পেটে গজ রেখে সেলাইয়ে প্রসূতির মৃত্যু, হতাশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২১-০৮-২০২৬ ০৩:৫২:২৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২১-০৮-২০২৬ ০৩:৫৪:৩৭ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
ফরিদপুরের বেসরকারি সমরিতা জেনারেল হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় পেটে গজ রেখে সেলাই দেয়ার পর কনিকা মণ্ডল নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে তাদের বাড়িতে ছুটে গেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামে নিহত কনিকা মণ্ডলের স্বামী অশান্ত মণ্ডলের বাড়িতে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ সময় নিহত প্রসূতির পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান তিনি। তাৎক্ষণিকভাবে পরিবারটিকে ৫০ হাজার টাকা সহায়তা দেয়া হয়। পাশাপাশি মাতৃহারা শিশুটির পূর্ণ ভরণপোষণের দায়িত্ব সরকার বহন করবে বলেও প্রতিশ্রুতি দেন মন্ত্রী।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দায়ীদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘ঘটনাটি আমি নিজেই মেনে নিতে পারছি না। একারণেই সকালে পরিবারটিকে সমবেদনা জানাতে চলে এসেছি। চিকিৎসকের অবহেলার কারণে একটা নিষ্পাপ শিশু তার মায়ের চেহারা দেখতে পারল না। বিষয়টি কঠোরভাবে দেখব এবং এর যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এই শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমার দৃষ্টি থাকবে, সরকারের দৃষ্টি থাকবে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীরও দৃষ্টি থাকবে।’
গত ১৭ বছরে হাসপাতালের আশপাশে গড়ে ওঠা অবৈধ ক্লিনিকগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও আকস্মিক পরিদর্শন চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে ক্লিনিক বন্ধ করাসহ লাইসেন্স বাতিল করা হচ্ছে।’
এ সময় রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন, রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ, ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সামসুল হক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তারিফ উল হাসান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মুস্তাফিজুর রহমানসহ রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
জানা যায়, গত ২৯ জুন প্রসববেদনা উঠলে কনিকা মণ্ডলকে (৩৬) ফরিদপুর শহরের নীলটুলী এলাকার সমরিতা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় হাসপাতালটির স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ সার্জন ডা. লক্ষ্মী রানী দত্ত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার কন্যাসন্তান প্রসব করান। কিন্তু পরদিনই কনিকার পেট ফুলে যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে বিষয়টি জানালে তারা নানা অজুহাত দেখিয়ে রোগীকে অন্যত্র নিয়ে যেতে বলেন। পরে ৩ জুলাই তাকে ঢাকার কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
নিহত গৃহবধূর দেবর সমীর মণ্ডল জানান, ঢাকায় ভর্তির পর ৭ জুলাই সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুল জলিলের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরীক্ষা করে দেখা যায়, তার পেটে প্রায় দেড় কেজি গজ রেখে সেলাই দেয়া হয়েছে। ওই দিনেই অস্ত্রোপচার করে গজ বের করা হয় এবং রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। এরপর চার দিন আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) রাখা হয়। টানা ৪৮ দিন চিকিৎসার পর বুধবার (১৯ আগস্ট) দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান কনিকা। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিকালে নিহতের সৎকার করা হয়।
সমীর মণ্ডল আরও বলেন, ‘এতে আমাদের প্রায় ২০ লাখ টাকা শেষ হয়ে গিয়েছে, তাতেও বাঁচাতে পারলাম না। আমরা ওই ডাক্তারের বিচার চাই, তাঁর অবহেলার কারণেই আজ একটি প্রাণ চলে গেল।’
ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান ‘সময় সংবাদ’কে জানান, মন্ত্রীর নির্দেশে এ ঘটনায় ফরিদপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোক্তার হোসেনকে প্রধান করে ৫ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন গাইনি কনসালট্যান্ট ডা. সুলতানা বেগম লিপি, কনসালট্যান্ট ডা. সন্দীপন গাইন, গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. নূপুর পাল এবং সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. জ্যোতির্ময়। আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এদিকে কনিকার মৃত্যুর পর তার স্বামী অশান্ত মণ্ডলের হোয়াটসঅ্যাপে একটি খুদে বার্তা পাঠিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন অভিযুক্ত চিকিৎসক লক্ষ্মী রানী দত্ত। বার্তায় তিনি লেখেন, ‘দাদা নমস্কার। ভালো থাকুন ঈশ্বরের কাছে সেই প্রার্থনা করি। সব কথার আগে করজোড়ে ক্ষমাপ্রার্থী। ভুল মানুষেরই হয়, অনেক ঝামেলার ভেতর থেকে আমি ভুল করে ফেলেছি। আমি বারবার ক্ষমাপ্রার্থী আপনার কাছে। অনেক কষ্টে আছি। আবারও ক্ষমা চাচ্ছি দাদা।’
সিজারিয়ান অপারেশন করা ডা. লক্ষ্মী রানী দত্তের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার খেয়াল নেই, একটু পরে ফোন দিচ্ছি’। এ কথা বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি। পরে আবারও যোগাযোগ করা হলে তিনি আর ফোন ধরেননি।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স