ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬ , ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক্সপ্লেইনার

যেভাবে তৈরি হয় জাতীয় বাজেট

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০৯-০৬-২০২৬ ০২:৪৯:১৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৯-০৬-২০২৬ ০২:৪৯:১৮ অপরাহ্ন
যেভাবে তৈরি হয় জাতীয় বাজেট ফাইল ছবি
প্রতিবছর সরকারকে বাজেট প্রণয়ন করতে হয় এবং প্রতি জুন মাসে জাতীয় সংসদে বাজেট উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, তাই বাজেট ঘোষণার কয়েক মাস আগে থেকেই দেশজুড়ে শুরু হয় আলোচনা। বাজেটে কর বাড়বে নাকি কমবে, কোন খাতে বরাদ্দ বাড়বে, সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা কী হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও অর্থনীতিবিদরা। তবে সংসদে উপস্থাপনের আগে এই বাজেট কীভাবে তৈরি হয়, সে সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই।

জাতীয় বাজেট একটি জটিল ও সমন্বিত প্রক্রিয়ার ফল। এই প্রক্রিয়ায় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং অর্থ মন্ত্রণালয় একযোগে কাজ করে। সাধারণত নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ার প্রায় ছয় থেকে আট মাস আগে বাজেট তৈরির কাজ শুরু হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ বাজেটসংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করে সেটি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠায়। এতে পরবর্তী অর্থবছরের জন্য ব্যয় পরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশনা, ব্যয়ের সীমা এবং সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার তুলে ধরা হয়।

এর ভিত্তিতে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থা তাদের সম্ভাব্য ব্যয় এবং অর্থের চাহিদার হিসাব তৈরি করে। চলমান প্রকল্প, নতুন উদ্যোগ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয় এবং উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য কত অর্থ প্রয়োজন হবে, তার বিস্তারিত প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

প্রস্তাব পাওয়ার পর অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাই করা হয় এবং সরকারের সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বরাদ্দ চূড়ান্ত করা হয়।

অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পরবর্তী অর্থবছরে সম্ভাব্য রাজস্ব আয়ের পূর্বাভাস তৈরি করে। আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আমদানি-রপ্তানি শুল্ক এবং অন্যান্য উৎস থেকে কত রাজস্ব আদায় হতে পারে, তার হিসাব করা হয়। একই সঙ্গে অ-কর রাজস্ব, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের লভ্যাংশ ও বিভিন্ন সরকারি ফি থেকেও সম্ভাব্য আয়ের চিত্র প্রস্তুত করা হয়।

জাতীয় বাজেটের একটি বড় অংশজুড়ে থাকে উন্নয়ন ব্যয়। এ অংশটি প্রস্তুত করে পরিকল্পনা কমিশন। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) প্রণয়নের মাধ্যমে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও অবকাঠামো খাতের প্রকল্পগুলোতে কত অর্থ বরাদ্দ হবে, তা নির্ধারণ করা হয়। বাজেট ঘোষণার মাসখানেক আগেই এই এডিপি অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)।

একই সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয় দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রপ্তানি-আমদানি পরিস্থিতি এবং কর্মসংস্থানের প্রবণতা বিবেচনায় নিয়ে বাজেটের সামগ্রিক কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়।

বাজেট প্রণয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ। ব্যবসায়ী সংগঠন, অর্থনীতিবিদ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে মতামত নেওয়া হয়। ব্যবসায়ী নেতারা সাধারণত করনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ ও শিল্পোন্নয়নসংক্রান্ত প্রস্তাব তুলে ধরেন, আর অর্থনীতিবিদরা রাজস্ব, ব্যয় ও ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সুপারিশ করেন।

বাজেটের খসড়া প্রস্তুত হওয়ার পর তা মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়। অনুমোদন পাওয়ার পর অর্থমন্ত্রী বা বর্তমান ব্যবস্থায় অর্থ উপদেষ্টা জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতার মাধ্যমে বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।

বাজেট উপস্থাপনের পর সংসদ সদস্যরা এ নিয়ে আলোচনা করেন এবং প্রস্তাবিত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতামত দেন। এরপর অর্থ বিল ও বরাদ্দ বিল পাসের মাধ্যমে বাজেটের আইনগত ভিত্তি সম্পন্ন হয়। রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর তা কার্যকর হয়।

নতুন অর্থবছরের প্রথম দিন, অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে বাজেট কার্যকর হয়। এরপর শুরু হয় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। অর্থ বিভাগ ব্যয় পর্যবেক্ষণ করে, এনবিআর রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করে এবং পরিকল্পনা কমিশন উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি তদারকি করে। একই সঙ্গে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সরকারি ব্যয়ের নিরীক্ষা পরিচালনা করে।

বাংলাদেশে সাধারণত বাজেটে ব্যয়ের পরিমাণ আয়ের চেয়ে বেশি থাকে, যা বাজেট ঘাটতি নামে পরিচিত। এই ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক ঋণ, সঞ্চয়পত্র বিক্রি, বৈদেশিক ঋণ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তার ওপর নির্ভর করে।

একটি জাতীয় বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন কৌশল এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতিফলন। ফলে সংসদে উপস্থাপনের অনেক আগেই শুরু হওয়া বাজেট প্রণয়নের এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন
 

 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ