হোগল গুঁড়ায় ভাগ্য বদল
মেঘনার চরে চলছে ‘হোগল গুঁড়া’ সংগ্রহের উৎসব
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২০-০৭-২০২৬ ০৩:৫৬:৫০ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২০-০৭-২০২৬ ০৩:৫৬:৫০ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
ঋতু পরিবর্তনের হাত ধরে প্রকৃতিতে এখন আষাঢ়ের উপস্থিতি। আর এ বর্ষার প্রাক্কালে গ্রামীণ জনপদে জেগে উঠেছে প্রকৃতিপ্রদত্ত এক অনন্য সম্ভার। দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণের মেঠোপথ পেরিয়ে মেঘনা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে এখন চলছে ‘হোগল গুঁড়া’ সংগ্রহের উৎসব। চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার চরাঞ্চলের শতাধিক পরিবার এখন এ বিশেষ প্রাকৃতিক খাদ্য ও উপাদানের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছে।
সরেজমিন উপজেলার চরভৈরবী এলাকা ঘুরে চোখে পড়েছে এক কর্মমুখর দৃশ্য। বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে খোলা মাঠে থরে থরে সাজানো হোগলা গাছের ফুল রোদে শুকাচ্ছেন কৃষকরা। শুকিয়ে যাওয়া ফুল থেকে আলতো টোকায় বের হয়ে আসছে হালকা হলদে রঙের সূক্ষ্ম গুঁড়া। দেখতে যা-ই হোক, এর স্বাদ ও পুষ্টিগুণ কিন্তু একেবারে অনন্য। স্থানীয়দের কাছে এটি ঐতিহ্যবাহী ও মুখরোচক এক মৌসুমি খাবার।
মেঘনার বিস্তীর্ণ ও দুর্গম চরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নেয় হোগলা গাছ। বর্ষার শুরুতে গাছে ফুল ফোটার পর কৃষকরা নৌকায় ভেসে চরে যান ফুল সংগ্রহ করতে। সেখান থেকে কেটে আনা ফুল কয়েক দিন রোদে শুকানো হয়। এরপর চটের ওপর বা বড় পাত্রে রেখে আলতো করে আঘাত করলে ঝরে পড়ে কাঙ্ক্ষিত গুঁড়ো। শেষে মিহি চালনিতে ছেঁকে পাওয়া যায় খাঁটি ‘হোগল’। শ্রমসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ এই প্রক্রিয়ার পর তৈরি হয় চরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবারটি।
উপজেলার চরভৈরবী গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, নদী পার হয়ে চর থেকে হোগলা ফুল আনা অনেক কষ্টের। শুকানো ও গুঁড়া করার পেছনেও প্রচুর পরিশ্রম। কিন্তু বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায় বলে সব কষ্ট ভুলে যাই। হোগল বেচেই এখন সংসার চলছে।
বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি হোগল গুঁড়া বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায়। গুণগত মান ভালো হওয়ায় স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে চাঁদপুর ও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলায় এটি কদর পাচ্ছে। পাইকাররা সরাসরি চরাঞ্চলের কৃষকদের কাছ থেকে হোগল কিনে নিয়ে পৌঁছে দিচ্ছেন শহরের ক্রেতাদের হাতে।
চরভৈরবীর রহিমা বেগম বলেন, এর রন্ধনশৈলী, দুধ, নারকেল আর গুড় বা চিনি মিশিয়ে অল্প আঁচে নাড়তে থাকলে চমৎকার পায়েস বা ফিরনির মতো তৈরি হয় হোগল। মেহমানদারি আর পারিবারিক আয়োজনে এর চাহিদা তুঙ্গে। বড়দের পাশাপাশি শিশুরাও এটি খুব পছন্দ করে।
হোগলা গুঁড়া অর্থনৈতিকভাবে চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য ফেরালেও এর অবাধ বিস্তারে চিন্তার ভাঁজ কৃষি কর্মকর্তাদের কপালে। কারণ, কৃষিজমিতে হোগলার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার অন্যান্য ফসল উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।
হাইমচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাকিল খন্দকার বলেন, আমরা কৃষকদের পরিকল্পিতভাবে হোগলা চাষ না করার পরামর্শ দিচ্ছি। এটি অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায় এবং অন্য ফসলের জমি দখল করে ফেলে। ফলে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
তিনি আরও স্পষ্ট করেন, চরাঞ্চলে যা প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়, তা থেকে ফুল বা গুঁড়া সংগ্রহ করায় কৃষি বিভাগের কোনো আপত্তি নেই। চাষ না করে প্রকৃতিপ্রদত্ত হোগল সংগ্রহ করাকেই টেকসই বলে মনে করি।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স