ঢাকা , সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬ , ১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যমুনার ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব শত শত পরিবার

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১৫-০৬-২০২৬ ০২:৪৭:৩১ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৫-০৬-২০২৬ ০২:৪৭:৩১ অপরাহ্ন
যমুনার ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব শত শত পরিবার ছবি : সংগৃহীত
জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলায় মন্নিয়া চরে যমুনার ক্রমাগত ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, আবাদি জমিসহ বহু স্থাপনা। এতে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ। নদী ভাঙনরোধে নেওয়া হচ্ছে না উদ্যোগ। এসব নদীভাঙনের শিকার মানুষদের পুনর্বাসনেরও উদ্যোগ নেই। ফলে বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা দিনদিনই বড়েছে ।

যমুনা যেন নতুন করে রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। প্রবল স্রোত আর ভয়াবহ ভাঙনে দিশাহারা হয়ে পড়েছে চরবাসী। অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে প্রায় ৭০ বছরের পুরোনো দ্বীপচর মন্নিয়া। নদীর অব্যাহত আগ্রাসনে জনপদটি আজ বিলীন হওয়ার শঙ্কায় দিন গুনছে।

গত কয়েক সপ্তাহের ভয়াবহ ভাঙনে প্রায় দেড় শতাধিক পরিবারের কয়েকশ মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। নদীতে বিলীন হয়েছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, শত শত গাছপালা ও অসংখ্য বসতবাড়ি।

যমুনার গ্রাসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, চারটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি পুরোনো মসজিদ, স্থানীয় বাজার, পল্লী বিদ্যুৎ অফিস, প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সোলার বিদ্যুৎ প্রকল্প, পাকা সড়ক ও গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

সম্প্রতি সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, চরজুড়ে শুধুই ভাঙনের ক্ষতচিহ্ন। কোথাও ঘরবাড়ি খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, কোথাও আবার বাড়ির আঙিনার পাশেই তৈরি হয়েছে গভীর খাদ। নদী তীরজুড়ে বাঁশ, বালুভর্তি বস্তা ও মাটির বস্তা ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাচ্ছেন স্থানীয় মানুষ।

ইসলামপুর উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক জানান, স্বাধীনতার আগেই যমুনার বুকে জেগে উঠেছিল মন্নিয়া চর। ৭০ বছরে ধীরে ধীরে সেখানে গড়ে ওঠে জনবসতি। সময়ের পরিক্রমায় এটি পরিণত হয় একটি পূর্ণাঙ্গ জনপদে। বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসবাস এ চরে। মানুষের প্রয়োজন মেটাতে গড়ে উঠেছে বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ সুবিধাসহ নানা নাগরিক অবকাঠামো।

তিনি বলেন, চরের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। ধান, গম, ভুট্টা ও বিভিন্ন রবি ফসল উৎপাদনের জন্য এটি অত্যন্ত উর্বর এলাকা। কিন্তু এখন সেই উর্বর জমির বড় অংশই নদীতে চলে গেছে। যেভাবে যমুনা ভাঙছে, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ইসলামপুরের মানচিত্র থেকেই হারিয়ে যেতে পারে মন্নিয়া চর।
 
মন্নিয়া চরের বাসিন্দা আব্দুল কালাম নদীর দিকে ইশারা করে বলেন, ওই জায়গাটাতেই আমার চাচার বাড়ি ছিল। কয়েকদিন আগেও সেখানে মানুষ বসবাস করত। এখন কিছুই নেই। একে একে সবকিছু নদী নিয়ে যাচ্ছে। মানুষ ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছে। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে, কেউ খোলা জায়গায় অস্থায়ী ঘর তুলে বসবাস করছে।

কয়েক গজ দূরে দেখা যায়, বসতঘরের টিন খুলে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন কয়েকজন শ্রমিক।

পাশে দাঁড়িয়ে গৃহবধূ রমেছা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ঘর, রান্নাঘর, উঠান—সব নদীতে চলে গেছে। এখন নদীর ধারে কোনোমতে থাকি। বাচ্চাগুলারে নিয়ে খুব ভয় লাগে। রাত হলেই মনে হয় এবার হয়তো আমরাও নদীতে যামু’।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মন্নিয়া চরের মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন । তবে এবারের ভাঙন অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ। প্রতিদিনই নদী কয়েক ফুট করে ভেতরের দিকে এগিয়ে আসছে।

যাদের ঘরবাড়ি যমুনা নদীর তীরে আছে, তারা আছেন আতঙ্কে। কারণ, যেকোনো সময় বসতঘর ও জমি নদীতে বিলীন হতে পারে। উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন ভাঙনকবলিত মন্নিয়ার চরের মানুষ।

৬০ বছর বয়সি কৃষক গফুর মণ্ডল বলেন, ‘আগেও তিনবার নদী আমাদের সবকিছু গিলে খাইছে। অনেক কষ্টে দুই যুগ আগে এখানে আবার ঘর তুলছি। এখন আবার সেই একই ভয়। সরকার যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয় তাহলে আমরা কোথায় যামু?

তীব্র ভাঙনে একের পর ঘরবাড়ি ফসলি জমি বিলীন হলেও ভাঙন রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে না পানি উন্নয়ন বোর্ড। নদী এলাকা পরিদর্শন করে গেলেও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না—অভিযোগ নদীভাঙনের শিকার মানুষদের।

মন্নিয়ার চরবাসীদের দাবি, মন্নিয়া চরে ৩০ হাজার মানুষের বসবাস। অথচ স্থায়ী নদীশাসন কিংবা কার্যকর তীররক্ষা প্রকল্পের অভাবে প্রতিবছরই তাদের জীবন-জীবিকা অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। চরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে টেকসই নদী রক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করে জনপদটিকে রক্ষার উদ্যোগ নিতে হবে।

দ্বীপ চর মন্নিয়াতে যমুনার ভাঙনের বিষয়ে ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঙ্গে যোগাযেগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তীব্র ভাঙনের মুখে মন্নিয়ার চর নিয়ে জামালপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নকিবুজ্জামান বলেছেন, মন্নিয়ার চরে নদীভাঙন রক্ষার কাজইতো শেষ করতে পারছি না। এ বিষয়টি বিবেচনায় আছে।

জামালপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইউসুপ আলী বলেছেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কথা হয়েছে, মন্নিয়া চরে যমুনার ভাঙনরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন তারা।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ