ঢাকা , সোমবার, ৩১ অগাস্ট ২০২৬ , ১৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কুষ্টিয়ায় চলতি বছর পানিতে ডুবে ১৫ প্রাণহাণি

ডুবুরি সংকটে বাড়ছে মৃত্যু

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ৩১-০৮-২০২৬ ০১:৩৮:৫৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ৩১-০৮-২০২৬ ০১:৩৮:৫৩ অপরাহ্ন
ডুবুরি সংকটে বাড়ছে মৃত্যু ফাইল ছবি
ছোট-বড় মিলিয়ে কুষ্টিয়া জেলার ওপর দিয়ে অন্তত আটটি নদ-নদী বয়ে চলেছে। পদ্মা, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, হিসনা, কালীগঙ্গা, কুমার ও সাগরখালীর মতো নদীর সঙ্গে জেলার মানুষের জীবন-জীবিকা ও চলাচল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নদী কেন্দ্রিক এই জেলায় হরহামেশা পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। ফলে নদীতে কেউ নিখোঁজ হলে উদ্ধার অভিযানের জন্য ফোন করে বা বার্তা পাঠিয়ে প্রায় দেড়শ কিলোমিটার দূরের খুলনা থেকে ডুবুরি দল আসার অপেক্ষায় থাকতে হয় স্বজনদের। এতে দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কাজে গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়। জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা কমার পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ সময় লেগে যায়। কোনো কোনো ঘটনায় এক থেকে দুই দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় স্বজনদের। নদ-নদীতে গোসল, মাছ ধরা কিংবা সামান্য অসাবধানতার কারণে প্রায়ই ঘটছে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত পানিতে ডুবে শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

৫ আগস্ট দৌলতপুর উপজেলার মরিচা ইউনিয়নে পদ্মা নদীর পাড় ধসে নূরী খাতুন (৫) ও জামিলা খাতুন (৮) নদীতে পড়ে যায়। স্থানীয়রা জামিলাকে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও নিখোঁজ নূরীর মরদেহ পরদিন মিরপুর উপজেলার পদ্মা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। ১৪ আগস্ট সকালে কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ পদ্মা নদীর ঘাটে নিখোঁজ হয় ৮ বছরের শিশু আলিফ হোসেন। পরে সন্ধ্যায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২৪ আগস্ট কুমারখালী পৌরসভার এম এন বাঁধ এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে গড়াই নদীতে ডুবে মারা যান জেলে পরিমল মন্ডল (৩৮)। সর্বশেষ শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুপুরে দৌলতপুর উপজেলার ভাগজোত ঘাটে পদ্মা নদীতে বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে নিখোঁজ হয় মাদরাসা ছাত্র মোস্তাকিম হোসেন (১২)। স্থানীয়রা এসময় আরেক শিক্ষার্থীকে জীবিত উদ্ধার করতে পারলেও মোস্তাকিমকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কুষ্টিয়ায় নিজস্ব কোনো ডুবুরি দল না থাকায় ওই দিন উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হয়। পরে খুলনা থেকে ডুবুরি দল পৌঁছালে শনিবার সকালে পদ্মা নদী থেকে মোস্তাকিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

স্থানীয়রা বলছেন, নদীতে কেউ নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করা অত্যন্ত জরুরি। জেলা বা উপজেলা পর্যায়ের ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছালেও প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় অনেক সময় তারা কার্যকরভাবে অভিযান শুরু করতে পারেন না। স্থানীয়রা নৌকা, জাল কিংবা দেশীয় সরঞ্জাম নিয়ে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। তবে প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও আধুনিক ড্রাইভিং সরঞ্জামের বিকল্প এসব উপকরণ নয়।

সামাজিক সংগঠন ‘মানুষ মানুষের জন্য’র প্রতিষ্ঠাতা সাহাব উদ্দীন মিলন বলেন, ‘যে জেলায় পদ্মা ও গড়াইয়ের মতো প্রমত্তা নদী রয়েছে, সেখানে স্থায়ী ডুবুরি দল না থাকা হতাশাজনক। অবিলম্বে কুষ্টিয়া জেলায় স্থায়ী ডুবুরি দল নিয়োগ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর ফায়ার স্টেশনে প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম নিশ্চিত করা দরকার।’ পদ্মাপাড়ের বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘নদীতে কেউ নিখোঁজ হলে স্বজনরা একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর শঙ্কায় থাকেন, অন্যদিকে কখন উদ্ধারকারী দল আসবে, সেই অপেক্ষাও করতে হয়। স্থানীয়রা নৌকা, জাল ও দেশীয় সরঞ্জাম নিয়ে চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও আধুনিক সরঞ্জামের বিকল্প তারা হতে পারেন না।’ আরেক বাসিন্দা মোমিন ইসলাম বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই নিখোঁজ ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধারের সুযোগ থাকে। কিন্তু দূরের জেলা থেকে ডুবুরি দলের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে সেই সম্ভাবনা অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়।’

কুষ্টিয়া ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক ওয়াদুদ হোসেন বলেন, ‘কুষ্টিয়া একটি নদীবেষ্টিত জেলা হওয়ায় এখানে নৌ-দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেক বেশি। জেলা পর্যায়ে আলাদা ডুবুরি দল না থাকায় বিভাগীয় শহর খুলনার ওপর নির্ভর করতে হয়। খবর পাঠালে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করে তাদের কুষ্টিয়ায় এসে পৌঁছাতে ৬-৮ ঘণ্টা সময় লাগে। প্রতিটি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে খুলনার ডুবুরি দলের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে আমাদেরকে জনগণের তোপের মুখে পড়তে হয়। জেলার ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত ডুবুরি দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি পাঠিয়েছি। কিন্তু এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।’
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ