ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬ , ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজারে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৪৫৪৩৬ পরিবার

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১৪-০৭-২০২৬ ১১:৪৯:১০ পূর্বাহ্ন
আপডেট সময় : ১৪-০৭-২০২৬ ১২:৫৬:৩৭ অপরাহ্ন
কক্সবাজারে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ৪৫৪৩৬ পরিবার ছবি : সংগৃহীত
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি ইউনিয়ন বমু বিলছড়ি। মাতামুহুরী নদী ও বমু খালের তীরঘেঁষা প্রায় ১৫ হাজার মানুষের এই জনপদ টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানি নামতে শুরু করায় এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। বিভিন্ন সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। 
 
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামে এখনো কোনো ত্রাণ পৌঁছেনি। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবার সংকটে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন দুর্গত মানুষ। দ্রুত ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দা সেলিনা আক্তার বলেন, “বন্যার পানি কিছুটা কমলেও আমাদের দুর্ভোগ এখনো শেষ হয়নি। ঘরের অনেক আসবাবপত্র ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। কয়েকদিন ধরে খুব কষ্টের মধ্যে দিন কাটছে। এখনো আমাদের এলাকায় কোনো ত্রাণ পৌঁছেনি। অনেক পরিবার ধার-দেনা করে বা যা আছে তা দিয়েই কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন।” 

তিনি বলেন, “আমাদের এলাকা দুর্গম হওয়ার কারণে হয়তো এখনো কেউ খোঁজ নিতে পারেনি। দ্রুত ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।”

অপর বাসিন্দা আবদুল জলিল বলেন, “বন্যায় আমাদের এলাকার কয়েকটি সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও রাস্তা ভেঙে গেছে, কোথাও বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। ফলে যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ। কেউ অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক সময় রোগীদের কাঁধে বহন করে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। দ্রুত সড়ক সংস্কার না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে।”

আব্দুস সালাম বলেন, “শুনেছি, ইউনিয়ন পরিষদে ত্রাণ এসেছে। কিন্তু এখনো আমাদের মতো ক্ষতিগ্রস্ত অনেক মানুষের হাতে তা পৌঁছেনি। দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে। আমরা চাই, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে ত্রাণ বিতরণ করা হোক, যাতে কোনো পরিবার সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয়।”

বিবিরখীল গ্রামের বাসিন্দা আহাদুল ইসলাম বলেন, “বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও আমাদের দুর্ভোগ এখনো কমেনি। সড়ক ভেঙে যাওয়ায় বাজারে যাওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছে। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন। আমরা চাই দ্রুত সড়ক সংস্কার এবং জরুরি ত্রাণ সহায়তার ব্যবস্থা করা হোক।”

হারবাং এলাকার বাসিন্দা রেজুয়ানা বেগম বলেন, “ঘরে পর্যাপ্ত খাবার নেই, বিশুদ্ধ পানিরও সংকট দেখা দিয়েছে। শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে অনেক পরিবার মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। দুর্গম হওয়ায় হয়তো এখনো কেউ আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। আমরা প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি, যেন দ্রুত আমাদের এলাকায় ত্রাণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিয়ে মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করা হয়।”

কক্সবাজার জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে জেলার আটটি উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান জানান, দুর্যোগে জেলার ৪৫ হাজার ৪৩৬টি পরিবারের ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৯৮ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মোট ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা ও ১৮ জন স্থানীয় বাসিন্দা। আহত হয়েছেন ২৪ জন। তাদের মধ্যে পাঁচজন রোহিঙ্গা ও ১৯ জন স্থানীয় বাসিন্দ। 

বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া উপজেলা। এই উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ১১ হাজার ২৩১টি পরিবারের প্রায় ৭৫ হাজার ৫০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সেখানে সাতজন নিহত ও একজন আহত হয়েছেন। উপজেলায় ৯৫ মেট্রিক টন চাল ও ২০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৭ হাজার ৪২৭টি পরিবারের ২৯ হাজার ৭০৮ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সেখানে তিনজন নিহত ও একজন আহত হয়েছেন। উপজেলাটির জন্য ৩৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

রামু উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ৭ হাজার ৪৮৫টি পরিবারের ২৯ হাজার ৯৪২ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সেখানে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।

ঈদগাঁও উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ৮০০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উপজেলাটির জন্য ১০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

পেকুয়া উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ৮ হাজার ৫৬২টি পরিবারের ৪৫ হাজার ৪৪৮ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সেখানে দুজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন। উপজেলায় ৭৫ মেট্রিক টন চাল এবং ১৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

মাতামুহুরী উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের ৭ হাজার ৯৮১টি পরিবারের ৪০ হাজার ২০০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সেখানে একজনের মৃত্যু হয়েছে। উপজেলাটির জন্য ৫০ মেট্রিক টন চাল ও ১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

কুতুবদিয়া উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের ১ হাজার ১২৫টি পরিবারের ৪ হাজার ৫০০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সেখানে একজনের মৃত্যু হয়েছে। উপজেলাটির জন্য ১০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শহিদুল আলম বলেন, “দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।”

তিনি জানান, নিহত ১৮ জন স্থানীয় বাসিন্দার মধ্যে আটজনের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে মোট ২ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আহত ১৯ জন স্থানীয়ের মধ্যে তিনজনের পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা করে মোট ৪৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনের এ কর্মকর্তা জানান, দুর্যোগ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় ইউনিয়নভিত্তিক ট্যাগ কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জেলাজুড়ে ৮৮টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। সব উপজেলায় ২১৫টি অ্যান্টিভেনম ভ্যাকসিন বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ৮ লাখ ২৫ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং ২ হাজার ৫০০টি জেরিক্যান বিতরণ করা হয়েছে।

জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, বন্যায় জেলার ৯টি উপজেলার ৬১টি ইউনিয়নে ৩ হাজার ৯১৮টি মৎস্য খামার ও ৪৫৩টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৩১৩ হেক্টর পুকুর এবং ২ হাজার ১২৭ হেক্টর মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ১ হাজার ৯৭ মেট্রিক টন সাদা মাছ, ৩৮৫ মেট্রিক টন চিংড়ি, ৩৫৬ মেট্রিক টন মাছের পোনা এবং ২ কোটি ২১ লাখ চিংড়ির পোনা নষ্ট হয়েছে। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ সাদা মাছে ১৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা, চিংড়িতে ১২ কোটি ৬২ লাখ টাকা, মাছের পোনায় ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং চিংড়ির পোনায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলমান বন্যায় জেলার ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রায় ৪ হাজার ২১১ হেক্টর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গিয়ে ধান, শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এএম খালেকুজ্জামান বলেন, “বন্যায় ৩০৩টি খামারের ১ হাজার ২৯০টি গবাদিপশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৩৩০টি পোলট্রি খামারের ৯৭ হাজার ৫৮১টি হাঁস-মুরগিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”

জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, “জেলার সব ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সরকারি সহায়তা ও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরো ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হবে।”

বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ