বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন
মির্জা ফখরুলই কি হচ্ছেন বঙ্গভবনের নতুন বাসিন্দা?
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
০৭-০৮-২০২৬ ০৭:১৬:৩০ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৭-০৮-২০২৬ ০৭:১৮:০২ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
বঙ্গভবনের পরবর্তী বাসিন্দা হিসেবে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই এখন দলটির ভেতরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। দায়িত্বশীল একাধিক বিএনপি নেতা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি পদে তাকে প্রার্থী করার বিষয়ে দলের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা চলছে। আগে আরও কয়েকজনের নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুলের পক্ষেই সমর্থন বেশি জোরালো হয়েছে।
দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা জানিয়েছেন, বিএনপির শীর্ষ নেতা ইতোমধ্যে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়নের প্রশ্নে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলোচনা করেছেন। ওই আলোচনার সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দল থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
বিএনপি এবার রাষ্ট্রপতি পদে একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদকে দেখতে চায় এবং তিনি দলটির ভেতর থেকেই আসবেন—এমন অবস্থানের ইঙ্গিত দলটির নেতারা আগে থেকেই দিয়ে আসছিলেন। সেই অবস্থান থেকেই শেষ পর্যন্ত দলের মহাসচিবের নামটি সবচেয়ে বেশি বিবেচনায় এসেছে বলে জানিয়েছেন বিএনপির একাধিক নেতা।
এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করে। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। এই বাস্তবতায় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী কোনো প্রার্থী দিচ্ছে না। ফলে বিএনপি যাকে প্রার্থী করবে, তারই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শাসনামলে দলটির মনোনয়নে নির্বাচিত ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মেয়াদের প্রায় দেড় বছর বাকি থাকতেই গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশন আগামী ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে তফসিল ঘোষণা করেছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিবেচনায় আনার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। বিএনপির ভেতরে তিনি একজন পরীক্ষিত নেতা হিসেবে পরিচিত। একইসঙ্গে দলটির বাইরে বৃহত্তর রাজনৈতিক অঙ্গন এবং সাধারণ মানুষের কাছেও তার ইতিবাচক ভাবমূর্তি ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলে মনে করছে বিএনপি। এসব দিক গুরুত্ব দিয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তাকে সম্মান জানাতেই রাষ্ট্রপতি পদে তার নাম বিবেচনায় আনছে বলে জানিয়েছেন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা।
বিএনপি নেতাদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের মুখে দলটি বারবার বিপর্যস্ত হয়েছে। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে জীবনের শেষ প্রান্তে কারাগারে থাকতে হয়েছে। অন্যদিকে দলের আরেক শীর্ষ নেতা তারেক রহমান দীর্ঘ সময় লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন। শীর্ষ দুই নেতার অনুপস্থিতিতে দেশে সাংগঠনিক সংকট মোকাবিলা, আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তোলা এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুলই ছিলেন সবচেয়ে দৃশ্যমান নেতৃত্ব।
বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতার মতে, তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করেই দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন; তবে দেশের ভেতরে রাজনৈতিক মাঠে থেকে আন্দোলন-সংগ্রাম সংগঠিত করা এবং বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। দলটির একাধিক নেতা বলছেন, এই ভূমিকাকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেন। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং পরে মহাসচিব হিসেবে দলের ভেতর-বাইরে তিনি যে অবস্থান তৈরি করেছেন, তাকে সম্মান জানানোর বিষয়টিও বিএনপিতে বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে।
দলীয় সূত্রগুলো আরও বলছে, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত হলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে নতুন করে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য তিন মাসের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতায় সেই সময়েও রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এসব দিক বিবেচনায় নিয়েই এবার দলীয় ভেতর থেকে একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদকে রাষ্ট্রপতি করতে চায় বিএনপি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর মির্জা ফখরুল বর্তমানে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।
মির্জা ফখরুল ছাড়া আরও কয়েকজনের নামও গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় ছিল। তাদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. মঈন খান ও নজরুল ইসলাম খান। এছাড়া ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের নামও আলোচনায় উঠে এসেছিল।
তবে মির্জা ফখরুলের নাম বেশি গুরুত্ব পাওয়াকে ঘিরে বিএনপির ভেতরে দুই ধরনের বিশ্লেষণও রয়েছে। এক পক্ষ মনে করে, এতদিনের ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাকেই বঙ্গভবনে পাঠানো উচিত। অন্য একটি অংশের মতে, বঙ্গভবনের বাইরে সরকার পরিচালনায় মির্জা ফখরুলের মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের প্রয়োজন রয়েছে; তিনি সেখানে না থাকলে ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
জামায়াত কী করছে?
এদিকে, দলীয় নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেওয়া হয়েছে। দলীয় সূত্রের দাবি, তিনি এ বিষয়ে শিগগিরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী না দেওয়ার কারণও জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের মতে, বর্তমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল যাকে মনোনীত করবে, তার বিপরীতে প্রার্থী দিলেও নির্বাচিত হওয়ার বাস্তব সুযোগ নেই। সে কারণেই জামায়াত প্রার্থী দিচ্ছে না। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে সরকারি দল বিএনপি সংসদের বিরোধী দলগুলোর কোনো মতামত নিচ্ছে না।
বাংলাদেশে জেনারেল এরশাদের শাসনের পতনের পর সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কেবল একবারই সংসদে ভোটাভুটি হয়েছিল। ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত সেই ভোটে সরকারি দল বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মনোনয়ন দাখিলের শেষ তারিখ ১৩ আগস্ট, যাচাই-বাছাই ১৬ আগস্ট এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৮ আগস্ট। আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত দিনে মনোনয়নপত্র যাচাই করবেন নির্বাচনি কর্মকর্তা। যদি মাত্র একজন প্রার্থী থাকেন এবং তার মনোনয়নপত্র বৈধ বলে বিবেচিত হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশন তাকেই নির্বাচিত ঘোষণা করবে। আর একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হলে কমিশন নির্বাচনের জন্য তাদের নাম ঘোষণা করবে। সে ক্ষেত্রে সংসদ অধিবেশন না থাকলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজনে স্পিকার সাত দিন আগে বৈঠক আহ্বান করতে পারবেন।
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি পদটি শূন্য হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিএনপির ভেতরে নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তা নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে দলটির প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়া প্রায় নিশ্চিত। সেই বাস্তবতায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামই এখন সবচেয়ে জোরালোভাবে সামনে এসেছে।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স