ঢাকা , সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬ , ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কলাপাড়ায় পাঁচ শতাধিক সবজি চাষীর সর্বনাশ

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ২৭-০৭-২০২৬ ০৪:১০:১৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২৭-০৭-২০২৬ ০৪:১০:১৫ অপরাহ্ন
কলাপাড়ায় পাঁচ শতাধিক সবজি চাষীর সর্বনাশ ফোকাস বাংলা নিউজ
ধানের পাশাপাশি বছরের ১২ মাস বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ করেন কৃষক মিলন তালুকদার (৫৫)। ঘুটাবাছা গ্রামের বাসীন্দা এই কৃষক এবারে ছয় বিঘা বর্ষাকালের আগাম সবজির আবাদ করেছিলেন। করলার আবাদ করেছিলেন সবচেয়ে বেশি। গাছগুলোয় বাম্পার ফলন হয়েছিল। গেল মাসের (জুন) মাঝামাঝি থেকে বিক্রি শুরু করেন। সপ্তাহে অন্তত ৪০-৪৫ মণ করলা বিক্রি শুরু করেছিলেন। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া বিরামহীন ছয়-সাতদিনসহ ১৪ দিনের বৃষ্টিতে মিলন তালুকদারের এখন সব শেষ হয়ে গেছে। এখনো বিরামহীন না হলেও প্রতিদিন সাত-আট ঘন্টা করে কয়েক দফায় বৃষ্টি হচ্ছে। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে ফলনধরা সবুজ গাছগুলো ধুসর-লালচে, বিবর্ণ হয়ে গেছে। ফলন নষ্ট হয়ে গেছে। অন্তত তিন লাখ টাকার করলা বিক্রির আশা করছিলেন এই চাষী। একইভাবে মিলন তালুকদারের শসা, ঝিঙে, ধুন্দল, লাউয়ের ক্ষেত পর্যন্ত নষ্ট হয়ে গেছে। গাছগুলো গোড়া থেকে পচে গেছে। এখন ক্ষেতের কাছে গিয়ে মানুষটা দিশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ‘প্রকৃতি যেন তাঁদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন’-এমন ভাষ্য মানুষটার। হতাশাগ্রস্ত মিলন তালুকদার জানালেন, তার গ্রামের ছাড়াও পাশের নাওভাঙা গ্রামের জাকির ফকিরেরও এমন সর্বনাশ হয়ে গেছে। গ্রামের অর্ধশতাধিক চাষীর একই দশা হয়েছে। এসব চাষীরা ফি বছর এই মৌসুমে গড়ে তিন-চার লাখ টাকার সবজি বিক্রি করেন। কিন্তু এবছর অতিরিক্ত বৃষ্টিতে সব নষ্ট হয়ে গেছে। ফের কোমর সোজা করে দাঁড়ানোর অবস্থায় নেই তারা।

এই দুটি গ্রাম ছাড়াও পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় সবজির হাবখ্যাত কুমিরমারা গ্রামের চাষীদেরও একই দশা। মানুষগুলো ১২টি মাস সবজির ওপর নির্ভরশীল। অথচ প্রকৃতির রোষাণলে সবাই এখন দুরবস্থার মধ্যে পতিত হয়েছেন। গ্রামটির প্রবীণ চাষী সুলতান গাজী জানালেন, করলা, শসা, ঝিঙে, চিচিঙা, লাউ, ধুন্দল, জালিসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি বিক্রি করে এই মৌসুমে সবাই গড়ে এক-দেড় লাখ টাকা লাভের মুখ দেখেন। এবছর উল্টো এক-দেড় লাখ টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে। বীজ কেনার টাকাও ওঠেনি সবজি বিক্রি করে। কেবল বিক্রি শুরু করেছিলেন, এরই মধ্যে বৃষ্টির ধকলে সব পচে গেছে। 

একজন সুলতান গাজী নয়, একই দশা গ্রামটির আজিজ হাওলাদার, মজিবর গাজী, শহিদুল জোমাদ্দার, আলতাফ গাজী, মাসুম চৌধুরী, মুসা কাজী, মামুন হাওলাদার, জহিরুলসহ শতকরা ৯৫ ভাগ সবজি চাষীর। এসব কৃষকের চেহারায় এক ধরনের হতাশা আর অনিশ্চয়তার ছাপ ফুটে আছে। নীলগঞ্জ ইউনিয়নের সবচেয়ে বেশি সবজি উৎপাদন এলাকা কুমিরমারা গ্রাম ছাড়াও পূর্ব সোনাতলা, এলেমপুর, মজিদপুর, পাখিমারা ও নাওভাঙার কৃষকদের এমন দুরবস্থার দৃশ্য দেখা গছে। শত শত একর জমির সবজির ক্ষেত বিবর্ণ হয়ে গেছে। ফলন ধরা গাছগুলো কুকড়ে গেছে। নেতিয়ে পড়েছে। ফলনগুলো লাল হয়ে পচন ধরেছে। কৃষকের ভাষ্য, চোখের সামনে থেকে প্রকৃতি যেন সব কেড়ে নিল।

ইউনিয়নের পাখিমারা বাজারের সবজির পাইকারি আড়তগুলো এখন খাঁ খাঁ করছে। নেই কোন বেচাকেনা। আল্লাহ ভরসা আড়তের মালিক নজরুল কাজী জানালেন, এ মাসের প্রথম সপ্তাহে দৈনকি ৮০০-৯০০ মণ করলার আমদানি হতো। এর সঙ্গে আরও দুই-চার শ’ মণ শসা, ঝিঙের আমদানি হতো। আর এখন প্রতিদিন ২৫-৩০ মণ সবজিও আমদানি হয় না। অন্তত পাঁচ শ’ সবজিচাষী ভারি অতিরিক্ত বর্ষণে নিঃস্ব হয়ে গেছে। লোকসানের চিন্তায় এসব চাষীর রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। আর বৃষ্টি এখনো থামছে না। তাই কবে নাগাদ আবার মাঠে নেমে নতুন করে সবজির আবাদে নামবেন তাও অনিশ্চিত হয়ে গেছে। কয়েক কোটি টাকার এই ক্ষতি কীভাবে পুষিয়ে নিবেন তা ভেবে চাষীরা হতাশায় ভুগছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: আরাফাত হোসেন জানান, কলাপাড়ায় যে পরিমাণ সবজির আবাদ হয় তার ৮০ শতাংশ নীলগঞ্জের। সেখানকার চাষীরা ১২ মাস সবজিসহ ধানের আবাদ করছেন। এবারের বৃষ্টিতে তাঁদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। শুধুমাত্র করলার ক্ষতি হয়েছে অন্তত আড়াই শ’ একর জমির। বাম্পার ফলনধরা গাছগুলো পুরো ক্ষেতসহ পচে নষ্ট হয়ে গেছে। একইভাবে শসা, ঝিঙেসহ বর্ষাকালীন অধিকাংশ সবজির ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। তিনি জানান, দীর্ঘ ১৪-১৫দিনের অতিরিক্ত বৃষ্টিতে প্রথমে গাছগুলোর গোড়ায় পচন ধরে গাছগুলো মরে যাচ্ছে। ফলনগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষকের ব্যাপক ক্ষতির কথা জানালেন এই কৃষি কর্মকর্তা। তবে তিনি জানালেন, ক্ষতিগ্রস্ত চাষীদের আগামি রবি মৌসুমে কৃষি প্রণোদনা দেওয়ার জন্য সরকারের উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হয়েছে।

 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ