আমেরিকার হামলার জবাবে তিন দেশে তেহরানের পাল্টা আঘাত
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
০৯-০৭-২০২৬ ০৫:২৯:০০ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৯-০৭-২০২৬ ০৫:২৯:৪৮ অপরাহ্ন
ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে আবার এক ভয়াবহ যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টানা দুই রাতের রক্তক্ষয়ী ও প্রাণঘাতী বিমান হামলার জবাবে এবার পাল্টা আঘাত হেনেছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তিন প্রতিবেশী দেশ- বাহরাইন, কুয়েত এবং কাতারে অবস্থিত 'মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও কৌশলগত কেন্দ্রগুলোতে' ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। মার্কিন হামলায় ইরানের মূল ভূখণ্ডে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর তেহরান এই চরম প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিল, যা পুরো অঞ্চলকে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরতা ও বিমান হামলা এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। যুদ্ধবিরতির আন্তর্জাতিক আহ্বান এবং তথাকথিত 'নিরাপদ অঞ্চল' বা 'মানবিক অঞ্চল' ঘোষণার তোয়াক্কা না করেই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী নির্বিচারে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
আমেরিকার দ্বিতীয় রাতের ভয়াবহ হামলা
পেন্টাগন এবং মার্কিন সামরিক কমান্ডের নির্দেশে টানা দ্বিতীয় রাতের মতো ইরানের একাধিক কৌশলগত ও গুরুত্বপূর্ণ শহরে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছে মার্কিন বিমানবাহিনী। বিশেষ করে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল 'হরমুজ প্রণালী'র অববাহিকায় অবস্থিত ইরানের উপকূলীয় শহরগুলোকে টার্গেট করে এই হামলা চালানো হয়।
মার্কিন হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের প্রধান শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে বুশেহর, যেখানে দেশের প্রধান পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র অবস্থিত। এছাড়া চাবাহার, যা ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সমুদ্রবন্দর; বান্দর আব্বাস, যা ইরানি নৌবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি এবং অত্যন্ত কৌশলগত সামরিক অঞ্চল হিসেবে পরিচিত; এবং সিরিক, যা হরমুজ প্রণালীর প্রবেশমুখে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় শহর- এসব এলাকাও হামলার কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হতাহতের পরিসংখ্যান
গত দুই দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যাপক বিমান হামলায় ইরানের অন্তত ১৪ জন নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও ৭৮ জনেরও বেশি। স্থানীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে, নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে, কারণ বহু মানুষ ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়ে আছেন এবং হাসপাতালগুলোতে আহতদের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। ইরানের পক্ষ থেকে এই হামলাকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত এবং একটি 'যুদ্ধাপরাধ' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
তিন দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা
আমেরিকার এই প্রাণঘাতী হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান তাদের পূর্বঘোষিত সতর্কবার্তা অনুযায়ী পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) এক বিবৃতিতে জানায়, তারা মার্কিন আগ্রাসনের জবাবে চুপ করে থাকবে না।
এরপরই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত তিনটি দেশে হামলা চালানো হয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উপস্থিতি রয়েছে কয়েকটি দেশে। বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের (ইউএস ফিফথ ফ্লিট) প্রধান সদর দপ্তর, যা উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অভিযানের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। কাতারে রয়েছে আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটি, যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমানবাহিনীর সবচেয়ে বড় কৌশলগত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। এছাড়া কুয়েতে মার্কিন স্থলবাহিনীর বড় ধরনের সামরিক ক্যাম্প ও রসদ সরবরাহ কেন্দ্র রয়েছে, যা অঞ্চলজুড়ে সামরিক অভিযান ও লজিস্টিক সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইরানের দাবি, তারা এই দেশগুলোতে থাকা সুনির্দিষ্ট মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং আমেরিকার কৌশলগত গোয়েন্দা কেন্দ্রগুলোকে সফলভাবে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তবে এই পাল্টা হামলায় মার্কিন বাহিনীর কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, তা এখনও ওয়াশিংটন বা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর পক্ষ থেকে বিস্তারিত জানানো হয়নি। এই হামলার ফলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আকাশসীমা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট 'হরমুজ প্রণালী'তে চরম অচলাবস্থা ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
গাজায় ইসরায়েলি হামলা জোরদার
ইরান ও আমেরিকার এই সংঘাতের সমান্তরালে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসন আরও তীব্র হয়েছে। আল জাজিরার মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজায় ইসরায়েলি বিমান ও স্থল হামলা আগের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
আল জাজিরার সংবাদদাতা হিন্দ খুদারির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গাজায় হামলার সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। ইসরায়েলি হামলায় আহত হওয়া অধিকাংশ ফিলিস্তিনিই মাত্র কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে মারা যাচ্ছেন। এর একমাত্র কারণ হলো, গাজার হাসপাতালগুলোতে কোনো চিকিৎসা সামগ্রী নেই, কোনো ওষুধ নেই। হাসপাতালগুলোর পক্ষে এই বিপুল সংখ্যক গুরুতর আহত মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।
গত ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইসরায়েলি বিমান হামলা এবং স্নাইপারের গুলিতে অন্তত নয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একজন সাধারণ ট্রাক চালকও রয়েছেন, যিনি দক্ষিণ গাজার রাফাহ শহরে ইসরায়েল কর্তৃক ঘোষিত 'নিরাপদ অঞ্চল' বা সেফ জোনের মধ্য দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
শুধু তাই নয়, ইসরায়েলি বাহিনী আল-মাওয়াসি (al-Mawasi) এলাকায় একটি শরণার্থী তাঁবুতে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে, যেখানে আশ্রয় নেওয়া একটি পুরো পরিবার তাৎক্ষণিকভাবে নিহত হয়েছে। এই হামলায় আরও একটি নিষ্পাপ ফিলিস্তিনি শিশুর নির্মম মৃত্যু হয়েছে।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক চাপ ও যুদ্ধবিরতির আলোচনার মুখে ইসরায়েল এই আল-মাওয়াসি এলাকাকে 'মানবিক অঞ্চল' হিসেবে ঘোষণা করেছিল এবং গাজার সাধারণ মানুষকে সেখানে আশ্রয় নিতে বলেছিল। কিন্তু নিজেদের ঘোষিত সেই 'মানবিক অঞ্চল'-এও ইসরায়েলিদের বর্বর হামলা ও হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভূ-রাজনৈতিক শঙ্কা
ইরান ও আমেরিকার এই প্রত্যক্ষ যুদ্ধ এবং গাজায় ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান হামলা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদি ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি বাহরাইন, কাতার ও কুয়েতের মতো আরব দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা অব্যাহত রাখে, তবে এই দেশগুলোও পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে এই যুদ্ধের অংশ হয়ে পড়বে।
বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ইতিমধ্যেই এক লাফে আকাশচুম্বী হতে শুরু করেছে, কারণ হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ তেল সরবরাহ করা হয়, যা এখন সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে। জাতিসংঘ এবং বিশ্ব নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে উভয় পক্ষকে সংযত হওয়ার এবং যুদ্ধবিরতি কার্যকরের আহ্বান জানালেও, মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি দিন দিন আরও রক্তক্ষয়ী রূপ ধারণ করছে।
বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স