ঢাকা , শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ , ২১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কচুরিপানার ভাসমান বেডে স্বপ্ন বুনছেন চাষিরা

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০৫-০৯-২০২৬ ১২:১৬:২৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৫-০৯-২০২৬ ১২:১৬:২৩ অপরাহ্ন
কচুরিপানার ভাসমান বেডে স্বপ্ন বুনছেন চাষিরা ছবি : সংগৃহীত
যে কচুরিপানা একসময় ডাকাতিয়া নদী ও আশপাশের জলাশয়ে নৌযান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতো, জলাবদ্ধতা বাড়াতো এবং দুর্গন্ধ ছড়াতো, সেই কচুরিপানাই এখন হয়ে উঠেছে কৃষকের সম্পদ। পচা কচুরিপানা দিয়ে তৈরি ভাসমান বেডে সবজি ও চারা উৎপাদন করে আয় করছেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলার শোভান এলাকার কৃষকেরা।

বর্ষায় পানিতে তলিয়ে থাকা নিচু জমিতে মাটিতে চাষাবাদ করা সম্ভব হয় না। সেই জলাবদ্ধতাকেই কাজে লাগিয়ে বাঁশ ও কচুরিপানা দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে একেকটি ভাসমান বেড। এর ওপর মাটি ও জৈব উপাদান দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে চাষাবাদের উপযোগী পরিবেশ। সেখানে ফলছে লাউ, মিষ্টি কুমড়া, লালশাক, শসা, চিচিঙ্গাসহ নানা ধরনের সবজি। উৎপাদিত সবজি ও চারা বিক্রি হচ্ছে স্থানীয় বাজারে। পাশাপাশি যাচ্ছে পাশের লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লা জেলাতেও।

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শোভান এলাকায় ভাসমান বেডে সবজি চাষের সূচনা করেন কৃষক শহীদ তালুকদার। তার উদ্যোগ ও সাফল্য দেখে অন্য কৃষকেরাও এ পদ্ধতিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে ভাসমান কৃষি।

বর্তমানে শুধু শোভান গ্রামেই প্রায় ১১০ জন কৃষক বাণিজ্যিকভাবে ভাসমান বেডে সবজি ও চারা উৎপাদন করছেন। তাদের অনেকের কাছে এটি এখন মৌসুমি চাষের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের অন্যতম উৎস।

উদ্যোক্তা কৃষক শহীদ তালুকদার বলেন, চলতি মৌসুমে ৬০টি ভাসমান বেড তৈরি করেছি। বেড তৈরি, শ্রমিকের মজুরি ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা।

শহীদ তালুকদারের আশা, মৌসুম শেষে এসব বেড থেকে উৎপাদিত সবজি ও চারা বিক্রি করে অন্তত ১০ লাখ টাকা আয় হবে।

তিনি বলেন, ‘আগে যে কচুরিপানা আমাদের জন্য সমস্যা ছিল, এখন সেটিই কাজে লাগিয়ে আয় করছি। পানিতে পড়ে থাকা জায়গা ফেলে না রেখে কাজে লাগানো যাচ্ছে। এতে লাভও হচ্ছে।’

কৃষক মিজানুর রহমানের কাছেও ভাসমান বেড শুধু সবজি উৎপাদনের জায়গা নয়, এটি পরিবারের বাড়তি আয়ের একটি পথ।

তিনি বলেন, ‘যে কচুরিপানা পচে দুর্গন্ধ ছড়াতো, সেটিই এখন সংগ্রহ করে সারি সারি বেড বানাচ্ছি। সেখান থেকে সবজি উৎপাদন করে বাড়তি আয় হচ্ছে। পরিবারের পুষ্টির চাহিদাও মিটছে।’

ভাসমান বেডের আরেকটি সুবিধার কথাও জানান তিনি। মিজানুর রহমান বলেন, মৌসুম শেষে বেডগুলো পচে গেলে সেগুলো জমিতে জৈবসার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ফলে একদিকে জলাবদ্ধ জায়গায় সবজি উৎপাদন হচ্ছে, অন্যদিকে পরবর্তী সময়ে জমির উর্বরতা বাড়াতেও তা কাজে লাগছে।

শোভান এলাকার ভাসমান বেডে উৎপাদিত সবজির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের চারা বিক্রি করেও কৃষকরা আয় করছেন। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানোর পর এসব পণ্য যাচ্ছে পাশের জেলা লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লায়।

কৃষকদের মতে, বিষমুক্ত সবজির প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ায় এ ধরনের উৎপাদনের বাজারও তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে জলাবদ্ধ এলাকায় অন্য কোনো ফসল আবাদ করা সম্ভব না হওয়ায় ভাসমান বেড তাদের জন্য কার্যকর একটি বিকল্প হয়ে উঠেছে।

ভাসমান কৃষির সম্ভাবনা তৈরি হলেও সরকারি সহায়তা নিয়ে কিছু কৃষকের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। স্থানীয় কৃষক মো. রাব্বি ও মো. রাজিবের অভিযোগ, তারা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের উদ্যোগে ভাসমান বেডে চাষ করছেন। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষি বিভাগের সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা পাচ্ছেন না।

মো. রাব্বি বলেন, ‘আমরা নিজেদের উদ্যোগে এই পদ্ধতিতে চাষ করছি। কিন্তু সরকারি সুযোগ-সুবিধা সবার মধ্যে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। কৃষি বিভাগের আরও সহযোগিতা পেলে অনেক কৃষক এই চাষে আসতে পারতেন।’

একই অভিযোগ মো. রাজিবেরও। তার দাবি, ভাসমান কৃষির সঙ্গে যুক্ত প্রান্তিক কৃষকদের জন্য সরকারি সহায়তার পরিধি বাড়ানো দরকার।

কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে ফরিদগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কল্লোল কিশোর সরকার বলেন, জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত উপজেলার নিচু ও জলাবদ্ধ এলাকায় প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে বিভিন্ন কৃষককে সহায়তা দেয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘ফরিদগঞ্জে উৎপাদিত চারা পাশের জেলাগুলোতেও জনপ্রিয়। আমরা সরকারি সহায়তার সীমা বাড়ানোর জন্য নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখছি।’

কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রকল্পের পরিধি বাড়ানো গেলে আরও বেশি কৃষককে সরকারি সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হবে।

কৃষির প্রচলিত ধারণায় পানিতে ডুবে থাকা জমি অনেকটাই অনুপযোগী। কিন্তু ফরিদগঞ্জের শোভান গ্রামের কৃষকেরা সেই ধারণাকে বদলে দিচ্ছেন। যে জলাবদ্ধতা একসময় ছিল দুর্ভোগের কারণ, সেখানেই এখন সারি সারি ভাসমান বেডে সবুজ সবজির সমারোহ।

কৃষকেরা বলছেন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, উন্নত প্রযুক্তি, মানসম্মত বীজ ও উপকরণ এবং সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই কৃষি আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব। এতে অনাবাদি জলাশয় ও জলাবদ্ধ এলাকার ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও কৃষকের আয়ও বাড়বে।

কচুরিপানাকে বোঝা না ভেবে সম্পদে পরিণত করার এই উদ্যোগ তাই শুধু কয়েকজন কৃষকের সাফল্যের গল্প নয়; জলাবদ্ধ এলাকায় কৃষির নতুন সম্ভাবনারও একটি উদাহরণ। যথাযথ পরিকল্পনা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ফরিদগঞ্জের এই ভাসমান কৃষি একদিন স্থানীয় সীমানা পেরিয়ে দেশের অন্যান্য জলাবদ্ধ এলাকাতেও অনুসরণযোগ্য মডেল হয়ে উঠতে পারে।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ