ঢাকা , সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬ , ১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ সব পরিচালকের নিয়োগ বাতিল

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১৫-০৬-২০২৬ ১২:১০:২৬ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৫-০৬-২০২৬ ১২:১০:২৬ অপরাহ্ন
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ সব পরিচালকের নিয়োগ বাতিল ফাইল ছবি
আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানসহ সব পরিচালকের নিয়োগ বাতিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেনকে। গতকাল রোববার বিকেলে ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর এ সিদ্ধান্ত জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

গতকাল রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারা এবং ৪৭(৩) ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর অর্পিত ক্ষমতাবলে এবং ব্যাংক-কোম্পানি, আমানতকারী ও জনস্বার্থে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানসহ সব পরিচালকের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে।

একই আইনের ৪৭(৩) ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন পর্ষদের যাবতীয় ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ব্যাংকের পর্ষদ বাতিল করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তিনি শুধু পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব পালন করবেন। এর বাইরে কিছু নয়।

সংকট কাটাতে বিশেষ ধার

এদিন সকালে ব্যাংকের চলমান তারল্য সংকট কাটাতে ইসলামী ব্যাংককে বিশেষ ধার হিসেবে দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাংকটিতে অস্থিরতা শুরু হয়। এতে ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা বিপুল পরিমাণ আমানত তুলে নেন। ফলে ব্যাংকটি চরম তারল্য সংকটে পড়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ এ ধার দেওয়া হয়।

জানা গেছে, গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকা ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাবে এ টাকা দেওয়া হয়। এর ফলে ব্যাংকটির চেক নিষ্পত্তি আবার চালু হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার ব্যাংকের চলতি হিসাবে মাত্র ৪৩৯ কোটি টাকা ছিল। ফলে ইসলামী ব্যাংকের চেক অন্য কোনো ব্যাংক নিষ্পত্তি করেনি। ব্যাংকের এটিএম বুথও ছিল অচলাবস্থায়। গ্রাহকরা শাখায় গিয়েও চাহিদা অনুযায়ী টাকা পাননি।

গত শুক্রবার বাজেটপরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ইসলামী ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ওইদিন তিনি বলেন, আমানতকারীদের আতঙ্কের কিছু নেই। ইসলামী ব্যাংকের সংকট দ্রুত কেটে যাবে। আমানতকারীদের টাকা তুলতে সমস্যা হবে না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে তারল্য সহায়তা পাওয়ার পর গ্রাহকদের উদ্দেশে এক ভিডিওবার্তায় ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলতাফ হুসাইন বলেন, সাম্প্রতিক কয়েকদিনে ব্যাংকের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় এবং অনেক গ্রাহক প্রত্যাশিত সময়ে ব্যাংকিং সেবা নিতে না পারায় কর্তৃপক্ষ দুঃখ প্রকাশ করেছে।

তিনি বলেন, আপনাদের উদ্বেগ আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করছি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সর্বাত্মকভাবে কাজ করছি। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, ইসলামী ব্যাংক দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংক। দেশের অর্থনীতি, আমানতকারী, প্রবাসী আয় প্রেরণকারী এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য এ ব্যাংকের গুরুত্ব বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

ধার দেওয়া হলো যেভাবে

বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডারের ১৬(৪)(ডি) এবং ১৭(১)(বি) ধারা অনুযায়ী, ৯০ দিন মেয়াদে সাড়ে ১১ শতাংশ সুদে এ অর্থ দেওয়া হয়। ব্যাংকিং পরিভাষায় একে ‘ওভারনাইট-ওডি’সুবিধা বলা হয়। এ ধারের বিপরীতে ব্যাংকটি সমমূল্যের ‘ডিমান্ড প্রমিসরি নোট’ জমা দিয়েছে। শর্তানুযায়ী, কোনো কারণে ব্যাংকটি অবসায়িত বা দেউলিয়া হলে সম্পদ বিক্রি করে সবার আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ পাওনা পরিশোধ করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে পাইলটসহ নিহত ১২যুক্তরাষ্ট্রে বিমান বিধ্বস্ত হয়ে পাইলটসহ নিহত ১২
গভর্নরের সঙ্গে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বৈঠক

চলমান পরিস্থিতি নিয়ে ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ইসলামী ব্যাংকের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তার সঙ্গে ব্যাংকের দুজন অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) এবং ছয়জন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন এমডি আলতাফ হুসাইন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো ক্যাশ সাপোর্ট দিয়েছে। ওই অর্থ পাওয়ার পর লেনদেনের বর্তমান অবস্থা এবং তা দিয়ে কতটা পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, চেয়ারম্যান নিয়োগ ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ইস্যু। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আমাদের সঙ্গে আলোচনা করেনি। আমাদের দায়িত্ব হলো ব্যাংকের ব্যবসা ও সেবা কার্যক্রম সচল রাখা।

ব্যাংক থেকে আমানত উত্তোলনের চাপের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন নিট এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা উত্তোলন হচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তায় গ্রাহকসেবা স্বাভাবিক রাখতে চেষ্টা চলছে। আজ (গতকাল রোববার) আমরা যে ধরনের সেবা দিতে পেরেছি, সোমবার (আজ) তা আরো বাড়বে। আমাদের চলতি হিসাব এখন ইতিবাচক অবস্থায় আছে। প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাও দ্রুত সচল করা হচ্ছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা পুরোপুরি চালু হবে।

যেভাবে নতুন সংকটের শুরু

ঈদের আগের শেষ কর্মদিবস গত ২৪ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। পরে ওইদিন রাতেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। খুরশীদ আলম ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান। তিন বছরের জন্য তাকে এ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় আওয়ামী লীগ সরকার।

তবে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে ওই আমলে নিয়োগ পাওয়া তিনিসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন চার কর্মকর্তা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তাকে আবার ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগ করায় এর বিরোধিতা করে বিভিন্ন ব্যানারে কর্মসূচি পালন করে আসছেন একদল গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডার।

গত ১ জুন থেকে এ আন্দোলন শুরু হয়। গ্রাহক ফোরাম খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিলসহ সাত দফা দাবি করছে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকালও ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে কর্মসূচি পালন করেন তারা। শুধু ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে নয়, বিভিন্ন শাখায় কর্মসূচি পালন করছেন গ্রাহকরা।

এদিকে জাতীয় সংসদেও ইসলামী ব্যাংক নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তুমুল আলোচনা হয়। এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের মধ্যে টাকা তোলার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। অতিরিক্ত টাকা উত্তোলনের ফলে ব্যাংক গভীর তারল্য সংকটে পড়ে। সংকট এতটা গভীর হয় যে, বাংলাদেশ ব্যাংকে নগদ জমা বা সিআরআর রাখতে ব্যর্থ হয়েছে ইসলামী ব্যাংক। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা ধার চায় ইসলামী ব্যাংক।

সংকট এখনো কাটেনি

চলমান অস্থিরতার কারণে বিভিন্ন শাখায় অস্বাভাবিক টাকা উত্তোলনের চাপ তৈরি হয়। সে চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মকর্তারা। গতকাল সরেজমিন দেখা যায়, ব্যাংকের শাখাগুলো এখনো গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিতে পারছে না। কেউ ১০ হাজারের বেশি উত্তোলন করতে পারছেন না। অন্যদিকে এটিএম বুথে টাকা তুলতে এসে ফিরে যাচ্ছেন গ্রাহকরা। ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়েও সেবা মিলছে না।

ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, একজন বিতর্কিত লোককে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার পর অস্থিরতা শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাংকটি ভালোভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ