বৃষ্টি হলেই সবাই খিচুড়ি খেতে চায় কেন?
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
১২-০৬-২০২৬ ০৬:২৫:৫২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১২-০৬-২০২৬ ০৬:২৫:৫২ অপরাহ্ন
ছবি: সংগৃহীত
বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি খেতে কমবেশি সবাই ভালোবাসেন। চাল-ডাল ফুটিয়ে খুব সহজেই খিচুড়ি রান্না করা যায়। তাই বৃষ্টি দেখলেই অনেকের হাঁড়িতে চড়ে বসে গরম গরম খিচুড়ি। এটি যেমন পেট ভরায়, তেমনি সুস্বাদুও। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন কি, বৃষ্টির দিনেই কেন খিচুড়ি খাওয়ার এত চল? কোথা থেকে এল এই প্রথা? চলুন জেনে নেওয়া যাক তার গল্প।
শোনা যায়, ১২০০ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে বাংলায় খিচুড়ির ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়। মনসামঙ্গল কাব্যে উল্লেখ আছে, স্বয়ং শিব পার্বতীর কাছে যে খাবারের আবদার করেছিলেন, তা ছিল খিচুড়ি। বর্তমানে একে অনেক সময় ‘গরিবের আমিষ’ বলা হলেও প্রাচীনকালে ডাল ছিল উচ্চবিত্তদের খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এমনকি জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতেও খিচুড়ি ছিল জনপ্রিয় একটি পদ।
তবে একটি জনপ্রিয় ধারণা হলো, খিচুড়ির প্রচলন শুরু হয়েছিল বাউলদের হাত ধরে। ছন্নছাড়া এই পথশিল্পীরা গান গেয়ে দক্ষিণা হিসেবে চাল ও ডাল পেতেন। পরে সেই চাল-ডাল একসঙ্গে রান্না করে দ্রুত ও সহজে খাবার তৈরি করতেন। ধীরে ধীরে এই খাবারই ‘খিচুড়ি’ নামে পরিচিতি লাভ করে। যদিও এটি ছিল তাদের নিত্যদিনের খাদ্য।
ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়েও খিচুড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়। গ্রিক সেনাপতি সেলুকাস ভারতীয় উপমহাদেশে চাল-ডাল মিশিয়ে তৈরি এক ধরনের খাবারের কথা লিখে গেছেন। বিখ্যাত পণ্ডিত আল-বিরুনিও তার লেখায় খিচুড়ির প্রসঙ্গ তুলেছেন। মরক্কোর পর্যটক ইবন বতুতা খিচুড়ি তৈরিতে মুগ ডাল ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন। এমনকি চাণক্যের লেখাতেও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের সময়কার খিচুড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়।
মুঘল সম্রাট আকবরের সভাসদ আবুল ফজল তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আইন-ই-আকবরী-তে নানা ধরনের খিচুড়ির বর্ণনা দিয়েছেন। শোনা যায়, সম্রাট জাহাঙ্গীরও খিচুড়ি খুব পছন্দ করতেন। তাঁর জন্য তৈরি বিশেষ খিচুড়িতে পেস্তা ও কিসমিস মেশানো হতো, যার নাম ছিল ‘লাজিজান’। পরবর্তী সময়ে ভিক্টোরিয়ান যুগে খিচুড়ি ইংল্যান্ডের রান্নাঘরেও জায়গা করে নেয়।
তবে বর্ষার দিনে খিচুড়ি খাওয়ার পেছনে রয়েছে আরও একটি বাস্তব কারণ। গ্রামবাংলায় বর্ষাকালে চারপাশ জলমগ্ন হয়ে যেত। কাদা ও জল পেরিয়ে দূরের বাজারে যাওয়া ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। ফলে ঘরে মজুত থাকা চাল ও ডাল দিয়েই সহজে রান্না করা হতো খিচুড়ি।
এ ছাড়া বৃষ্টির দিনে উনুনে বারবার আগুন জ্বালানোও ছিল ঝামেলার কাজ। তাই একবার আগুন জ্বালিয়েই চাল-ডাল একসঙ্গে রান্না করে নেওয়া হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সহজ খাবারটি মানুষের প্রিয় পদে পরিণত হয়। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ডিম, মাংস, মাছ, সবজি কিংবা নানা ধরনের ভাজাভুজি।
অনেকের মতে, এর পেছনে একটি বৈজ্ঞানিক কারণও রয়েছে। খিচুড়ি তুলনামূলকভাবে গুরুপাক খাবার। বিশেষ করে এর সঙ্গে বিভিন্ন ভাজাপোড়া খেলে হজমে সমস্যা হতে পারে। গরমের দিনে এমন খাবার খাওয়া অস্বস্তিকর হতে পারে। কিন্তু বর্ষার শীতল ও আরামদায়ক আবহাওয়ায় খিচুড়ি খেলে তা শরীরের জন্য বেশি উপযোগী বলে মনে করা হয়। একই কারণে শীতকালেও খিচুড়ি খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।
তাই বলা যায়, ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রয়োজন এবং আবহাওয়ার প্রভাব—সব মিলিয়েই বৃষ্টির দিনের সঙ্গে খিচুড়ির সম্পর্ক আজ অবিচ্ছেদ্য হয়ে উঠেছে।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচবি/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স