ঢাকা , সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬ , ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভালুকায় নজর কাড়ছে রাম্বুটান ও কাঠলিচু

লাল মাটির লাল ফলে বিস্ময়

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১৯-০৭-২০২৬ ০৪:০২:০৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৯-০৭-২০২৬ ০৪:০৯:৩৬ অপরাহ্ন
লাল মাটির লাল ফলে বিস্ময় ছবি : সংগৃহীত
ময়মনসিংহের ভালুকার গোয়ারী গ্রামের পথ ধরে এগোতেই চোখে পড়ে সারি সারি সবুজ গাছ। কোথাও লাল রঙের কাঁটাওয়ালা রাম্বুটানের থোকা, কোথাও আবার ঝুলছে সোনালি-বাদামি রঙের লংগান বা কাঠলিচু। দূর থেকে দেখতে অনেকটা লিচুর মতো হলেও স্বাদে আলাদা। বিদেশি এই দুই ফল এখন শুধু বাগানের সৌন্দর্যই বাড়াচ্ছে না, বদলে দিচ্ছে দুই উদ্যোক্তার ভাগ্যও।

কয়েক বছর আগেও এই জমিতে ছিল দেশীয় ফলের বাগান। আম, পেয়ারা, কিংবা বরই চাষ করেও কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখেননি উদ্যোক্তা শেখ মামুন ও আশরাফ শুভ। উৎপাদন খরচ মেটাতেই হিমশিম খেতে হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই নতুন পথের সন্ধান। ২০২০ সালের শেষ দিকে থাইল্যান্ড থেকে রাম্বুটান ও লংগানের চারা এনে শুরু করেন পরীক্ষামূলক চাষ। আজ সেই সিদ্ধান্তই সফলতার গল্প হয়ে উঠেছে।

প্রায় ২০ বিঘা জমির বাগানে এখন রয়েছে ৩৫০টি পরিণত রাম্বুটান গাছ। পাশাপাশি বিভিন্ন জাতের লংগান, থাই কাটি মন, পেঁপেসহ দেশি-বিদেশি নানা ফলের সমাহার। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসছেন বাগান দেখতে, ফল কিনতে কিংবা চারা সংগ্রহ করতে।

বাগানের উদ্যোক্তা শেখ মামুন বলেন, এবার ফলন আরও বেশি হওয়ার আশা ছিল। কিন্তু ফুল আসার সময় টানা বৃষ্টির কারণে অনেক গাছে ফুলের বদলে নতুন পাতা চলে আসে। তবুও ফলন ভালো হয়েছে। গত বছর প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ লাখ টাকার রাম্বুটান বিক্রি হয়েছিল। এবার সেই আয় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকায় পৌঁছাবে বলে তার আশা।

তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বাজার খুঁজতে হয় না। ফল পাকতে শুরু করলেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকার ও খুচরা ক্রেতারা বাগানেই চলে আসেন। বর্তমানে প্রতি কেজি রাম্বুটান প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

এবারের আরেক আকর্ষণ লংগান। বাগানের একাংশজুড়ে রয়েছে ফোর সিজন, কোহালা, রুবি, হোয়াইট, পিংপং ও ডায়মন্ড রিভারসহ বিভিন্ন জাতের লংগান। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় কোন জাত সবচেয়ে ভালো ফলন দেয়, কোনটির স্বাদ বেশি, কোনটিতে শাঁস বেশি এসব নিয়ে কয়েক বছর ধরেই কাজ করছেন উদ্যোক্তারা।

আরেক উদ্যোক্তা আশরাফ শুভ বলেন, তাদের লক্ষ্য শুধু ফল বিক্রি নয়, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উপযোগী লংগান বা কাঠলিচুর জাত নির্বাচন করা। এবার প্রতি কেজি ৪০০ টাকায় লংগান বিক্রি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন ফলের আড়ত ও সুপারশপের প্রতিনিধিরা সরাসরি বাগান থেকে ফল সংগ্রহ করেছেন।

তিনি হেসে হেসে বলেন, লংগানের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী মানুষ নয়, পাখি। ফল পাকা শুরু হলেই পাখিরা ভিড় করে। তবু তারা গাছে জাল দেন না। প্রকৃতির অংশ হিসেবে পাখিদের জন্যও কিছু ফল রেখে দেন।

বাগানটি এখন শুধু ফল উৎপাদনের জায়গা নয়, অনেকটা কৃষি পর্যটনের কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছে। ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও দেখে প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা ছুটে আসছেন।

গাজীপুরের বোর্ড বাজার থেকে আসা সুমন চন্দ্র রায় জানান, বিদেশি ফল যে বাংলাদেশের মাটিতে এত সুন্দরভাবে ফলতে পারে, তা আগে বিশ্বাসই করতেন না। নিজের চোখে দেখে তিনি মুগ্ধ। ফল কিনেছেন, পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিজেও এমন একটি বাগান করার পরিকল্পনা করছেন।

মুক্তাগাছার শরিফুল ইসলামও একই কথা বললেন। দীর্ঘদিন ধরে ইউটিউবে বাগানটি দেখে এবার সরাসরি এসেছেন। তার ইচ্ছা, ফলের পাশাপাশি চারা নিয়ে গিয়ে নিজের বাড়িতেও বিদেশি ফলের বাগান গড়ে তোলা।

বিদেশি ফল হলেও রাম্বুটান ও লংগান বাংলাদেশের আবহাওয়ায় বেশ ভালোভাবেই মানিয়ে নিয়েছে বলে জানান ভালুকা উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নূর জাহান। তার ভাষ্য মতে, রাম্বুটান একটি উচ্চমূল্যের ফল। স্বাদ ও সৌন্দর্যের কারণে এর প্রতি মানুষের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ বাগান দেখতে আসছেন, চারা কিনছেন এবং নতুন বাগান গড়ার পরামর্শ নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, রাম্বুটানে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। মোটা খোসার কারণে এটি তুলনামূলক দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়। অন্যদিকে লংগান গাছও কম পরিচর্যায় ভালো ফলন দেয়। তাই বাণিজ্যিকভাবে এ দুই ফলের চাষের সম্ভাবনা অনেক উজ্জ্বল।

ভালুকার এই বাগান যেন একটি বার্তাই দিচ্ছে- সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য আর নতুন কিছু করার সাহস থাকলে বাংলাদেশের মাটিতেও বিদেশি ফলের সফল চাষ সম্ভব। আর সেই সম্ভাবনার গল্পই এখন ছড়িয়ে পড়ছে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ