জলবায়ু পরিবর্তন
উপকূলে মাছ চাষে বিপর্যয়: পুঁজি হারিয়ে সর্বস্বান্ত চাষিরা
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১১-০৬-২০২৬ ১২:১০:৪০ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১১-০৬-২০২৬ ০২:৫৫:৪২ অপরাহ্ন
ছবি : সংগৃহীত
জলবায়ু পরিবর্তনে মোংলা উপকূলীয় অঞ্চলে মাছ চাষে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। চৈত্র-বৈশাখে টানা অনাবৃষ্টি, তীব্র তাপদাহ আর ঘেরের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণ ছড়িয়ে পড়ায় মাছে ক্ষত দেখা দিচ্ছে। প্রতিদিন মরে ভেসে উঠছে লাখ লাখ টাকার বাগদা চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। আর এনজিও কিংবা ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ঘের করা প্রায় ১৪ হাজার চাষি পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার পথে রয়েছেন। মৎস্য বিভাগ বলছে, অপরিকল্পিত চাষের কারণে প্রতিবছর এমন ঘটনা ঘটছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ভৌগলিক কারণে মোংলা উপজেলার মাটি ও পানি অতিরিক্ত লবণাক্ত। ফলে এখানে ধান কিংবা অন্য কোনো কৃষিজ ফসল ফলানো সম্ভব হয় না। জীবিকার তাগিদে এই উপজেলার মানুষের একমাত্র ভরসা শুধুই মৎস্য চাষ।
স্থানীয় মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মোংলা উপজেলার প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে মোট ১৩ হাজার ৭৬৮ চাষি বাগদা, গলদা ও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে বাগদা চাষি ৬ হাজার ৭০ জন, গলদা চাষি এক হাজার ৮৫০ জন, সরকারি ক্লাস্টার চাষি ১০০ জন এবং ছোট পুকুর ও সাদা মাছ চাষি রয়েছেন ৫ হাজার ৭৪৮ জন।
মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত কয়েক মাস ধরে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় ঘেরের পানির গভীরতা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। দুপুরের তীব্র রোদে ঘেরের পানি অতিরিক্ত গরম হয়ে তৈরি হচ্ছে বিষাক্ত গ্যাস।
ভুক্তভোগী মৎস্য চাষিরা জানান, ব্যাংক ও বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তারা ঘেরে পোনা ছেড়েছিলেন। কিন্তু অনাবৃষ্টি আর গরমে পানি শুকিয়ে মাছ লাল হয়ে মরে ভেসে উঠছে। ধারদেনা শোধ করা তো দূরের কথা, এখন পরিবারের ভরণপোষণ চালানোই তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরেও এই উপজেলায় পাঁচ হাজার ৬২১ মেট্রিক টন বাগদা ও গলদা এবং সাত হাজার ৮৮৫ মেট্রিক টন সাদা মাছ উৎপাদন হয়েছিল। তবে তীব্র তাপদাহের কারণে এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মৎস্য সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে চলতি অর্থ বছরে মোংলায় মাছের সামগ্রিক উৎপাদন গত বছরের তুলনায় অন্তত তিন ভাগের এক ভাগ কমে যেতে পারে; যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধস ডেকে আনবে। এই চরম বিপর্যয় থেকে উপকূলের প্রধান অর্থনৈতিক খাতটিকে রক্ষা করতে এবং দেনার দায়ে জর্জরিত প্রান্তিক মৎস্য চাষিদের টিকিয়ে রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি সহায়তার জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
মোংলায় তীব্র তাপদাহ আর ঘেরের পানিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণ ছড়িয়ে পড়ায় মাছে ক্ষত দেখা দিয়েছে। এতে এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ঘের করা চাষিরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ছবি: সময় সংবাদ
মোংলায় চিংড়ি ঘের মালিকরা বলেন, ‘আমরা একবারে সর্বস্বান্ত হয়ে গেলাম। এইবারের মতো এত গরম আর কোনো বছর দেখি নাই। চৈত্র-বৈশাখ পার হয়ে গেল, কিন্তু গরম কমার কোনো লক্ষণ নাই। ঘেরের পানি রোদের তাপে একদম ফুটন্ত গরম পানির মতো তপ্ত হয়ে উঠছে। ঘেরে এমনিতেই নদীর পানি ঠিকমতো তুলতে পারি নাই, তার ওপর পানির গভীরতা কম থাকায় রোদ সরাসরি তলানিতে গিয়ে লাগছে।’
তারা আরও জানান, গত কয়েকদিন ধরে দুপুরের পর ঘেরের পানি বিষিয়ে লালচে হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন সকালে এসে দেখা যায় হাজার হাজার বাগদা আর গলদা চিংড়ি মরে পানির ওপর ভেসে উঠছে। ধার-দেনা আর ব্যাংক লোন নিয়ে এইবার ঘেরে পোনা ছাড়ছিলাম, আশা ছিল মাছ বেঁচে আগের সব ঋণ শোধ করব। কিন্তু চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেল। একে তো প্রচণ্ড তাপদাহ, তার ওপর পানিতে লবণ আর ভাইরাসের আক্রমণ—সব মিলিয়ে মাছের এই মড়ক ঠেকানোর কোনো উপায় পাচ্ছি না।
পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে, এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব আর পাওনাদারদের টাকাই বা কীভাবে শোধ করব, সেই চিন্তায় রাতে চোখে ঘুম নাই। সরকারি কোনো বড় সাহায্য বা প্রণোদনা না পেলে আমাদের মতো ছোট ঘের মালিকদের এবার না খেয়ে রাস্তায় বসা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, মোংলা তথা উপকূলীয় অঞ্চলে চিংড়ি চাষ আমাদের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু এখানকার অধিকাংশ চাষি এখনো সনাতন ও অপরিকল্পিত পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করছেন। অনেকেই ঘেরে কোনো ধরনের সম্পূরক খাবার না দিয়ে কেবল প্রাকৃতিক খাবারের ওপর নির্ভর করে মাছ ছেড়ে রাখেন। খাবারবিহীন এই চাষ পদ্ধতি চিংড়ির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একদম কমিয়ে দেয়, যার ফলে জলবায়ুর সামান্য পরিবর্তনেই ঘেরে মড়ক দেখা দেয়।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরও জানান, আমরা চাষিদের বারবার অনুরোধ করছি—আপনারা এই সনাতন ও ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি পরিহার করুন। ঘেরের গভীরতা কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ ফুট করুন, সঠিক নিয়মে সুষম ও মানসম্মত মৎস্য খাদ্য প্রয়োগ করা, পোনা ছাড়ার আগে অবশ্যই পিসিআর ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে ভাইরাসমুক্ত পোনা নিশ্চিত করতে পারলে ঘেরে মাছ চাষ করে লাভবান হওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিত চাষিদের কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আধুনিক চাষের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। চাষিরা সচেতন না হলে এবং অপরিকল্পিত চাষ বন্ধ না করলে জলবায়ু পরিবর্তনের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে চিংড়ি শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হবে।’
আমাদের মাঠপর্যায়ের পরিদর্শনে দেখা গেছে, অপরিকল্পিতভাবে ঘেরের আয়তন বিশাল করা হলেও সেগুলোর পানির গভীরতা থাকে মাত্র এক থেকে ১.৫ ফুট। তীব্র তাপদাহে এই অল্প পানি দ্রুত ফুটন্ত গরম হয়ে যায় এবং অক্সিজেন সংকটে মাছ মারা যায়। অনেক চাষি বেশি লাভের আশায় শতাংশ প্রতি নির্ধারিত ঘনত্বের চেয়ে অতিরিক্ত পোনা ছাড়েন, যা এই বিপর্যয়কে আরও বাড়িয়ে তোলে।
চলতি অর্থ বছরে মোংলায় ১৩ হাজার ৭৬৮ জন মৎস্য চাষির মধ্য থেকে মাত্র ৬০ জনকে সরকারিভাবে মাছ চাষের ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স