ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ , ২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নদী খননের পলিমাটিতে চাপা পড়ছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১৬-০৬-২০২৬ ১২:০৫:৪৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৬-০৬-২০২৬ ১২:০৫:৪৪ অপরাহ্ন
নদী খননের পলিমাটিতে চাপা পড়ছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ছবি : সংগৃহীত
বৃদ্ধ বয়সে আর কোনও স্বপ্ন ছিল না আব্দুল হামিদ শেখের। শুধু চেয়েছিলেন মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ ঠাঁই। সারাজীবন অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে জীবন কাটানো এই ষাটোর্ধ্ব মানুষটি কখনো নিজের নামে এক টুকরো জমির মালিক হতে পারেননি। কয়েক বছর আগে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটি ঘর পেয়ে মনে হয়েছিল জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অন্তত একটি ঠিকানা মিলেছে।

কিন্তু এখন সেই ঘরের চারপাশে মাটির পাহাড়। জানালা-দরজা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। দেয়ালে ফাটল ধরেছে। ঘরের পেছন থেকে চাপ দিচ্ছে নদী খনন করে ফেলা বিপুল পরিমাণ পলিমাটি। প্রতিদিন ঘুম ভাঙে আতঙ্ক নিয়ে, এই বুঝি ধসে পড়ল শেষ আশ্রয়টুকু।

আব্দুল হামিদ শেখ বলেন, ‘বয়স হইছে। আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই। সরকার ঘর দিছিল, মনে করছিলাম শান্তিতে থাকমু। এখন ঘরের চারপাশে মাটি ফালাইয়া এমন অবস্থা করছে যে, ঘরে থাকতেই ভয় লাগে।’

আব্দুল হামিদের মতো একই দুর্ভোগে আছেন ডুমুরিয়া উপজেলার ভদ্রা নদীর তীরবর্তী আশ্রয়ণ প্রকল্পের আরও কয়েক ডজন পরিবার। খর্নিয়া এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা তাহমিনা বেগমের ঘরের ভেতরেও ঢুকে পড়েছে কাদা মাটি। স্বামী অসুস্থ। ছোট সন্তানকে সামলে দিনের পর দিন নিজেই ঘরের ভেতরের মাটি কেটে বাইরে ফেলছেন।

তাহমিনা বেগম বলেন, ‘ঘরের পেছনের টিন ভেঙে কাদা ঢুইকা গেছে। বৃষ্টি হইলে আরও ভয় লাগে। বাচ্চা লইয়া রাতে ঘুমাইতে পারি না। কখন কী হয় সেই চিন্তায় থাকি।’ একই আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা মো. রাশেদ বলেন, ‘নদী খননের কাজ হইব, আমরা তাতে বাধা দেই নাই। কিন্তু আমাদের ঘরের গা ঘেঁষে এত মাটি ফেলছে যে দেয়ালে ফাটল ধরছে। টিউবওয়েল নষ্ট হইছে। টয়লেট ভাঙা। এখন খাবার পানি আর নিরাপদ থাকার দুইটাই সংকট।’

একই প্রকল্পের রহমান সরদার বলেন, ‘অনেকেই খাট, আলমারি, হাঁড়ি-পাতিল বাইরে রাখছে। ঘর ধইরা রাখা মুশকিল। আমরা গরিব মানুষ, এই ঘরটাই সব। এটা নষ্ট হইলে আবার রাস্তায় নামতে হবে।’

সরেজমিনে দেখা গেছে, ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর, কাঁঠালতলা ও খর্নিয়া এলাকার সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পসংলগ্ন ভদ্রা নদী খননের কাজ চলমান রয়েছে। নদী থেকে উত্তোলন করা বিপুল পরিমাণ পলিমাটি বিভিন্ন স্থানে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের একেবারে পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। কোথাও ঘরের দেয়াল মাটির চাপে বেঁকে গেছে, কোথাও জানালা চাপা পড়েছে। অনেক জায়গায় টয়লেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কয়েকটি টিউবওয়েল অকেজো হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ড্রেজিং করা মাটি কোথায় ফেলা হবে, কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত পরিকল্পনা না থাকায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি, ২০ জুন এবং ২০২২ সালে তিন ধাপে ডুমুরিয়ার চুকনগর, খর্নিয়া ও কাঁঠালতলা এলাকায় শতাধিক ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়।

খাস জমিতে নির্মিত দুই কক্ষবিশিষ্ট সেমি-পাকা ঘর ও জমির দলিল হাতে পেয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন এসব পরিবার। অনেকেই আগে রেললাইনের পাশে, অন্যের জমিতে কিংবা ভাড়া বাসায় অমানবিক জীবন কাটিয়েছেন।

যশোর ও খুলনার ভবদহ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকার আপার ভদ্রাসহ পাঁচটি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখনন প্রকল্প হাতে নেয়। এর আওতায় হরিহর, হরি-তেলিগাতী, আপার ভদ্রা, টেকা ও শ্রী নদী পুনঃখনন করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাঁচটি নদীর মোট ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখননে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৯৯৮ দশমিক ১৯ লাখ টাকা। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন।

স্থানীয়দের দাবি, চলতি বছরের জানুয়ারিতে চুকনগর এলাকায় নদী খননের সময় প্রায় ৮০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কাঁঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৪টি এবং খর্নিয়া এলাকার আরও ২৪টি পরিবারও সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়ে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলার  সম্পাদক, অ্যাডভোকেট কুদরত-ই-খুদা বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অবশ্যই প্রয়োজন। তবে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে গৃহহীন মানুষের শেষ আশ্রয়টুকু ঝুঁকির মুখে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটি অমানবিক।

এ বিষয়ে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প সমন্বয়কারী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, ‘কাজটি সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে বিষয়টি আমাদের নজরে আসার পরপরই সংশ্লিষ্ট এলাকায় কাজ শুরু হয়েছে। যেসব স্থানে মাটি জমে ছিল, তা সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত দেয়াল ও অন্যান্য অবকাঠামোও মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।’
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
   
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ