ঢাকা , মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬ , ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বর্ষার ফুলে ত্বকের যত্ন

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ২১-০৭-২০২৬ ১২:৩৫:৩২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২১-০৭-২০২৬ ১২:৩৫:৩২ অপরাহ্ন
বর্ষার ফুলে ত্বকের যত্ন ফাইল ছবি
বৃষ্টির দিনে বদলে যায় সৌন্দর্যচর্চার রুটিন। কদম, পদ্ম, বেলি কিংবা শাপলা ফুলগুলো সৌরভ ও স্নিগ্ধতা ছড়ানোর পাশাপাশি জায়গা করে নেয় আধুনিক ত্বকযত্নেও। বর্ষা মানেই অবিরাম সৌন্দর্য ছড়িয়ে থোকা থোকা ফুটে থাকা কদম। ভেজা জানালার পাশে একগুচ্ছ বেলি। বিল-ঝিল, পুকুরভরা শাপলা। জল থেকে মাথা তুলে থাকা পদ্ম। বাংলাদেশের ঋতুচক্রে এই ফুলগুলোর স্থান শুধু নান্দনিকতায় নয়, স্মৃতিরোমন্থনেও। মা-খালাদের খোঁপা, গ্রামের উঠোন, বর্ষার বিকেল— সবকিছুতেই যেন ফুলের অনিবার্য উপস্থিতি। সৌন্দর্যচর্চার ইতিহাসেও পুষ্পের গল্প কম পুরনো নয়। মিসরের ক্লিওপেট্রার গোলাপস্নান, জাপানের ক্যামেলিয়া, ভারতের আয়ুর্বেদ, কোরিয়ার হারবাল বিউটি— প্রকৃতি বরাবরই প্রসাধনবিদ্যার অনুপ্রেরণা। তবে পার্থক্যটি হলো ল্যাবে প্রস্তুত করা বিশুদ্ধ বোটানিক্যাল এক্সট্র‍্যাক্ট আর কাঁচা ফুল বেটে মুখে লাগানোর মধ্যে। আয়ুর্বেদিক রূপবিশেষজ্ঞ আফরিন মৌসুমী বললেন, ‘কোনো ফুল প্রসাধনীতে ব্যবহৃত হচ্ছে বলেই সেটি সরাসরি কাঁচা অবস্থায় ত্বকে প্রয়োগ করা নিরাপদ— এমনটি ধরে নেওয়া ভুল।’

ফুলের ছোঁয়ায় রূপচর্চার ইতিহাস

দু-তিন হাজার বছর আগে আয়ুর্বেদের গ্রন্থ ‘চরক সংহিতা’ ও ‘সুশ্রুত সংহিতা’য় ত্বকযত্নে নানা ভেষজ, ফুল, ফল, দুধ, মধু, চন্দন, হলুদ ও তিলের তেল ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। রাজপরিবারের নারীরা শুধু গয়নায় নয়; সুগন্ধি ফুল, ফুলের জল, ভেষজ উপটানেও নিজেদের সাজাতেন। প্রাচীন ভারতের রাজপ্রাসাদে ভোরে রূপচর্চা শুরু হতো সুগন্ধি ফুলের জল দিয়ে মুখ ধোয়ার মাধ্যমে। এরপর চন্দন, জাফরান, গোলাপ, জুঁই কিংবা পদ্মের নির্যাস মিশিয়ে তৈরি হতো প্রলেপ।

জবা

বর্ষার সবচেয়ে পরিচিত ফুলগুলোর একটি জবা। ছোটবেলায় অনেকেই হয়তো মা-দাদিকে জবার পাতা আর ফুল বেটে চুলে প্রয়োগ করতে দেখেছেন। কিন্তু এখন এই ফুল শুধু চুল নয়; ত্বকের যত্নেও আলোচনায়। জবার পাপড়িতে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, প্রাকৃতিক ফলের অ্যাসিড (এএইচএ-জাতীয় উপাদান), পলিফেনল ও মিউসিলেজ। এ কারণেই অনেক আন্তর্জাতিক স্কিনকেয়ার ব্র‍্যান্ড এর নির্যাস ব্যবহার করছে হাইড্রেটিং ও অ্যান্টি-এজিং পণ্যে। কেননা নিস্তেজ, রুক্ষ ও প্রাণহীন ত্বকে জবা দীপ্তি আনে।

ঘরোয়া পরিচর্যা: চার-পাঁচটি তাজা লাল জবার পাপড়ি ধুয়ে ব্লেন্ড করে নিন। এর সঙ্গে এক চা চামচ টক দই ও আধা চা চামচ মধু মিশিয়ে প্যাক তৈরি করুন। মুখে ১০-১২ মিনিট রেখে কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। টক দইয়ের ল্যাকটিক অ্যাসিড ত্বক পরিষ্কার করতে সাহায্য করে, আর মধু আর্দ্রতা ধরে রাখতে উপকারী।

আয়ুর্বেদে এই ফুল গণ্য হয় শীতল প্রকৃতির উদ্ভিদ হিসেবে। আধুনিক গবেষণায় পদ্মের নির্যাসে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফ্ল্যাভোনয়েড পাওয়া গেছে, যা ত্বককে বাইরের দূষণ থেকে রক্ষা করে কোমল অনুভূতি দেয়। তাই কে-বিউটির অনেক হাইড্রেটিং টোনার ও জেল ক্রিম, এসেন্স, শিট মাস্ক ও ময়েশ্চারাইজারে এই নির্যাস ব্যবহৃত হচ্ছে। শুষ্ক ও সংবেদনশীল ত্বকের জন্য এটি ব্যবহার করা ভালো। তবে পদ্মের পাপড়ি বেটে মুখে প্রলেপ দেওয়ার চেয়ে এই ফুলের নির্যাসযুক্ত মানসম্মত ত্বকযত্ন পণ্য ব্যবহার করাই নিরাপদ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

ঘরোয়া পরিচর্যা: আয়ুর্বেদিক দোকানে শুকনো পদ্মের পাপড়ির গুঁড়া পাওয়া যায়। এক চা চামচ গুঁড়া নিয়ে এর সঙ্গে অ্যালোভেরা জেল ও কয়েক ফোঁটা গোলাপজল মিশিয়ে একটি হালকা প্যাক তৈরি করুন। সারা মুখে, ঘাড়, গলায় এর প্রলেপ দিয়ে ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। তৈলাক্ত ত্বকে মুলতানি মাটির সঙ্গে অল্প পদ্ম গুঁড়া ও গোলাপজল মিশিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে। অতিরিক্ত শুকনো ত্বকে এই প্যাক প্রয়োগ না করাই ভালো। আবার তাজা পদ্ম ফুল পুকুর থেকে তুলে সরাসরি ব্যবহার করবেন না। অন্যথায় হীতে বিপরীত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

বেলি

এই ফুলের সবচেয়ে বড় গুণ তার সুবাস, যা মস্তিষ্কে প্রশান্তির অনুভূতি এনে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক চাপ কমলে ত্বকের প্রদাহও কিছুটা কমতে পারে। এ কারণে আধুনিক ত্বকযত্নে জুঁই বা বেলির ফ্লোরাল ওয়াটার ব্যবহার করা হচ্ছে টোনার ও ফেস মিস্ট হিসেবে। এটি ক্লান্ত ও পানিশূন্য ত্বককে প্রাণবন্ত করে তোলে।

ঘরোয়া পরিচর্যা: ফুটন্ত গরম পানিতে কয়েকটি পরিষ্কার বেলি ফুল ভিজিয়ে রেখে ঠান্ডা করুন। এরপর ছেঁকে সেই পানি ফ্রিজে রেখে দুদিনের মধ্যে ফেস মিস্ট হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। তবে এটি দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য নয়; তাই বেশি দিন রেখে ব্যবহার করবেন না।

শাপলা

লোকজ চিকিৎসায় শাপলার ব্যবহার থাকলেও ত্বকযত্নে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ওয়াটার লিলি এক্সট্র‍্যাক্ট। এটি মূলত সংবেদনশীল ও তৈলাক্ত ত্বকের প্রসাধনীতে ব্যবহার করা হয়। তবে শাপলার পাপড়ি বেটে মুখে প্রলেপ দেওয়ার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ খুবই সীমিত। তাই ঘরে সরাসরি ব্যবহার না করে এই ফুলের নির্যাসযুক্ত প্রসাধনী বেছে নেওয়া নিরাপদ।

কদম

বর্ষা আর কদম যেন একই গল্পের দুটি অধ্যায়। কালিদাসের ‘মেঘদূত’ কাব্য থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান— এই ফুল বারবার ফিরে এসেছে প্রেম, অপেক্ষা আর বৃষ্টির প্রতীক হয়ে। তবে ত্বকযত্নের প্রসঙ্গে কদমকে নিয়ে একটু সতর্ক থাকা প্রয়োজন। লোকজ চিকিৎসায় এর পাতা, ছাল ও ফুলের কিছু ব্যবহার পাওয়া গেলেও ত্বকে কদম ফুল প্রয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখনো সীমিত। তাই কদমকে ফেসপ্যাকের প্রধান উপাদান করার চেয়ে এর সুগন্ধ ও নান্দনিকতাকে সৌন্দর্যচর্চার অংশ করাই ভালো বলে মনে করেন ত্বক বিশেষজ্ঞরা। বর্ষার দিনে কদমের পাশে বসে স্কিনকেয়ার রুটিনে কয়েক মিনিট সময় দেওয়া কিংবা ফুলটি পানিভরা পাত্রে রেখে ঘরের পরিবেশকে স্নিগ্ধ করে তোলা— এটিও এক ধরনের বিউটি রিচুয়াল। কারণ, সৌন্দর্য শুধু ত্বকে নয়, মনেও তৈরি হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক চাপ কমলে ত্বকের প্রদাহও কিছুটা কমতে পারে। এ কারণে আধুনিক ত্বকযত্নে জুঁই বা বেলির ফ্লোরাল ওয়াটার ব্যবহার করা হচ্ছে টোনার ও ফেস মিস্ট হিসেবে। এটি ক্লান্ত ও পানিশূন্য ত্বককে প্রাণবন্ত করে তোলে
অপরাজিতা

কয়েক বছর ধরেই আন্তর্জাতিক ত্বকযত্নে ব্লু বোটানিক্যাল নিয়ে আগ্রহ বেড়েছে। অপরাজিতা ফুলের নীল রঙের উৎস অ্যান্থোসায়ানিন, যা শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই ফুলের নির্যাস এখন কিছু সিরাম ও অ্যান্টি-পলিউশন স্কিনকেয়ারে ব্যবহার হচ্ছে।

ঘরোয়া পরিচর্যা: পরিষ্কার অপরাজিতা ফুল গরম পানিতে কয়েক মিনিট ভিজিয়ে ঠান্ডা করে সেই পানি দিয়ে মুখ ধোয়া যেতে পারে। এটি মূলত সতেজ অনুভূতি দেয়। তবে সংবেদনশীল ত্বকে প্রয়োগের আগে প্যাচ টেস্ট করা জরুরি।

ফুল মানেই কি ঘরোয়া ফেসপ্যাক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই জবা, কদম, শাপলা কিংবা বেলি বেটে মুখে প্রয়োগের পরামর্শ দেখা যায়। কিন্তু কসমেটিক কেমিস্টরা বলছেন, ত্বকযত্নে ব্যবহৃত ফুলের নির্যাস বিশেষ পদ্ধতিতে পরিশোধিত, স্থিতিশীল এবং নিরাপত্তা যাচাই করা থাকে। কাঁচা ফুলে সেই মান নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তাই সংবেদনশীল ত্বকে অ্যালার্জি বা জ্বালাপোড়া হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

ফুলের সাহায্যে ত্বকযত্নে সতর্কতা

ফুল অবশ্যই কীটনাশকমুক্ত ও পরিষ্কার হতে হবে
প্রথমবার ব্যবহারের আগে হাতে বা কানের পেছনে প্যাচ টেস্ট করুন
ব্রণ, একজিমা বা অ্যালার্জি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘরোয়া প্যাক ব্যবহার করবেন না
এসেনশিয়াল অয়েল কখনোই সরাসরি ত্বকে লাগাবেন না
ঘরে তৈরি ফ্লোরাল ওয়াটার বা প্যাক সংরক্ষণ না করে টাটকা অবস্থায় ব্যবহার করুন

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন 
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ