ঢাকা , রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬ , ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়

খামারে খামারে মাছের মেলা

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১৬-০৮-২০২৬ ০৩:০৮:১৩ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৬-০৮-২০২৬ ০৩:১১:৩৮ অপরাহ্ন
খামারে খামারে মাছের মেলা ছবি : সংগৃহীত
ময়মসিংহের ভালুকায় খামারে উৎপাদিত হচ্ছে জেলার বেশিরভাগ মাছ। দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণেও যথেষ্ট অবদান রাখছে এ উপজেলা। এখানকার মাছ যাচ্ছে অন্য জেলায়ও। স্থানীয় ও উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ধামশুর গ্রামের সাবেক এমএনএ ও এমপি প্রয়াত আফতাব উদ্দিন চৌধুরী চাঁন-এর ছেলে আমিন উল্যাহ চৌধুরী সবুজ মিয়া ১৯৮২ সালে বর্তা গ্রামে তার কৃষি খামার শুরু করেন। ‘সবুজ প্রকল্প’ নামের খামারের জন্য ১৫ একর ডোবা ও উঁচু জমিকে মাছ চাষের উপযোগী করেন। পরে মাছ চাষ বাড়িয়ে একপ্রকার বিপ্লব ঘটান ওই এলাকার চাষিরা।

বর্তমানে ভালুকা পৌরসভাসহ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে বিভিন্ন গ্রামে গড়ে উঠেছে ছোট বড় দেড় হাজার মাছের খামার। এ ছাড়া চাষ হচ্ছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার পুকুরে। এর সঙ্গে জড়িত মোট ১০ হাজার ১৭৬ জন খামারি। খামারিরা নিজের এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য  অন্যদের প্লাবনভূমি, বিল, জলাশয় এবং কৃষিজমি লিজ নিয়ে মাছের চাষ করে আসছেন।

এখানে পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও যুক্ত হচ্ছেন মাছের চাষে। খামারি ছাড়াও ভালুকায় মাছ চাষ ও খামারে কাজের সঙ্গে জড়িত সাড়ে ১৮ হাজারেরও বেশি মানুষ। এদের মধ্যে রয়েছেন জমির মালিক, খামারের পাহারাদার, জেলে, মাছ বহনকারী, আড়তদার, বিক্রেতা ও শ্রমিক। গত অর্থবছরে ভালুকার পুকুরগুলোতে উৎপাদিত হয়েছে পাঙ্গাস, রুই, কাতলা, মৃগেল, গ্রাস কার্প, সিলভার কার্প, তেলাপিয়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৭৮ হাজার ৩০০ টন মাছ, যার বাজার মূল্য ১২০০ কোটি টাকা। 

স্থানীয়দের প্রায় ১৪ হাজার ৬০০  মেট্রিক টন মাছের চাহিদা পূরণ করে উদ্বৃত্ত প্রায় ৬৪ হাজার মেট্রিক টন মাছ ব্যবসায়ী ও পাইকারদের মাধ্যমে ভালুকা থেকে ঢাকা, জামালপুর, শেরপুর, গাজীপুর, গফরগাঁওসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন ভালুকা বাজারের মাছের আড়ত ও বিভিন্ন খামার থেকে মাছ কিনে নিয়ে যান। এদিকে, মাছ চাষে বিশেষ অবদান রেখে ইতোমধ্যে জাতীয় পদক পেয়েছেন লোকমান হোসেন (মরহুম), মো. মজিবর রহমান মল্লিক, মো. জালাল উদ্দিন, সাবেক এমপি আলহাজ্ব কাজিম উদ্দিন আহমেদ ধনু, মো. সাইফুল হুদা সোহাগসহ  কয়েকজন চাষি।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ভালুকা পৌরসভাসহ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে ছোট-বড় প্রায় ১৫ হাজার পুকুরে মাছের চাষ হচ্ছে এবং এখানে বাণিজ্যিক খামার রয়েছে এক হাজার ৪৭৬টি। এসব পুকুরে গত অর্থ বছরে পাঙ্গাস, রুই, কাতলা, মৃগেলসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৭৮ হাজার ৩৪০ টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে, যার বাজার মূল্য প্রায় ১২০০ কোটি টাকা। 

উপজেলায় ছোটবড় মাছ চাষির সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ৬২০ জন। মৎস্যজীবী রয়েছেন সাড়ে ১৮ হাজারেরও বেশি। রয়েছে বেসরকারি পাঁচটি হেচারি ও ১৪০টি নার্সারি। ভালুকায় মাছের চাহিদা ১৪ হাজার ৫৯৯ মেট্রিক টন। উদ্বৃত্ত মাছের পরিমাণ ৬৩ হাজার ৭৩৪ দশমিক ৬ মেট্রিক টন।

রুমা আক্তার নামে উপজেলার রাজৈ ইউনিয়নের বোর্ড বাজার এলাকার একজন নারী খামারি জানান, আগে তিনি একটি পুকুরে মাছের পোনা উৎপাদন করতেন। চলতি বছর তিন একরের জমির খামারে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের চাষ শুরু করেন তিনি।

জাতীয় পদক পাওয়া মাছচাষি মো. সাইফুল হুদা সোহাগ জানান, লন্ডনের ইউনিভার্সিটি অব গ্রিন এইচ থেকে বিজনেস অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টে অনার্স করে দেশে ফেরেন তিনি। এরপর ২০১২ সালে বাড়ির পাশে বাবা ও দুই চাচার কাছ থেকে এক একর জমি ভাড়া নিয়ে ‘ইউনিভার্স ফিশারি’ নামে খামার গড়ে তোলেন। সেখানে চাষ শুরু করেন পাঙ্গাস ও দেশি  জাতের মাছ। 

বর্তমানে উপজেলার মল্লিকবাড়ি, ভান্ডাব ও ভরাডোবা এলাকায় তার প্রায় ৮০ একর আয়তনের তিনটি মাছের খামারে ছোটবড় ১০টি পুকুর রয়েছে। খামারের বেশিরভাগ জমিই বিভিন্ন মলিকের কাছ থেকে লিজ নেওয়া। 

তিনটি খামারে প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। তিনি নিজে খামারের দেখাশোনা ও মাছের আড়তদারি করেন। বিদেশে মাছ রপ্তানির বিষয়টিও ভাবছেন তিনি। মাছ রপ্তানির জন্য ইতোমধ্যে তিনি একাধিক দেশ সফর করেছেন।

আমিন উল্যাহ চৌধুরী সবুজ মিয়া বলেন, ‘আমি যখন মাছের চাষ শুরু করি, তখন লোকে বলাবলি করতো, মাছের আবার চাষ হয় নাকি? মাছ খাল-বিল-জলাশয়ে এমনিতেই জন্মায় এবং বেড়ে ওঠে। পরে ভালুকায় মাছচাষে বিপ্লব ঘটেছে। তবে, কিছু খামারি বেশি লাভের আশায় তাদের খামারের মাছের খাবার হিসেবে অখাদ্য, কুখাদ্য ব্যবহার করছেন, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এ কারণে আমাদের খামারে উৎপাদিত পাঙ্গাস মাছ বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না। এসব থেকে চাষিদের অবশ্যই বিরত থাকা উচিত।’

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সাইদুর রহমান বলেন, ভালুকায় উৎপাদিত মাছ দেশে আমিষের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট অবদান রাখছে। মাছ উৎপাদনে ভালুকা উপজেলা জেলায় প্রথম স্থানে রয়েছে। এখানে নিরাপদ মাছ উৎপাদনে নিয়মিত খামার পরিদর্শন, পানির গুণগত মান পরীক্ষা, নীরবচ্ছিন্ন কারিগরি পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি চাষিদের জন্য প্রশিক্ষণ, মাঠ দিবস, মতবিনিময় ও সচেতনতামূলক সভা করা হয়।  মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, এসবের মাধ্যমে তাদেরকে সচেতন করে নতুন নতুন প্রযুক্তির সহযোগিতা দেওয়া হয়। তাছাড়া, মাছ সংশ্লিষ্ট আইনের যথযথ বাস্তবায়নও করা হয়।

বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন


 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ