বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে রূপপুর
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
০২-০৮-২০২৬ ১২:৪৬:১৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০২-০৮-২০২৬ ০১:১০:৫০ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে চূড়ান্ত ধাপের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ পর্যায়ে। আগামী মাসে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে তার আগে প্রতিটি পরীক্ষার ফল পর্যালোচনা করে অনুমোদন দেবে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র বলছে, প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ করানোর কাজ গত ১২ মে শেষ হয়েছে। চলমান পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হলে চুল্লিতে নিয়ন্ত্রিত বিভাজন বিক্রিয়া শুরু করা হবে। এতে উৎপন্ন তাপ দিয়ে বাষ্প তৈরি করে টারবাইন ঘোরানোর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় ৩৩তম দেশ হবে বাংলাদেশ।
অবশ্য আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে রূপপুর কর্তৃপক্ষের। যদিও ৫ মাসে এটি সম্ভব না-ও হতে পারে বলে মনে করছেন বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, প্রথম ধাপে ২ হাজার ৪৬টি এবং দ্বিতীয় ধাপে ৯০টি পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়েছে। এখন দ্বিতীয় ধাপের চূড়ান্ত পর্যায়ে আরও ১৮টি পরীক্ষা বাকি আছে। এসব পরীক্ষা বেশ জটিল। প্রতিটি ধাপে যাচাই করে অনুমোদন দিচ্ছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহের সময়ও চলবে নানা পরীক্ষা। টানা ৭-৮ মাস চলতে পারে পরীক্ষামূলক উৎপাদন। সব পরীক্ষা শেষ করে আগামী বছর একটি ইউনিট থেকে পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে।
এনপিসিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহেদুল হাছান বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি ধাপ সংবেদনশীল, জটিল ও নিরাপত্তানির্ভর। প্রতিটি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর তার ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়। প্রয়োজন হলে সংশোধন করে পরবর্তী ধাপে এগোনো হয়। তাই আগে থেকে নির্দিষ্ট করে উৎপাদনের সময় বলা কঠিন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার সব তথ্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়। তারা পর্যালোচনা করছে। তাদের অনুমোদন পেলে শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কমিশন। কমিশনের অধীনে পরিচালনার কাজটি করছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)। পাবনার রূপপুরে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট।
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র সূত্র বলছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২৪ ঘণ্টা সমান হারে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। প্রতি দেড় বছর পর নতুন জ্বালানি দিতে হবে। জ্বালানি বর্জ্য বের করা, নতুন জ্বালানি ঢোকানো ও রক্ষণাবেক্ষণ মিলে একটি ইউনিট সর্বোচ্চ দুই মাস বন্ধ থাকতে পারে।
ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানিতেও ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় পদার্থ থাকে। তাই বিশেষ নিরাপত্তার মাধ্যমে এটি রাশিয়া নিয়ে যাবে। এরপর তা প্রক্রিয়াজাত করে ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় পদার্থ মাটির ৪০০ মিটার নিচে পুঁতে রাখবে তারা। ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানির বর্জ্য নিতে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট মস্কোতে। এ চুক্তি অনুসারে বর্জ্য নেওয়া নিয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছে।
তবে এটি নেওয়ার বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিদ্যুৎকেন্দ্রের দায়িত্বশীল দুজন কর্মকর্তা বলেন, বর্জ্য বের করার পর সঙ্গে সঙ্গে পাঠানো যায় না। এটি নিরাপদে রেখে শীতল করতে হয়। চাইলে ১০ বছর পর্যন্ত রূপপুরে এটি নিরাপদে রাখা যাবে। তাই নেওয়ার আগে জাহাজ ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ হিসাব করে বাণিজ্যিক প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে। এটি আগাম করা হলে ভুল হতে পারে; বরং রাশিয়া লাভবান হবে, তাই সময় নেওয়া হচ্ছে।
রূপপুরে পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়ার কোম্পানি টিভিএল। প্রথম তিন বছরের জ্বালানি নির্মাণ চুক্তির মধ্যে ধরা আছে, যা থেকে প্রথম ধাপের জ্বালানি দেশে আসে। এটি শেষ হলে চুক্তি অনুসারে নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ করবে টিভিএল।
রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের সূত্র বলছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পুরো মেয়াদে জ্বালানি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে টিভিএলের। তবে বাংলাদেশ চাইলে যেকোনো সময় চুক্তি থেকে বের হয়ে যেতে পারবে। চুক্তিতে জ্বালানির দাম নির্দিষ্ট করা নেই, তবে একটি সূত্র দেওয়া আছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক জার্নালে পারমাণবিক জ্বালানির দাম নিয়মিত প্রকাশ করা হয়। ওই দাম ধরেই সূত্র অনুসারে জ্বালানির দাম নির্ধারিত হবে। এর আগে ২০০৭ সালে পারমাণবিক জ্বালানির দাম অনেক বেড়ে যায়। এমন কোনো পরিস্থিতি হলেও যাতে দাম অস্বাভাবিক না বাড়ে, তাই চুক্তিতে দামের একটি উচ্চসীমা বেঁধে দেওয়া আছে।
২০১১ সালে বাংলাদেশ সরকার ও রাশান ফেডারেশন সরকারের মধ্যে একটি আন্তরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। চুক্তির আওতায় ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রোসাটমের ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোটের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জেনারেল কন্ট্রাক্ট স্বাক্ষর করা হয়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল রূপপুর প্রকল্পের মেয়াদ। সময়সীমা দুই বছর বাড়িয়ে একটি অতিরিক্ত চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে গত বছরের ২০ জুন। গত জানুয়ারিতে আরও ৬ মাস বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে প্রকল্পের মেয়াদ। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্পের খরচ বাড়ানোর সুযোগ নেই। কিন্তু ডলারের দাম বাড়ায় ২৬ হাজার কোটি টাকা খরচ বেড়েছে প্রকল্পের। ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা খরচ হবে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তারা বলছেন, করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ মিলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ ব্যাহত হয়েছে। আর্থিক লেনদেনে জটিলতা, যন্ত্রপাতি দেশে আনা, বিশেষজ্ঞদের আসায় জটিলতা, বৈদেশিক মুদ্রা ডলার-সংকটে বিল পরিশোধের বিলম্ব—সব মিলিয়ে কাজ পিছিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রূপপুরের একটি ইউনিট চালু হলে বছরে ১০০ কোটি ডলারের জ্বালানি আমদানি সাশ্রয় করা যেত। অথচ সাড়ে তিন বছর পিছিয়ে গেছে এটি।
রূপপুরে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি। পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর পর এটি চূড়ান্ত করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করা হবে। তবে বিদ্যুৎকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ খরচ বেশি হলেও জ্বালানির দাম কম হবে। দেশের অন্যান্য জ্বালানি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের চেয়ে পারমাণবিক বিদ্যুতের দাম বেশি হবে না। এ বিষয়ে পাওয়ার গ্রিডের ব্যবস্থাপনার পরিচালক আবদুর রশিদ খান বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা নিয়ে গ্রিড পুরোপুরি তৈরি আছে।
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময় রাষ্ট্রীয়ভাবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের কথা ভাবছে রূপপুর কর্তৃপক্ষ। এতে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী যুক্ত থাকতে পারেন। এর আগে জ্বালানি প্রবেশ করানোর সময় তাঁদের কেউ যুক্ত ছিলেন না। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ওই সময়ও যুক্ত থাকলে ভালো হতো। সরকারপ্রধান উপস্থিত থাকলে দায়বদ্ধতা বাড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে উৎপাদনের সময় নির্দিষ্ট করে আগাম বলার সুযোগ নেই। এখন প্রতিটি মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নজরদারি জরুরি। তারা যখন সক্ষমতার বিষয়ে নিশ্চয়তা দেবে, তখন থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। কোনো একটা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে আবার এটি পিছিয়ে যেতে পারে। এখন সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও জটিল সময়। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে ত্রুটিবিচ্যুতি নিবিড়ভাবে যাচাই করতে হবে। দেরি যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন তাড়াহুড়া করার সুযোগ নেই। এতে ভুল হতে পারে। সূত্র: প্রথম আলো
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স