বলেন, ফার্নেস অয়েলের এক মাসের খরচ দিয়ে ছয়-সাত মাসের গ্যাসের বিল দেওয়া সম্ভব। গ্যাস সংযোগ পেলে উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন খরচও অনেক কমে আসবে।
তিনি বলেন, শহর এলাকায় গ্যাস সংযোগ দেওয়ার পর প্রায় চার বছর আগে জেলা প্রশাসকের কাছে গ্যাস সংযোগের দাবিতে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখনো সেই দাবি বাস্তবায়ন হয়নি।
তালোড়ার বন্ধ হয়ে যাওয়া মন্ডল অ্যালুমিনিয়ামের ব্যবস্থাপক আফজাল হোসেন বলেন, একসময় এখানকার কারখানাগুলোতে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের পাতিলসহ বিভিন্ন পণ্য দেশের বিভিন্ন জেলায় যেত।
তিনি বলেন, কাঁচামালের সংকট, জ্বালানি সংকট, অর্থনৈতিক সংকট এবং গ্যাস না থাকার কারণে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। একপর্যায়ে মালিকের দেনা হয়ে যায়। পরে কারখানাটি বিক্রি করে দেওয়া হয়। লাভের পরিমাণ সীমিত হওয়ায় মালিকের পক্ষেও এটি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), বগুড়া জেলা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক এ কে এম মাহফুজুর রহমান বলেন, অ্যালুমিনিয়াম শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা দেওয়া জরুরি। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে তাদের কীভাবে সুযোগ সুবিধা দেওয়া যায়, সে বিষয়ে আলোচনা করব, যাতে তারা এই পেশাটিকে টিকিয়ে রাখতে পারেন।
বগুড়ার জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান বলেন, আমরা চাই, যেসব রুগ্ণ শিল্প রয়েছে, সেগুলোকে আরও শক্তিশালী করতে। কোনো শিল্প বিলুপ্ত হওয়ার পথে থাকলে এবং সেটির সম্ভাবনা থাকলে সরকারি সহযোগিতায় সেই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হবে। কারণ এসব শিল্পে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, অ্যালুমিনিয়াম শিল্প বগুড়ার একসময়কার ঐতিহ্য। ধীরে ধীরে এই শিল্পের সংখ্যা কমে গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টা থাকবে, এই শিল্পের সঙ্গে যারা জড়িত এবং যারা আবার কাজ করতে চান, তাদের সহযোগিতা করা।
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, বিভিন্ন ধরনের ঋণ সুবিধা এখন রয়েছে। উদ্যোক্তারা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের জন্য ঋণসুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়ে সহযোগিতা করা হবে। আমরাও বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখব। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে কীভাবে আবার পুনরুজ্জীবিত করা যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করব।
তালোড়ার অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের সংকট শুধু কয়েকটি কারখানা বন্ধ হওয়ার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাঁচ শতাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান, বহু পরিবারের জীবিকা এবং একটি এলাকার দীর্ঘদিনের শিল্প ঐতিহ্য।
ব্যবসায়ীদের দাবি, গ্যাস সংযোগ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, কাঁচামালের মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সহজ শর্তে ঋণসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর অনেকগুলোই আবার চালু করা সম্ভব। কিন্তু দ্রুত উদ্যোগ না নিলে আশঙ্কা, তালোড়ার অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের শেষ আলোটিও নিভে যাবে। ১৯৫৪ সালে যে শিল্পের হাত ধরে তালোড়ার পরিচিতি তৈরি হয়েছিল, সাত দশক পর সেই শিল্পই এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স