শহর ও গ্রামাঞ্চলে সমানতালে চলছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট
সুনামগঞ্জে ভয়াবহ লোডশেডিং
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১২-০৮-২০২৬ ১১:৩৩:২৭ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় :
১২-০৮-২০২৬ ১২:১০:৫১ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
তীব্র গরমে পুড়ছে সুনামগঞ্জ। ভোরের আলো ফোটার পর থেকে অসহনীয় তাপপ্রবাহে ওষ্ঠাগত জনজীবন। এ অবস্থায় চলছে লাগাতার লোডশেডিং। শহর ও গ্রামাঞ্চলে সমানতালে চলছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাওরপাড়ের বাসিন্দারা।
বিদ্যুতের এমন পরিস্থিতিতে ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। কোথাও কোথাও লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসছেন স্থানীয়রা। দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক ও নিরবচ্ছিন্ন করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
লোডশেডিংয়ের নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় ক্ষোভ বেড়েছে দ্বিগুণ। স্থানীয়দের অভিযোগ, কখন বিদ্যুৎ যাবে কিংবা আসবে এ বিষয়ে আগাম কোনো তথ্য প্রদান করে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় একদিকে যেমন বাসাবাড়িতে দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
গ্রাহকদের দাবি, লোডশেডিং করতে হলে অন্তত আগে থেকে সময়সূচি প্রকাশ করা হোক। কোন এলাকায় কখন বিদ্যুৎ থাকবে না- এ বিষয়ে আগাম জানানো হলে মানুষ প্রয়োজনীয় কাজগুলো সেই অনুযায়ী করতে পারবেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক দিন ধরে সুনামগঞ্জে গরমের তীব্রতা বেড়েছে। দিনের বেলায় ঘরের ভেতরে থাকাও কঠিন হয়ে পড়ছে। গরম থেকে স্বস্তি পেতে মানুষ ফ্যান, চার্জার ফ্যান, এসি কিংবা অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। প্রয়োজনের সময়ই দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্ভোগ আরো বেড়েছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে বিপাকে পড়ছেন পরিবারের সদস্যরা। রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে। অনেকে বাধ্য হয়ে ঘরের বাইরে কিংবা রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করছেন।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের ষোলঘর এলাকার বাসিন্দা জাওয়াদুর রহমান সায়েম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। বিদ্যুৎ কখন যাবে আর আসবে তার কোনো ঠিক নেই। এভাবে দেশে মানুষ বসবাস কিভাবে করবে বুঝি না।”
শহরের আলীপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ হাসান বলেন, “দিনে কর্মস্থলে কাজ করা এখন দায় হয়ে পড়েছে, সারাদিন কষ্ট করে এসে বাসায় যখন দেখি কারেন্ট নেই তখন বলেন মনটা কিভাবে ভালো থাকে?, গরমে সারা শরীর লাল হয়ে যাচ্ছে। গোসল যে করব ট্যাংকিতে সে পানিও নেই, কারেন্টের জন্যে পানিও তুলতে পারিনি। এই লোডশেডিং থেকে আমরা মুক্তি চাই।”
বড়পাড়া এলাকার বাসিন্দা আলেয়া বেগম বলেন, “আমার ভাগ্নের কয়েকদিন আগে অপারেশন হয়েছে। তাকে সবসময় ফ্যানের বাতাসে রাখতে হয়। সুনামগঞ্জে যেভাবে ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাচ্ছে, তাতে ছোট বাচ্চাটাকে নিয়ে আমরা খুবই দুশ্চিন্তায় আছি। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে গেলে তাকে অস্বস্তিতে পড়তে হয়। একটি অসুস্থ শিশুকে নিয়ে এভাবে থাকা আমাদের জন্য খুব কষ্টকর।”
ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রভাব
দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়েছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও। দোকান, ছোট কারখানা, ওয়ার্কশপ, কম্পিউটার ও ফটোকপির দোকানসহ বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসাগুলোতে কাজ ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ীকে অতিরিক্ত খরচ করে জেনারেটর কিংবা বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।
দোকানিদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ না থাকলে শুধু ব্যবসার কাজ বন্ধ থাকে না, গরমের কারণে ক্রেতারাও দোকানে বসতে চান না। ফলে একদিকে ব্যবসায়িক ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থা করতে গিয়ে বাড়তি খরচ হচ্ছে।
ছাতক উপজেলার ব্যবসায়ী মেহেদী হাসান বলেন, “সকালে দোকানে এসে দেখি বিদ্যুৎ নেই। মঙ্গলবারের কিছু কাজ বাকি আছে, একটু পরে কাস্টমার আসবে কিভাবে দেব।”
তিনি বলেন, “দিনে কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় আমাদের ব্যবসা অচল হয়ে পড়ছে। কম্পিউটার ও ফটোকপির কাজ করা যায় না, আবার জেনারেটর চালাতে বাড়তি খরচ হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে যাবে।”
ছাতক উপজেলার ধারণ বাজার এলাকার চা বিক্রেতা শামীম আহমেদ বলেন, “বিদ্যুৎ না থাকলে গরমের কারণে ক্রেতারাও দোকানে থাকতে চান না। ফলে বিক্রি কমে গেছে।”
এদিকে, শহরের সেলুনগুলোতে কাজ ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় নাপিত শুভন চক্রবর্তী বলেন, “মানুষের চুল-দাড়ি হাতে কাটার পাশাপাশি মেশিনেও কাটতে হয়, কারো চুল মেশিনে কাটা অবস্থায় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেলে আমরা বড় বিপদেই পড়ি, বিদ্যুতের জন্যে অনেক কাস্টমাকে বসিয়ে রেখে কাজ করতে হয়। কারেন্টের এই যন্ত্রণা কবে শেষ হবে তা উপর ওয়ালা ভালো জানেন।”
বর্তমানে চাকরি, ব্যবসা ও যোগাযোগের বড় একটি অংশ অনলাইননির্ভর। কিন্তু দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় অনলাইনভিত্তিক কাজ করা ব্যক্তিরাও সমস্যায় পড়ছেন। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা বলছেন, দিনে বা রাতে গরমের কারণে পড়ালেখায় বাচ্ছারা মনোযোগ দিতে পারছে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ ও সাধারণ মানুষের প্রশ্ন
বিদ্যুতের এই পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দারা। অনেকেই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকার বিষয়টি তুলে ধরে দ্রুত সমাধানের দাবি জানাচ্ছেন। তীব্র গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকাকে দেশে ‘জনদুর্ভোগের নতুন মাত্রা’ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
আমির মাহবুব নামের একজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লেখেন, “দেশে কি পরিমাণ লোডশেডিং হচ্ছে আইডিয়া আছে? সরকার যদি লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারে তবে এই আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে যাবে। আজকে সুনামগঞ্জের মতো জায়গায় লোডশেডিং এর প্রতিবাদ মহাসড়ক অবরোধ করেছে জাউয়া বাজার এলাকার স্থানীয়রা। এটি দিন দিন বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে। সরকারের উচিৎ বিদ্যুৎ গ্যাসে ফোকাস করা।”
এইচ কে মামুন নামের আরেকজন তার ফেসবুক আইডিতে লেখেন, “বিদ্যুৎ বিভাগকে একটি প্রশ্ন- এভাবে আর কতদিন? রাত ৮টা থেকে বিদ্যুৎ নেই। এখন রাত ১১টা- টানা ৩ ঘণ্টা ধরে অন্ধকারে মানুষ। প্রচণ্ড গরমে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা বন্ধ, ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতি, বাসাবাড়িতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত- কিন্তু এর কোনো নির্দিষ্ট হিসাব নেই, নেই কোনো জবাবদিহি।”
তিনি আরো লিখেছেন, ‘বিদ্যুৎ বিল দিতে একদিন দেরি হলে জরিমানা আছে, সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার হুমকি আছে। তাহলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে জনগণের কাছে বিদ্যুৎ বিভাগের জবাবদিহি কোথায়? বিদ্যুৎ কোনো বিলাসিতা নয়- এটি মানুষের মৌলিক সেবা। বিল যদি পুরোটা নেন, তাহলে সেবাটাও যথাযথভাবে দেন। অযৌক্তিক ও অনিয়ন্ত্রিত লোডশেডিং বন্ধ করুন।”
ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে সুনামগঞ্জে সড়ক অবরোধ
জেলাজুড়ে তীব্র গরমের মধ্যেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থানে টায়ার জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয়রা। সোমবার (১০ আগস্ট) সন্ধ্যা ৭টা থেকে জেলার জাউয়া বাজার, চেচান ও কালারুকাসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন তারা। ফলে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কসহ ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ না থাকায় চরম গরমে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবিতে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
লোডশেডিং নিয়ে যা বলছে বিদ্যুৎ বিভাগ
সুনামগঞ্জে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন ১২টি উপজেলায় প্রায় ৪ লাখ গ্রাহক রয়েছেন। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কম থাকায় প্রতিদিন গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। যেখানে জেলার বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদা-সরবরাহের ঘাটতির কারণে বিভিন্ন এলাকায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
সুনামগঞ্জ জেলা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী প্রকৌশলী রাসেল আহমাদ বলেন, “আমাদের লোডশেডিংয়ের একটা শিডিউল আছে, আমাদের একটা ফেসবুক পেইজ রয়েছে, সেখানে আমরা গ্রাহকদের জানাতাম, কিন্তু সেই শিডিউল টাও মেইনটেইন করা যায় না। ধরুন, আগামীকাল কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিবে সেটা নির্দিষ্ট নয়, তাই সেটাও করা সম্ভব হয় না। আমরা প্রতিদিন যে পরিমাণ লোড পাই সেই আলোকেই আমরা লোডশেডিং করতে হয়। কোনোদিন বেশি কোনো দিন কম। এটা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া লাগে।”
তিনি বলেন, “গ্রাহকদের কবে থেকে শতভাগ বিদ্যুৎ দিতে পারব এই তথ্য আমি সঠিকভাবে বলতে পারি না। এটা জাতীয়ভাবে তারা বলতে পারেন। আমাদের প্রতিদিনের গড়পড়তা চাহিদা সাড়ে ১৩ থেকে ১৪ মেগাওয়াট কিন্তু আমি পাচ্ছি সাড়ে ৬ থেকে ৮-সাড়ে ৮ অথবা মাঝে মধ্যে ৯ মেগাওয়াট। আমাদের বরাদ্দ বাড়ালে আমরা গ্রাহকদেরকে সঠিক সেবাটা দিত পারব।”
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স