ঢাকা , মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬ , ১৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

​বাবা-মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত তোফায়েল আহমেদ

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ০২-০৬-২০২৬ ০৫:২৭:৫৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০২-০৬-২০২৬ ০৭:৩৪:৩৫ অপরাহ্ন
​বাবা-মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত তোফায়েল আহমেদ জানাজা শেষে গার্ড অব অনার প্রদান (ইনসেটে তোফায়েল আহমেদের ফাইল ছবি)
ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অগ্রসৈনিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেকমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে সমাহিত করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২ জুন) বেলা সোয়া ৪টায় ভোলা সদরের দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে বাবা-মা ও স্ত্রীর কবরের পাশে শেষ শয্যায় শায়িত করা হয়েছে ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতির এ উজ্জ্বল নক্ষত্রকে।

এর আগে বেলা আড়াইটায় ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে তোফায়েল আহমেদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজার আগে বক্তব্য রাখেন ভোলা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর, তোফায়েল আহমেদের জামাতা ডা. তৌহিদুজ্জামান তুহিন। জানাজায় ইমামতি করেন মাওলানা মুফতি মজিরুদ্দিন।

জানাজা শেষে এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে প্রশাসন।

বাংলাদেশের রাজনীতির নানা বাঁক-বদলের সাক্ষী তোফায়েল আহমেদ সোমবার (১ জুন) বিকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে মারা যান। ৮৩ বছর বয়সি তোফায়েল হাসপাতালটির নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিকালে নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট, হৃদ্‌রোগ ও শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে আট মাস আট দিন ধরে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

সোমবার বাদ মাগ‌রিব রাজধানীর ধানম‌ন্ডির তাকওয়া মস‌জিদে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষজন বর্ষীয়ান রাজনীতিক তোফায়েলের জানাজায় অংশ নেন।

জানাজা শেষে স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে তোফায়েল আহমেদের মরদেহ রাখা হয়।

পরে মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে স্কয়ার হাসপাতাল থেকে এই রাজনীতিকের মরদেহ নেওয়া হয় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। সেখান থেকে মরদেহবাহী একটি হেলিকপ্টার ভোলার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

পরে বেলা দেড়টার দিকে তোফায়েল আহমেদকে বহনকারী হেলিকপ্টার ভোলা হ্যালিপেডে অবতরণ করে এবং দুপুর দুইটার দিকে তার মরদেহ নিয়ে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স জানাজাস্থল ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে পৌঁছায়।

সেখানে জানাজা ও গার্ড অব অনার প্রদান শেষে তার মরদেহ নেওয়া হয় গ্রামের বাড়িতে। পরে বাড়ি সংলগ্ন মসজিদ প্রাঙ্গণে তার তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

তৃণমূল থেকে উঠে আসা এ রাজনীতিকের জন্ম দ্বীপ জেলা ভোলা সদরের দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর সেই গ্রামের আজহার আলী ও ফাতেমা খানমের ঘরে আসেন তিনি।

ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে ১৯৬০ সালে তৎকালীন ম্যাট্রিকুলেশন পাসের পর ভর্তি হন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে। সেখান থেকে ১৯৬২ সালে আইএসসি এবং ১৯৬৪ সালে বিএসসি সম্পন্ন করেন।

সে বছরই তিনি ভোলা শহরের আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন। তাদের একমাত্র সন্তান তাসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী পেশায় চিকিৎসক।

ব্রজমোহন কলেজে স্নাতক শেষে তোফায়েল ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে; মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেন।

তিনি ১৯৬৪ সালে তৎকালীন ইকবাল হল (শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, পরের বছর মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহসভাপতি এবং ১৯৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন।

১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি থাকাকালে চারটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা কর্মসূচি ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন তোফায়েল।

উনসত্তরেই তোফায়েল আহমেদ ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ডাকসুর ভিপি থাকাকালে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহচর্যে আসেন।

পরের বছরের ২ জুন শেখ মুজিবের নির্দেশে তোফায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি শুরু করেন। সে বছর ভোলার দৌলতখান-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধে ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চলভিত্তিক চার প্রধানের একজন ছিলেন তোফায়েল। তিনি ছিলেন বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া ও পাবনা সমন্বয়ে গঠিত দক্ষিণাঞ্চলীয় কমান্ডের দায়িত্বে।

মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম সংগঠক তোফায়েল স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন। এর মধ্যে ১৯৭৩ সালে ভোলা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। পঁচাত্তরের ২৫ জানুয়ারি দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার চালু হলে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় ‘রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী’ নিযুক্ত হন তোফায়েল।

সে বছরই বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল গঠিত হলে এর যুব সংগঠন ‘জাতীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি।

১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরপরই তোফায়েলকে গৃহবন্দি করা হয়। পরে পুলিশ কন্ট্রোল রুম এবং রেডিও অফিসে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, রাখা হয় ময়মনসিংহ কারাগারের কনডেম সেলে। পরে কুষ্টিয়া কারাগারে তাকে স্থানান্তর করা হয়। তখন দীর্ঘ ৩৩ মাস তিনি কারাগারে ছিলেন।

কুষ্টিয়া কারাগারে থাকা অবস্থায় ১৯৭৮ সালে তোফায়েল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করে সামরিক শাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখেন।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তোফায়েল আহমেদ শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং ২০১৪ সাল থেকে থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

তোফায়েল আহমেদ নৌকা প্রতীক নিয়ে মোট ১২ বার নির্বাচন করেছেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে প্রথম ভোটে বিজয়ী এ রাজনীতিক ৮০ বছর বয়সেও জয়ের মুখে দেখেছেন। ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি নৌকা প্রতীকেই জয় পান।

সবমিলিয়ে তিনি নয়বার এমপি হয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে— ১৯৭০-এ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ, ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন।

রাজনীতির নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে তোফায়েল ১৯৯২ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন, যে পদে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘ ১৮ বছর।

তোফায়েল ২০১০ সালে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য হন, যে পদেই ছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

বলা হয়, ২০০৭-০৮ সময়ে সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের সংস্কারের পক্ষে মত দিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের বিরাগভাজন হয়েছিলেন তোফায়েল। সে কারণে ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তাতে মন্ত্রিসভায় নেননি শেখ হাসিনা। অবশ্য পরে ২০১৪-২০১৯ মেয়াদের সরকারে তাকে আবার মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব দেন।

বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচএইচ/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ