ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬ , ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মা-দাদিকে হারিয়ে বাবার সাথেই পথে পথে ছুটছে

ভ্যানে বসেই কাটে লামিয়ার শৈশব

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১৯-০৫-২০২৬ ০১:৫৪:৪৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১৯-০৫-২০২৬ ০১:৫৪:৪৫ অপরাহ্ন
ভ্যানে বসেই কাটে লামিয়ার শৈশব ছবি : সংগৃহীত
শিশু লামিয়া আক্তারের বয়স মাত্র ছয় বছর। এখনও ঠিকমতো পৃথিবীটাকেই চিনে উঠতে পারেনি। ‘মা’ শব্দটার গভীরতা বোঝার আগেই হারিয়েছে মাকে। এরপর যে দাদির আঁচলে একটু একটু করে বড় হয়ে উঠছিল, তাকেও কেড়ে নিয়েছে মৃত্যু। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাই খুব ছোট বয়সেই তাকে শিখিয়ে দিয়েছে সংগ্রাম কাকে বলে।

বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বড়াকোঠা ইউনিয়নের গড়িয়া গ্রামের ভ্যানচালক আল মাহমুদের মেয়ে লামিয়া এখন স্থানীয়দের কাছে এক মানবিক গল্পের নাম।

জানা গেছে, লামিয়ার বয়স যখন মাত্র এক বছর, তখন অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তার মা রেখা বেগম। এরপর দদি মনোয়ারা বেগমের কাছেই বড় হতে থাকে শিশুটি। কিন্তু নিয়তির নির্মমতায় তিন বছর বয়সে দাদিকেও হারাতে হয় তাকে। ২০২৩ সালের শুরুতে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান দাদি।

এরপর থেকে লামিয়ার একমাত্র আশ্রয় হয়ে ওঠেন বাবা আল মাহমুদ। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন ভোরে ব্যাটারিচালিত ভ্যান নিয়ে বের হন তিনি। আর বাবার পাশেই সারাদিন থাকে ছোট্ট লামিয়া।

সকালে বাবার সঙ্গে বের হওয়া, রাস্তায় বসেই খাবার খাওয়া, কখনও ভ্যানে একটু ঘুমিয়ে নেওয়া- এভাবেই কাটছে তাদের দিন। রাতে ভাড়ার ভ্যান গ্যারেজে জমা দিয়ে জরাজীর্ণ টিনের ছাপড়া ঘরে ফিরে ঘুমায় বাবা-মেয়ে।

আল মাহমুদ বলেন, লামিয়ার বয়স যখন এক বছর, তখনই ওর মা মারা যায়। পরে দাদির কাছে বড় হচ্ছিল। কিন্তু তিন বছর বয়সে দাদিও ক্যান্সারে মারা যায়। এখন আমার কাছে লামিয়া ছাড়া আর কেউ নাই। 

তিনি বলেন, তিন বছর বয়স থাইকাই ওরে লগে লইয়া কামে বাইর হই। আগে মিশুক চালাইতাম, এহন ভ্যান চালাই। মাইয়াডারে একা ঘরে রাইখা যাওনের সাহস পাই না। চারদিকে কত ঘটনা শুনি- শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, খুন। তাই সবসময় লগেই রাহি। ভ্যান চালিয়ে প্রতিদিন ২০০ টাকা জমা দেওয়ার পর যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোরকমে চলে বাবা-মেয়ের সংসার। কখনও হোটেলে খেয়ে নেন, আবার কখনও এক সের চাল আর আলু কিনে ঘরে রান্না করেন।

এদিকে বাবার সঙ্গে থাকতে থাকতে ছোট্ট লামিয়াও শিখে গেছে ভ্যান চালানো। মাঝেমধ্যেই বাবাকে বিশ্রাম দিয়ে নিজেই হ্যান্ডেল ধরে বসে। শিশু লামিয়া বলে, ভ্যান চালাইতে পারি। তয় মুই এহন স্কুলে যাই, পড়াশোনা করতে চাই।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে স্থানীয় চৌমোহনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে লামিয়া। দারিদ্র্য আর সংগ্রামের মাঝেও মেয়েকে লেখাপড়া শেখানোর স্বপ্ন দেখেন বাবা আল মাহমুদ।

স্থানীয়রা জানান, ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে ভ্যানে ঘুরে বেড়ায় লামিয়া। এখন সে একাই ভ্যান চালাতে পারে। বাজারে প্রায়ই বাবা-মেয়েকে এক সঙ্গে দেখা যায়। সমাজের একটু সহযোগিতা পেলে হয়তো ছোট্ট লামিয়ার জীবনটা বদলে যেতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা বলেন, বিষয়টি জানার পর আমরা খোঁজখবর নিয়েছি। বর্তমানে ২০ দিনের খাবার পাঠানো হয়েছে। শিশুটির পড়াশোনা ও পরিবারের জন্য কী ধরনের সহযোগিতা করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা করছি। শিশুটির পড়াশোনার বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে খোঁজ নিতে বলা হয়েছে। আমরা চাই লামিয়ার জন্য একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে সেখানে তার ভবিষ্যতের জন্য কিছু টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করা হোক। পাশাপাশি তার বাবাকে একটি ভ্যান কিনে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে, যদি তিনি ভ্যান বিক্রি না করার শর্তে রাজি হন।

বরিশাল জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক এ কে এম আখতারুজ্জামান তালুকদার বলেন, উজিরপুরের একটি শিশু বাবার ভ্যান চালায় এরকম একটি সংবাদ শুনেছি। বিষয়টি জানতে উপজেলা সমাজসেবা অফিসারকে বলব। খোঁজ নিয়ে অসহায় লামিয়া ও তার বাবার জন্য সমাজ সেবা অধিদপ্তর থেকে সহযোগিতার বিষয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা করব।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ