ঢাকা , মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬ , ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অফ সিজনের লাউয়ে ভাগ্য বদলাচ্ছে বাগেরহাটের কৃষকের

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ২০-০৭-২০২৬ ০৩:২৮:০৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ২০-০৭-২০২৬ ০৩:২৮:০৮ অপরাহ্ন
অফ সিজনের লাউয়ে ভাগ্য বদলাচ্ছে বাগেরহাটের কৃষকের ছবি : সংগৃহীত
বাগেরহাটে অফ সিজনের লাউ চাষে বাম্পার ফলন ও বাজারে ভালো দাম পেয়ে খুশি কৃষকেরা। কম খরচে বেশি লাভ, দ্রুত ফলন এবং নিরাপদ উৎপাদন পদ্ধতির কারণে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এ চাষ। বিশেষ করে চিংড়ি ঘেরের আইলে লাউ চাষ করে একই সঙ্গে মাছ ও সবজি উৎপাদনের মাধ্যমে বাড়তি আয় করছেন তারা।

দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম সবজি উৎপাদনকারী জেলা বাগেরহাট। জেলার চাহিদা মিটিয়ে এখানকার বিভিন্ন ধরনের সবজি রাজধানী ঢাকাসহ সরবরাহ করা হয় দেশের বিভিন্ন জেলায়। কৃষিজমির পাশাপাশি চিংড়ি ঘেরের অব্যবহৃত আইলে সবজি চাষ এখন লাভজনক উদ্যোগে পরিণত হয়েছে কৃষকদের জন্য।

জেলার বিভিন্ন উপজেলার মাঠজুড়ে এখন বাঁশ ও সুতা দিয়ে তৈরি মাচায় সবুজ লাউগাছের সমারোহ। গাছে ফুটেছে সাদা ফুল, আর নিচে ঝুলছে অসংখ্য লাউ। কীটপতঙ্গ দমনে রাসায়নিক কীটনাশকের পরিবর্তে ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করায় নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত হচ্ছে উৎপাদিত লাউ। মাত্র ৫০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যেই ফলন পাওয়ায় বাড়ছে কৃষকদের আগ্রহও।

লাউচাষি বাদশা শেখ জানিয়েছেন, ঘেরের আইলে লাউ চাষ করায় প্রয়োজন হয় না আলাদা জমির। বর্ষার পানিতেও তেমন ক্ষতি হয় না গাছের। অফ সিজনে বাজারে সরবরাহ কম থাকায় পাওয়া যায় ভালো দাম।

প্রথমবার অফ সিজনে লাউ চাষ করে সফল হওয়া কৃষক বিনয় বালা জানিয়েছেন, শুরুতে কিছুটা শঙ্কা থাকলেও ভালো ফলন পেয়েছেন কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে। এখন পর্যন্ত লাউ বিক্রি করেছেন প্রায় ২০ হাজার টাকার। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আরও প্রায় এক লাখ টাকার লাউ বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন।

তিনি আরও জানান, প্রতিদিন ক্ষেত থেকেই লাউ কিনে নিয়ে যান পাইকাররা। এসব লাউ বাগেরহাটের বিভিন্ন বাজারের পাশাপাশি ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও বরিশালসহ পাঠানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। আগামী বছর আরও বেশি জমিতে লাউ চাষের পরিকল্পনা রয়েছে তার।

লাউ কিনতে আসা ক্রেতা রবিউল ইসলাম জানিয়েছেন, বাগেরহাটের অফ সিজনের লাউ আকারে বড় এবং স্বাদেও ভালো। রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কম হওয়ায় কিনতে পারেন নিশ্চিন্তে। দাম কিছুটা বেশি হলেও মান ভালো হওয়ায় তা কিনছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিমের ভাষ্য, ‘আগে এ সময়ে বাজারে লাউ খুব একটা পাওয়া যেত না। এখন স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হওয়ায় সহজেই তাজা লাউ মিলছে। এতে কৃষকের যেমন লাভ হচ্ছে, তেমনি ক্রেতার চাহিদাও পূরণ হচ্ছে।’

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাগেরহাট জেলায় প্রায় ৭৮ হাজার মৎস্যঘের রয়েছে। সদর, কচুয়া, মোরেলগঞ্জ, ফকিরহাট, মোল্লাহাট, চিতলমারী, রামপাল, মংলা ও শরণখোলা উপজেলার এসব ঘেরের আইলে বর্তমানে পুঁইশাক, চালকুমড়া, ঢ্যাঁড়শ, পেঁপে, লাউ, টমেটো, করলা, শিম, বরবটি, বাঙ্গি, কলা, মিষ্টিকুমড়া, লালশাকসহ ২০ থেকে ২৫ ধরনের সবজির আবাদ হচ্ছে। একসময় অব্যবহৃত থাকা ঘেরের বাঁধ এখন কৃষকদের অতিরিক্ত আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হয়েছে।

বাগেরহাট সদর উপজেলার বারাকপুর, শ্রীঘাট, পোলেরহাট ও সি অ্যান্ড বি বাজার জেলার অন্যতম বড় পাইকারি সবজির বাজার। ভোর থেকেই এসব বাজারে কৃষক ও পাইকারদের ভিড় জমে। প্রতিটি হাটবারে এখান থেকে ৭০ থেকে ৮০ ট্রাক সবজি দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। প্রতি হাটে ১ থেকে ২ কোটি টাকার সবজি বিক্রি হয়। এ খাতে সৃষ্টি হয়েছে ২০০ থেকে ৩০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থান।

বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৯ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে অফ সিজনের লাউ চাষ উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে চিংড়ি ঘেরের আইল ব্যবহার করে কৃষকেরা লাউ চাষ করছেন।

একই জায়গায় উপরে লাউ এবং নিচে মাছ চাষ হওয়ায় উৎপাদন খরচ কমছে, জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে এবং কৃষকেরা দ্বিগুণ লাভবান হচ্ছেন। সদর, মোল্লাহাট, চিতলমারী, ফকিরহাট ও মোরেলগঞ্জ উপজেলায় এ ধরনের চাষের পরিধি দ্রুত বাড়ছে বলেও জানান তিনি।

মোতাহার হোসেন বলেছেন, স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাগেরহাটের অফ সিজনের লাউ এখন ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। ঘেরে মাছ চাষ থাকায় কৃষকেরা অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার না করে ফেরোমন ফাঁদ ব্যবহার করছেন। ফলে নিরাপদ, বিষমুক্ত ও মানসম্মত লাউ উৎপাদন হচ্ছে, যার বাজারে চাহিদাও বেশি।

তিনি জানান, নিরাপদ সবজি উৎপাদনে কৃষি বিভাগ কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। অফ সিজনে ভালো দাম পাওয়ায় এ চাষ কৃষকদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক হয়ে উঠেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাগেরহাটের অফ সিজনের সবজি দেশের অন্যতম ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি পাবে এবং এ খাতে তৈরি হবে আরও নতুন উদ্যোক্তা।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ