মিজানুরের ছোট্ট চায়ের দোকান যেন এক টুকরো 'ব্রাজিল'
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১৬-০৬-২০২৬ ১২:৫৩:১৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৬-০৬-২০২৬ ০৩:০৩:৩৪ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
পৃথিবীর মানচিত্রে ব্রাজিল কোথায়, কোন মহাদেশে- সেটি হয়তো ঠিকভাবে বলতে পারবেন না মিজানুর রহমান। কিন্তু ফুটবলের দেশ ব্রাজিলের প্রতি তার ভালোবাসা যেন মানচিত্রের সীমানাকেও হার মানিয়েছে। জীবনের কঠিন বাস্তবতা, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, কোনোটিই দমাতে পারেনি তার ফুটবলপ্রেমকে।
নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার খিলপাড়া ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের লটপটিয়া গ্রামের বৈদ্য বাড়ির মৃত নুর মোহাম্মদের ছেলে মিজানুর রহমানের জীবনটা ছিল সংগ্রামের।
জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। মাত্র ১১ মাস পর পায়ের জটিল অসুস্থতা নিয়ে দেশে ফিরতে হয় তাকে। পরে ২০১৩ সালে চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তে কেটে ফেলতে হয় তার ডান পা। এক পা হারিয়ে অনেকের জীবন থেমে যায়। কিন্তু মিজানের থামেনি। ২০১৬ সালে বিয়ে করেন, এখন চার সন্তানের জনক তিনি। জীবিকার তাগিদে খুলেছেন ছোট্ট একটি চায়ের দোকান। আর সেই দোকানই এখন বিশ্বকাপ ফুটবলকে ঘিরে এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
বর্তমানে নিজে ফুটবল খেলতে না পারলেও ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা কখনো কমেনি তার। বিশেষ করে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের প্রতি তার টান যেন অন্যরকম। বিশ্বকাপ এলেই হৃদয়ে নতুন করে জেগে ওঠে সেলেসাওদের প্রতি ভালোবাসা।
এবারের বিশ্বকাপকে সামনে রেখে দীর্ঘদিন ধরে কষ্টের টাকা জমিয়ে নিজের ছোট্ট চায়ের দোকানটি সাজিয়েছেন ব্রাজিলের পতাকা ও সবুজ-হলুদ রঙে। দোকানের ভেতর-বাইরে উড়ছে ব্রাজিলের পতাকা, চারপাশজুড়ে সবুজ-হলুদের ছোঁয়া। দূর থেকে দেখলেই মনে হয়, যেন বাংলাদেশের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট এক ব্রাজিল!
মিজানের এই ব্যতিক্রমী আয়োজন শুধু তার একার আবেগ নয়, হয়ে উঠেছে এলাকার ফুটবলপ্রেমীদেরও মিলনস্থল। প্রতিদিন সন্ধ্যা নামলেই তার দোকানে ভিড় করেন ব্রাজিল সমর্থকরা। চলে খেলা নিয়ে আলোচনা, স্মৃতিচারণ আর স্বপ্ন বোনা। তবে এখানেই শেষ নয় তার ভালোবাসা। মিজান ঘোষণা দিয়েছেন, এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হলে তিনি দীর্ঘদিন ধরে লালন-পালন করা একটি খাসি ছাগল জবাই করে এলাকাবাসীকে নিয়ে উৎসব করবেন।
মিজানুর রহমান বলেন, আমি চাই সবাই আনন্দের সঙ্গে খেলা দেখুক। যে যার পছন্দের দল সমর্থন করবে, কিন্তু ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে কোনো ঝগড়া বা বিরোধে জড়াবে না। ফুটবল মানুষের মধ্যে আনন্দ আর সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিক।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মান্নান বলেন, মিজান ভাইয়ের মতো এমন নিবেদিত সমর্থক খুব কম দেখা যায়। নিজের কষ্টের টাকা জমিয়ে তিনি যেভাবে দোকান সাজিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার আনন্দে এলাকার মানুষও আনন্দ পায়।
ব্রাজিল সমর্থক মিরাজ উদ্দিন বলেন, বিশ্বকাপ এলেই মিজান ভাইয়ের দোকানটা ব্রাজিল সমর্থকদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। আমরা একসঙ্গে খেলা দেখি, আড্ডা দিই। তার এই আয়োজন পুরো এলাকায় উৎসবের আবহ তৈরি করেছে।
নোয়াখালী জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা মাঈন উদ্দিন মিলকি বলেন, মিজানের মতো সাধারণ মানুষের খেলাধুলার প্রতি এমন আন্তরিক ভালোবাসা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। এই আবেগকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে পারলে ভবিষ্যতে দেশ আরও ভালো খেলোয়াড় পাবে। আমরা চাই, একদিন বিশ্বকাপের মঞ্চে লাল-সবুজের পতাকাও সমান গর্বে উড়ুক।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স