গণগবেষণার ফলাফল বিষয়ক আলোচনা সভা
কলাপাড়ায় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে কৃষি পেশায় ভয়াবহ সংকট
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
০৩-০৮-২০২৬ ০৪:০২:২৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৩-০৮-২০২৬ ০৪:০২:২৯ অপরাহ্ন
ফোকাস বাংলা নিউজ
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ধানখালী ইউনিয়নে স্থাপিত মেগাপ্রকল্প কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রেক্ষিতে কৃষি পেশায় ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। কৃষিজমি ও উন্মুক্ত জলাশয় হারিয়ে যাওয়ায় এসব মানুষকে তাঁদের চিরাচরিত স্বাধীন পেশা ছাড়তে হয়েছে। এখন এসব মানুষ বাধ্য হয়ে কোন উপায় না পেয়ে স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ধানখালী ইউনিয়নের পরিবেশগত ও আর্থ-সামাজিক জীবনযাত্রার ওপর মেগা উন্নয়ন প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে অনুষ্ঠিত গণগবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে। ওই ইউনিয়নের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিজস্ব উদ্যোগে পরিচালিত গণগবেষণার তথ্যের উপর ভিত্তি করে ‘ আমাদের মাটি, আমাদের জীবন’ শীর্ষক প্রকাশিত গণগবেষণাপত্রে এই সংকটের চিত্র উঠে এসেছে।
স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা প্রান্তজনের বাস্তবায়নে ও প্রকাশিত এই গণগবেষণা উন্নয়ন সংস্থা একশন এইড বাংলাদেশ সহায়তা করেছে। গণগবেষণায় বলা হয়েছে, চিরায়ত স্বাধীন পেশা কৃষিতে ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নকৃত এলাকার ৪৫৭ জন উত্তরদাতার ওপর পরিচালিত জরিপে বলা হয়েছে, ওখানকার প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ছিল কৃষি। জরিপে অংশ নেয়াদের মধ্যে ১৬১ জন কৃষক বলেছেন তারা এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পেশায় সচল ছিলেন। ছিলেন স্বাবলম্বী। কিন্তু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পরে কৃষি পেশায় টিকে আছেন মাত্র ৫১ জন। বাকি ১১০ জনে পেশা হারিয়েছেন। এসব মানুষ সরাসরি তাদের আয়ের মূল উৎস ও স্বাধীন পেশা কৃষিকাজ হারিয়েছেন।
উত্তরদাতাদের মধ্যে গৃহিনীর সংখ্যা ৯৮ জন থেকে ১৫২ জনে উন্নীত হয়েছে। অথচ যাদের সংখ্যা বেড়েছে তাঁরা আগে কৃষিকাজ করতেন। একইভাবে প্রকল্পের আগে উত্তরদাতাদের মধ্যে ৪৯ জন দিনমজুর ছিলেন। পরে তাঁদের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৭১ জন। কর্মসংস্থানের অভাবে বেকার ৭ জনের জায়গায় বেড়ে হয়েছে ৩২ জন। প্রকল্প বাস্তবায়নের পরে এসব পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতায় ধ্বস নেমেছে, বাড়ছে সামাজিক সংকট। এই নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী প্রকল্পের আগে ভালো কিংবা খুব ভালো আছেন বলেছেন, ৬৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ। আর প্রকল্প বাস্তবায়নের পরে ভালো কিংবা খুব ভালো আছেন বলে মতামত দিয়েছেন মাত্র ১০ দশমিক ০৭ শতাংশ মানুষ। ৭১ দশমিক ৩৩ শতাংশ বলেছেন, বর্তমানে খারাপ কিংবা খুব খারাপ আছেন। একইভাবে পরিবশেগত বিপর্যয় ও বহুমাত্রিক ঝুঁকি, সুপেয় পানির সংকট ও জলাশয়ের মরণদশা, বিশুদ্ধ বায়ুর অভাব, ক্ষতিগ্রস্ত জীববৈচিত্র ও বাস্তুসংস্থানের সংকট বেড়েছে। বাস্তুতন্ত্র ভেঙে পড়েছে বলে মতামত দেয়া হয়েছে। মেগা প্রকল্পের আগে ধানখালীতে নদী কিংবা খালে ইলিশসহ ত্রিশের অধিক প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন এসব নাই বললেই চলে মতামত দেয়া হয়েছে। এভাবে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্য সংকটসহ বহুমাত্রিক রোগবালাই, নারীদের ওপর লিঙ্গভিত্তিক প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই গণগবেষণা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন এলাকায় পরিচালিত হয়। এর প্রভাবকে বলা হয়েছে জীবনমুখী পর্যবেক্ষণের ফলাফল । গবেষণায় ধানখালীর ৮টি ওয়ার্ডের প্রথম পর্যায়ে ৪৫৭টি ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩৯৬টি পরিবারের ওপর বিস্তারিত সামাজিক ও পরিবেশগত জরিপ চালানো হয়। এছাড়া উঠান বৈঠক ও মূল তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করা হয়েছে।
সোমবার দুপুরে কলাপাড়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তন ‘পায়রা’ অনুষ্ঠিত গণগবেষণার ফলাফল বিষয়ক আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন কলাপাড়া পরিবেশ ও জনসুরক্ষা মঞ্চের কার্যনির্বাহী সদস্য মেজবাহউদ্দিন মাননু। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: আরিফুজ্জামান। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা টেনমং, উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো: মোকসেদুল আলম, সমাজসেবা কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ আরিফুর রহমান, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা তাছলিমা আখতার, কলাপাড়া থানার এসআই আব্দুল হামিদ। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, গণগবেষক মেহেদী হাসান, হালিমা আয়েশা। বিষয়ের উপর পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনা করেন একশন এইড বাংলাদেশের এসোসিয়েট প্রোগ্রাম অফিসার মারজিয়া জাহান। অনুষ্ঠানটি সঞ্চলনা করেন প্রান্তজনের মাঠ সমন্বয়কারী সাইফুল্লাহ মাহমুদ। অনুষ্ঠানে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ, সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ, গণগবেষকবৃন্দ, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ অংশ নেন।
উল্লেখ্য কলাপাড়ার ধানখালীতে ১৩২০ মেগাওয়াট পায়রা (বিসিপিসিএল) ও একই উৎপাদন ক্ষমতার পটুয়াখালী (আরএনপিএল) দু’টি বিদ্যুত প্লান্ট সচল রয়েছে। আরো একটি (আশুগঞ্জ) বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণকরা হয়েছে। এসব জমি অধিগ্রহণে সরাসরি অন্তত ৬৮৫ পরিবার গৃহহারা হয়েছে। সরাসরি এসব পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এছাড়া পরোক্ষভাবে অন্তত দেড় হাজার কৃষক ও জেলে পরিবার কর্মস্থান হারিয়েছেন। ক্ষতির কবলে পড়েছেন। বর্তমানে প্রকল্প এলাকার মানুষ তাঁদেও এসব ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য সামাজিক আন্দোলন করছেন। তাঁরা সরকারের এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টদেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স