সারের দামে হতাশ কৃষক: ডিলারের কাছেও মিলছে না সার
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৯-০৮-২০২৬ ০৩:০০:০৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৯-০৮-২০২৬ ০৩:০০:০৪ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
রাজশাহী অঞ্চলজুড়ে আমন রোপনে কৃষকদের কর্মচাঞ্চল্য বেড়েছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই গ্রামের পথে পথে শুরু হয় কৃষকদের কর্মযজ্ঞ। কেউ কাঁধে ধানের চারা, কেউ ট্রাক্টর নিয়ে জমি প্রস্তুতের কাজে ব্যস্ত। আবার কোথাও নারী-পুরুষ একসঙ্গে কোমর পানিতে নেমে সারিবদ্ধভাবে আমনের চারা রোপণ করছেন। রাজশাহীর গ্রামীণ জনপদজুড়ে এখন আমন রোপণের ব্যস্ততা। কিন্তু আমন রোপনের মধ্যেও নির্ধারিত দামে সার মিলছে না। ভর্তুকির সারও কৃষকের লাগালের বাইরে চলে গেছে।
আমন মৌসুমে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানো হলেও কৃষকরা সার পাচ্ছেন না। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। তবে অনুমোদিত ডিলাররা দাবি করছেন, সরবরাহ পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে মজুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।
রাজশাহীর বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ অনুমোদিত ডিলারের কাছে ভর্তুকি মূল্যের সার পাওয়া যাচ্ছে না। খুচরা বিক্রেতারা প্রকাশ্যে চড়া দামে সেই একই সার বিক্রি করছে।
সরকার নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ৫০ কেজির এক বস্তা ট্রিপল সুপার ফসফেট বা টিএসপি ১৩৫০ টাকায় এবং ডাইঅ্যামোনিয়াম ফসফেট বা ডিএপি ১০৫০ টাকায় বিক্রি হয়। তবে কৃষকরা বলেছেন, অনুমোদিত ডিলারদের কাছে সার না পাওয়ায় তারা টিএসপির জন্য ১৭০০-১৮০০ টাকা এবং ডিএপির জন্য প্রায় ১৬০০ টাকা দিয়ে কিনছে।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা দোকান খোলার কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের মজুত শেষ হয়ে গেছে বলে জানিয়ে দিচ্ছেন। এবং তারা ক্যাশ মেমো দিতে অস্বীকার করছেন।
পবা উপজেলার বড়াইকুড়ি গ্রামের কৃষক রাসেল হোসেন বলেন, তার কৃষি কার্ড আছে। কয়েকবার অনুমোদিত ডিলারের কাছে গিয়েও সার কিনতে পারেননি। সরকারি দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বেশি দাম দিতে রাজি থাকলে ঘাটতি নেই।
নওহাটা বাজারে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের অনুমোদিত ডিলার মেসার্স হক অ্যান্ড সন্স এন্টারপ্রাইজে ভর্তুকির সার পাওয়া যায়নি। দোকান মালিক ও ডিলার আব্দুল হক বলেন, ৪২টি মৌজার কয়েক হাজার কৃষককে সার সরবরাহ করতে হচ্ছে। জুলাই মাসে মাত্র ২২ বস্তা টিএসপি, ৭০ বস্তা মিউরেট অফ পটাশ বা এমওপি এবং ১১০ বস্তা ডিএপি পেয়েছেন। এই সার দুই-তিনদিনের মধ্যে শেষ হয়ে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনস্থ আরেকটি অনুমোদিত ডিলার তাসনিম এন্টারপ্রাইজের কর্মচারি জানান, তাদের সারের মজুত শেষ হয়ে গেছে। তবে পরে ফোনে যোগাযোগ করা হলে দোকান মালিক ফজলুর রহমান দাবি করেন, সার ছিল।
অনুমোদিত ডিলারের পাশের খুচরা দোকানে ৫০ কেজির এক বস্তা ডিএপি সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫৫০ টাকা বেশি দামে অর্থাৎ ১৬০০ টাকা চান। তিনি জানান, বিভিন্ন উৎস থেকে সার সংগ্রহ করা হচ্ছে। তার দাবি, ভর্তুকির সার তিন-চারজন মধ্যস্থতাকারীর হাত ঘুরে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পৌঁছায়।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয় সূত্র জানা গেছে, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা নিয়ে গঠিত রাজশাহী কৃষি অঞ্চলে আমন চাষের জন্য মোট ৪ লাখ ১০ হাজার হেক্টর জমি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। শনিবার (৮ আগস্ট) পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৩০ শতাংশ জমিতে চারা রোপণ করা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের রেকর্ড অনুযায়ী, রাজশাহী জেলায় চলতি বছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে ইউরিয়া ছাড়া তিনটি প্রধান সারেরই বরাদ্দ ২০২৫ সালের মাসগুলোর তুলনায় বেশি পেয়েছে। জেলায় টিএসপি, ডিএপি এবং এমওপির ২০২৫ সালের জুলাই মাসে বরাদ্দ ছিল ৫ হাজার ৮৭৬ টন। ২০২৬ সালে তা ৭ হাজার ৩৩ টন হয়েছে। আগস্ট মাসের বরাদ্দও বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে টিএসপি ১ হাজার ৪৩০ টন থেকে বেড়ে ১ হাজার ৫১১ টন; ডিএপি ২ হাজার ৪০৪ টন থেকে বেড়ে ২ হাজার ৬৪৭ টন এবং এমওপি ১ হাজার ৭০৯ টন থেকে বেড়ে ১ হাজার ৭৬০ টন হয়েছে। নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেও বেশি বরাদ্দ মিলেছে। অন্যদিকে নাটোর জেলায় সামান্য হ্রাস রেকর্ড করা হয়েছে।
বিএডিসি রাজশাহী শাখার সহকারী পরিচালক (সার) নাসির উদ্দিন বলেন, বিএডিসি কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত পরিমাণ অনুযায়ী সার বিতরণ করেছে। তারা শুধু মন্ত্রণালয় কর্তৃক বরাদ্দকৃত পরিমাণ সরবরাহ করেন। কিছু কৃষক সুপারিশকৃত মাত্রার চেয়ে বেশি সার প্রয়োগ করায় মৌসুমি চাহিদা বেড়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের উপ-পরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, সারের ঘাটতি নিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে অভিযোগ পাননি। তবে সব জায়গায় আমন রোপণ চলছে। কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন। তিনি আশা করেন, এবারও আমনের ভালো ফলন হবে।
জেলা সার বিতরণ কমিটির প্রধান এবং রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, সারের দাম বেশি এই অভিযোগ কোনো কৃষক করেনি। তবে তিনি এই বিষয়ে খোঁজ নেবেন। বিষয়টি তদন্ত করা হবে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স