গ্যাস সংকট: এক বেলা খেয়ে দিন পার করছেন অনেকে
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
২৯-০৭-২০২৬ ১২:০৪:০১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৯-০৭-২০২৬ ১২:০৭:২৫ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
রাত ১২টা, কোথাও কোথাও ৩টা তবুও চুলায় আগুন নেই। দিনের পর দিন রান্না করতে না পেরে রাজধানীর অসংখ্য পরিবার বাধ্য হচ্ছে হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করতে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন ব্যাচেলর, শিক্ষার্থী, নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ ও ছোট পরিবারগুলো।
তাদের অনেকেই বলছেন, গ্যাস না থাকায় এক থেকে দুই বেলাও না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোডশেডিং। ফলে বৈদ্যুতিক চুলাও ব্যবহার করা যাচ্ছে না অনেক সময়। গ্যাস সংকটের কারণে শুধু রান্নাঘরই নয়- নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবন, পারিবারিক বাজেট ও স্বাস্থ্য সবকিছুতেই এখন চাপ বেড়েছে।
দেশে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) চালু রয়েছে। এরমধ্যে গত মঙ্গলবার (২১ জুলাই) মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই সারা দেশে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই আসে এলএনজি থেকে। স্বাভাবিক সময়ে এলএনজি থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০৫ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হয়।
এলএনজির সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় দেশের মোট গ্যাস সরবরাহও এখন দিনে ২১৫ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে এসেছে। অথচ, দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে এত দিন ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করেই পরিস্থিতি কোনোভাবে সামাল দেওয়া হচ্ছিল। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হওয়ায় আবাসিক, শিল্প, বিদ্যুৎ ও বাণিজ্যিক সব ধরনের গ্রাহকই এখন বড় ধরনের গ্যাস সংকটের মুখে পড়েছেন।
পেট্রোবাংলা সূত্র মতে, এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে আগুন লাগার পর গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) এলএনজি থেকে সরবরাহ নেমে আসে ৫৬ কোটি ঘনফুটে এবং গত রবিবার (২৬ জুলাই) সেই পরিমাণ আরো কমে ৫০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে গেছে।
চব্বিশ ঘণ্টার অধিকাংশ সময়ই গ্যাসহীন রান্নাঘর:
রাজধানীর আজিমপুর, নিউমার্কেট, জিগাতলা, হাজারীবাগ, রায়েরবাজার, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, খিলগাঁও, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনের অধিকাংশ সময় গ্যাস থাকে না বলে অভিযোগ করেছেন বাসিন্দারা। কোথাও গ্যাস এলেও চাপ এতটাই কম থাকে যে এক হাঁড়ি ভাত রান্না করতেই কয়েক ঘণ্টার সময় লেগে যায়। অনেক পরিবার রাত গভীর পর্যন্ত অপেক্ষা করেও রান্না করতে পারছে না। ফলে বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে তাদের।
রাজধানীর রায়েরবাজার এলাকার বাসিন্দ রাজিয়া আক্তার রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “গত এক সপ্তাহ বেশি সময় ধরে বাসায় সারাদিন চুলায় গ্যাস থাকে না। রাত ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত জেগে থাকি, যদি একটু গ্যাস আসে। অনেক সময় অপেক্ষা করেও রান্না করতে পারি না। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। আর সিলিন্ডারের গ্যাস যে কিনব, সেই টাকাও নেই। তাই বাধ্য হয়ে মাঝে মাঝে দিনে এক থেকে দুই বেলা না খেয়েই থাকতে হয়।”
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা রোখছানা বেগম বলেন, "এখন আমার বাসায় ২৪ ঘণ্টার বেশির ভাগ সময় চুলা জ্বলে না। গভীর রাতে গ্যাস এলেও চাপ এত কম থাকে যে রান্না শেষ করা যায় না। পরিবারের সবাইকে নিয়ে চরম দুর্ভোগে আছি। হোটেল থেকে আর কয়দিন কিনে খাওয়া যায়। তাই কখনো বিস্কুট বা শুকনো খাবার খেয়ে রাত পার করতে হচ্ছে।”
সবচেয়ে বিপাকে ব্যাচেলর ও শিক্ষার্থীরা:
গ্যাসের এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী রাজধানীতে বসবাস করা হাজার হাজার ব্যাচেলর। পরিবারের মতো বিকল্প রান্নার ব্যবস্থা নেই। একটি মাত্র চুলার ওপর নির্ভর করতে হয় তাদের।
গ্যাস না থাকায় প্রতিদিন হোটেলের খাবার খেতে হচ্ছে ব্যাচেলরদের। ফলে যেমন ব্যয় বেড়েছে, তেমনি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা বলছেন, পরিবারের পাঠানো নির্দিষ্ট মাসিক খরচ দিয়ে অতিরিক্ত এই ব্যয় সামলানো সম্ভব হচ্ছে না।
ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী হাসান সৈকত থাকেন রাজধানীর জিগাতলা এলাকায় একটি মেসে। তিনি রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “গত এক সপ্তাহ ধরে আমাদের মেসে দিনের বেশিরভাগ সময় গ্যাস থাকে না। আগে সকালে নাশতা আর দুপুরের খাবার একসঙ্গে রান্না করে বের হতাম। এখন রাত ১২টা-১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও অনেক সময় গ্যাস পাই না। বাধ্য হয়ে প্রতিদিন হোটেলে খেতে হচ্ছে। পরিবার থেকে যে মাসিক টাকা পাই, তা দিয়ে আগে কোনোভাবে চলত। এখন শুধু হোটেলের খাবারের পেছনেই অতিরিক্ত তিন থেকে চার হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে এই বাড়তি খরচ বহন করা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়েছে।”
রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী আজিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, “সকালে অফিসে যাওয়ার আগে গ্যাস না থাকায় রান্না করতে পারি না। রাতে অফিস থেকে ফিরে দেখি তখনও গ্যাস নেই। অনেক দিন বিস্কুট, কলা বা মুড়ি খেয়ে রাত কাটাতে হচ্ছে। প্রতিদিন হোটেলের খাবার খেতে খেতে শরীরেও সমস্যা দেখা দিচ্ছে। গ্যাসের বিল ঠিকই দিচ্ছি, কিন্তু সেবা পাচ্ছি না। আবার বাইরে খাওয়ার কারণে মাসিক বাজেট পুরো ভেঙে পড়েছে।”
একই এলাকার আরেক বাসিন্দা চাকরিপ্রার্থী মোশাররফ হোসেন বলেন, “আমরা ছয়জন মিলে একটি মেসে থাকি। গ্যাস না থাকায় সবাই মিলে রান্না করার সুযোগও পাচ্ছি না। কখনো রাত ২টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছি, তারপরও চুলা জ্বলেনি। অনেক সময় এক বেলা খেয়ে আরেক বেলা শুধু পানি বা হালকা কিছু খেয়ে থাকতে হয়েছে। চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছি, কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে পারছি না।”
নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্ট আরো গভীর:
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে আগে থেকেই চাপে থাকা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য গ্যাস সংকট নতুন দুর্ভোগ তৈরি করেছে। অনেক দিনমজুর, রিকশাচালক ও স্বল্প আয়ের পরিবার জানিয়েছেন, গ্যাস না থাকায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। বাইরে থেকে খাবার কেনার সামর্থ্যও নেই। ফলে কেউ এক বেলা, কেউ দুই বেলাও না খেয়ে থাকছেন।
তাদের ভাষায়, বাজারের বাড়তি খরচের সঙ্গে এখন রান্নার জ্বালানির সংকট যোগ হয়ে জীবন আরো কঠিন হয়ে উঠেছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা গৃহপরিচারিকা লিমা আক্তার বলেন, “আমি মানুষের বাসায় কাজ করি। সকালে কাজে যাওয়ার আগে সন্তানদের জন্য রান্না করে যেতে পারি না। গ্যাস না থাকলে তারা মুড়ি বা শুকনো খাবার খেয়ে থাকে। অনেক দিন দুপুরে কিছু রান্না হয় না। রাতে গ্যাস এলে তখন রান্না করি। আমরা এত দামের সিলিন্ডারের গ্যাসও কিনতে পারিনি না। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে এভাবে থাকা খুব কষ্টের।”
গ্যাস সংকট নিয়ে রিকশাচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, “সারাদিন রিকশা চালিয়ে যা আয় করি, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে। বাজারের জিনিসপত্রের দাম এমনিতেই অনেক বেড়েছে। এখন আবার গ্যাস না থাকায় রান্না করা যায় না। হোটেলের খাবার কিনে খাওয়ার সামর্থ্য নেই। অনেক দিন শুধু এক বেলা খেয়ে থাকছি। বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকালে খুব কষ্ট হয়।”
এলপিজি সিলিন্ডার ও বৈদ্যুতিক চুলায় ঝুঁকছেন অনেকে:
পাইপলাইনের গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার কিনছেন, কেউ কেউ বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার শুরু করেছেন। তবে এলপিজি কিনতে এককালীন অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে। অন্যদিকে, বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ বিল বাড়ছে। আবার লোডশেডিংয়ের কারণে সেই চুলাও সবসময় ব্যবহার করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে গ্যাস বিল, বিদ্যুৎ বিল ও খাবারের অতিরিক্ত খরচ তিন ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের।
রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী সৈয়দ নাবিল আহমেদ রাইজিংবিডি ডটকমকে বলেন, “পাইপলাইনের গ্যাসের কোনো নিশ্চয়তা না থাকায় বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার কিনেছি। আগে যে খরচে মাস চলত, এখন তার সঙ্গে সিলিন্ডার কেনার খরচ যোগ হয়েছে। একটি সিলিন্ডার কিনতে একসঙ্গে অনেক টাকা লাগে। এটা আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটা বড় চাপ।”
হাজারীবাগের বাসিন্দা গৃহিণী তাছলিমা বেগম বলেন, “গ্যাস না থাকায় বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছি। কিন্তু এখন আবার লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে রান্নাও বন্ধ হয়ে যায়। একদিকে গ্যাস বিল, অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিল দুটোই দিতে হচ্ছে। অথচ স্বাভাবিকভাবে কোনো সেবাই পাচ্ছি না। এতে খরচ যেমন বাড়ছে তেমনি ভোগান্তিও বাড়ছে।”
জ্বালানি সংকটের সমাধান সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, “বর্তমান সংকট কেবল একটি সাময়িক কারিগরি সমস্যার ফল নয়; এটি দীর্ঘদিনের সরবরাহ ঘাটতি ও পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে সমস্যা দেখা দিলেই পুরো জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, নতুন কূপ খনন, পাইপলাইন অবকাঠামো উন্নয়ন এবং এলএনজি সরবরাহে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এ ধরনের সংকটের টেকসই সমাধান হতে পারে।”
সম্প্রতি এক গোলটেবিল বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, “একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) মজুত ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিটে (এফএসআরইউ) অগ্নিকাণ্ডের কারণে এলএনজি খালাস ব্যাহত হওয়ায় সংকট তীব্র হয়েছে। গ্যাস সংকট পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরো ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগবে। বর্তমানে এফএসআরইউ মেরামতের কাজ চলছে। এই বিভ্রাটের কারণে দুটি এলএনজি কার্গো খালাস করা যাচ্ছে না। ফলে দেশজুড়ে রান্নাঘরে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়াসহ বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায়ও সমস্যা দেখা দিয়েছে।
তিনি বলেন, “দেশের গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এখন এলএনজি, এলপিজিসহ বিভিন্ন জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আর এই আমদানি করা জ্বালানির দামও অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। গত ছয় মাসে প্রায় ৩ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি করতে হয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।”
সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে মনোযোগ বাড়িয়েছে বলে ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, “সরকার সম্প্রতি নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ঘোষণা করেছে, যার লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন। আগস্ট মাসের মধ্যেই এই কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যে দর কষাকষি ও জমি বরাদ্দের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।”
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স