ঢাকা , রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬ , ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

​দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সঙ্গে লোডশেডিং

লোকসানের ধকলে জেলে, ট্রলার ও আড়ত মালিক

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১৬-০৮-২০২৬ ০৪:৪৫:১৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৬-০৮-২০২৬ ০৫:১৪:১৪ অপরাহ্ন
লোকসানের ধকলে জেলে, ট্রলার ও আড়ত মালিক ​ছবি: সংগৃহীত
এফবি মা জননী-৯ ফিশিং ট্রলারের মাঝি আব্দুল করিম। গত সাত দিন ধরে পটুয়াখালীর কলাপাড়ার মহিপুর ঘাটে নোঙর করে আছেন। নিজেসহ ২২জন জেলে নিয়ে বসে বসে খাচ্ছেন। জানালেন ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞার পরে আবহাওয়া খারাপের কারণে বাড়িতে এক মাস বসা ছিলেন। এরপরে মহিপুরে আসার ২৭ দিনের মধ্যে একবার সাগরে গিয়ে ১৮ লাখ টাকার ইলিশ মাছ বিক্রি করেছেন। ৩২ মণ মাছ পেয়েছিলেন। অবরোধের পরে তিন-চার বার সাগরে গেলেও দুইবার টিকতে পেরেছেন। তখন আবহাওয়া কিছুটা ভালো ছিল। তাও একবার মাছ মেলেনি, খালি হাতে ফিরেছেন। নোয়াখালীর বাসিন্দা এই মানুষটা ইলিশের পুরো মৌসুমে মহিপুরে থাকেন। সাগরে মাছ শিকার করে এখানে বিক্রি করেন। কিন্তু এ বছর আছেন চরম বিপাকে। অনিশ্চয়তা যেন কাটছে না।

করিম মাঝি জানালেন, এ পর্যন্ত অন্তত ২৫ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। একেকবারে ৬-৭ লাখ টাকা খরচ হয়। ২৮০ ক্যান বরফ, সাড়ে চার হাজার লিটার জ্বালানিসহ মুদিমনোহরি বাজার খরচ তো আছেই। এখনও বসে বসে খরচের খাতা চলছে। ২০০০ সাল থেকে মাঝি হিসেবে বোটে সাগরবক্ষে মাছ শিকার করছেন তিনি। জানালেন, গত তিন-চার বছর ধরেই মাছের কমতি অনেক। কিন্তু এ বছর যেন মাছ মিলছেই না। ইলিশের আকাল চলছে। তারপরে সাগরে যাওয়ার মতো পরিবেশ নাই। সাগর যখন তখন উত্তাল হয়ে থাকছে। সিগন্যাল থামছে না। লঘুচাপ, নিম্নচাপেই সাগরে যাওয়া যায় না। ৬-৭ বছর আগে এমনটা ছিল না। আগে তিন-চার ঘন্টা বোট চালানোর পরে জাল ফেললে ইলিশ পেতেন। আর এখন ১২-১৪ ঘন্টা বোট চালানোর পরে ১২০-১৩০ মাইল গভীর সাগরবক্ষে গেলে মাছের দেখা মেলে। তাও অনেক কম। পানির অনেক নিচে কিছু ইলিশ পাওয়া যায়। তার কথায়, ‘এহন আর মাছ ভাসে না, নিচে থাকে।’ 

ইলিশের ভরা মৌসুমে আবহাওয়ার উল্টাপাল্টা আচরণের সঙ্গে চলছে ভয়াবহ লোডশেডিং। এর কারণে বরফ থাকে না। 

আব্দুল করিমের মতো ঘাটে ভিড়ে আছেন, তোফাজ্জেল হোসেন। এফবি রাফায়াত ট্রলারের এই জেলেও একই দুরবস্থার কথা জানালেন। ভরা মৌসুমে এবছর ইলিশ মিলছে না বলে জানান তিনি। এই জেলের দাবি, হাজারেরও বেশি ট্রলার আলীপুর-মহিপুর সংলগ্ন খাপড়াভাঙা নদীতে নোঙর করে আছে। কোন জেলে ছেড়া জাল সেলাই করছেন। কেউ আবার আড্ডা দিচ্ছেন। 

একই অবস্থা পটুয়াখালীর বৃহৎ মৎস্য বন্দর মহিপুরের অন্তত ৮০টি আড়তের। সব খাঁ খাঁ করছে। নেই নিলামে মাছ বিক্রির হাকডাক। লোড-আনলোড শ্রমিকরা বেকার সময় কাটাচ্ছেন। মাছ বাছাই করা খন্ডকালীন পুরুষ-নারী তিন শতাধিক শ্রমজীবী বেকার অবস্থায়, বেহালদশায় দিন পার করছেন। করছেন তাঁরা মানবেতর জীবন-যাপন। অনেক জেলে জানান, ধার-দেনায় তারা এখন কাহিল হয়ে গেছেন। বাড়িতে সংসারের লোকজনকে খরচের যোগান দিতে এখন আর মহাজনরা অগ্রিমও দিচ্ছেন না।

মহিপুর মৎস্য আড়ত মালিক সমিতির সহসভাপতি রাজু আহমেদ রাজা জানান, এ বছর মৌসুমের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত গড়ে একেকটি আড়তে ৩০০-৪০০ মণের বেশি ইলিশের আমদানি হয়নি। যা গেল তিন-চার বছর আগে ছিল কমপক্ষে এক হাজার মণ। রাজু আহম্মেদ এও বললেন, সাগরের দূর্যোগ আর সীগন্যাল যেন থামছে না। মাঝারি ধরনের ফিশিং ট্রলারে ভাসা জালে আর ইলিশ পাওয়া যায় না। কারণ মাছ যা পাওয়া যায় তা ৮০-৯০ হাত লম্বা জালের বড় বোট। তারপরও সাগরে গিয়ে ঢেউয়ের তোড়ে কেউ টিকতে পারছেন না। ফিরে আসতে হয় খালি হাতে। কিন্তু খরচ তো আর কমছে না।

বরফকল, ট্রলার মালিক ও প্রভাবশালী মৎস্য ব্যবসায়ী, মহিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. ফজলু গাজী বলেন, ‘ অবরোধের পর থেকে সবই লস। সাগর উত্তাল হয়ে আছে। হাজারো বোট ঘাটে বাধা। তিন-চারবার করে গিয়ে কেউ সাগরে থাকতে পারেনি। প্রচন্ড ঢেউয়ের কারণে ফিরে আসতে হয়েছে। একবারের বেশি কেউ ঠিকমতো জাল ফেলতে পারেনি। এবারের সিজনটা টানা লোকসানে কাটছে।’ 

তিনি আরও জানান, একে তো মৌসুম চলে যাচ্ছে। ইলিশের দেখা নেই। তার উপরে ভয়াবহ লোডশেডিং আরেকদফা বিপদগ্রস্ত করে ফেলেছে। টানা ২০-২২ ঘন্টা কারেন্ট না থাকলে সলিড বরফ উৎপাদন করা যায় না। ফজলু গাজীর দাবি, অন্তত ৩৫টি বরফকলের উৎপাদন করাও এখন সম্ভব হচ্ছে না। এমন কোন ট্রলারমালিক নেই যার গড়ে তিন-চার লাখ টাকা করে লোকসান গুনতে হয়েছে। সামনে আশ্বিনে ইলিশের মূল মৌসুম শেষ হয়ে যাবে। তাই হাজার হাজার জেলে, ট্রলার মালিক, আড়ত মালিকসহ এই পেশা সংশ্লিষ্টদের সংকট এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। 

ফজলু গাজীর ভাষ্য ‘সাগরে মাছ আছে কি নাই তাও বুঝতে পারছি না। কারণ আবহাওয়া খারাপ থাকায় জালই ফেলা যায় না। তিনি দাবি করেন, গেল বছর এমন সময় ইলিশের প্রচুর আমদানি ছিল মহিপুর-আলীপুর বন্দরে।

কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা জানান, এ বছর আবহাওয়া খারাপ থাকায় জেলেদের ইলিশ আহরণে বেশি সমস্যা হচ্ছে। তাঁদের লোকসান ক্রমশ বাড়ছে। তবে সাগর শান্ত হলে সাগরে ঠিকমতো জাল ফেলতে পারলে ইলিশ পাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করলেন এই কর্মকর্তা।

বাংলা স্কুপ/প্রতিনিধি/এইচবি/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ