এপ্রিলেই ঝরল ৫১০ প্রাণ: ‘মৃত্যুমিছিল’ থামাতে আমূল সংস্কারের দাবি
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
১৩-০৫-২০২৬ ০১:২২:০৪ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
১৩-০৫-২০২৬ ০২:২৬:৫৫ অপরাহ্ন
দেশের সড়ক যেন এখন এক অনিয়ন্ত্রিত মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। শুধু গেল এপ্রিল মাসেই দেশের রাজপথে ঝরেছে ৫১০টি তাজা প্রাণ। প্রতিদিন গড়ে ১৭ জন মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আর ঘরে ফিরতে পারেননি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই ভয়াবহ চিত্র।
বুধবার (১৩ মে) সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে সাফ জানানো হয়েছে, বর্তমানের এই ‘অভিশপ্ত’ পরিবহন ব্যবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে সেক্টরটি আপদমস্তক সংস্কার করা এখন সময়ের দাবি।
রক্তাক্ত এপ্রিল: পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা
যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের তথ্যানুযায়ী, এপ্রিল মাসে দেশে মোট ৫২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫১০ জন নিহত এবং ১২৬৮ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে রেলপথে ৫৪টি দুর্ঘটনায় ৪৯ জন এবং নৌপথে ৫টি দুর্ঘটনায় ৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। অর্থাৎ সড়ক, রেল ও নৌ মিলিয়ে এক মাসেই দেশের যাতায়াত ব্যবস্থায় মোট ৫৬৩ জনের সলিল সমাধি ঘটেছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে। গত মাসে ১৩৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৪২ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ২৭ শতাংশ। বিভাগীয় হিসেবে সবচেয়ে বেশি রক্তক্ষরণ হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে; যেখানে ১৩৫টি দুর্ঘটনায় ১৩৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ বিভাগে।
কাদের রক্তে রঞ্জিত হলো রাজপথ?
প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সড়কে প্রাণ হারানোদের তালিকায় সমাজের সব স্তরের মানুষই রয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন: ৯৯ জন চালক ও ২৫ জন পরিবহন শ্রমিক। ৮২ জন পথচারী, ৫২ জন নারী এবং ৪৭ জন শিশু। ৫৬ জন শিক্ষার্থী ও ৫ জন শিক্ষক। এছাড়াও ৩ জন চিকিৎসক, ১ জন সাংবাদিক, ১ জন আইনজীবী এবং ১ জন পুলিশ ও ১ জন বিমানবাহিনীর সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা প্রাণ হারিয়েছেন।
কেন থামছে না এই মিছিল?
যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে সড়কের এই বিশৃঙ্খলার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ উঠে এসেছে:
১. মহাসড়কে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিক্সার অবাধ বিচরণ।
২. রোড সাইন, রোড মার্কিং এবং পর্যাপ্ত সড়কবাতির অভাব।
৩. উল্টোপথে গাড়ি চালানো এবং ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহনের দাপট।
৪. চালকদের দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো এবং বেপরোয়া গতির প্রতিযোগিতা।
৫. সড়কের নির্মাণ ত্রুটি এবং মোড়গুলোতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা।
সমাধানের পথ: ‘আমলাতন্ত্র নয়, চাই বিশেষজ্ঞ নিয়ন্ত্রণ’
সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এই খাতের সংস্কার দাবি করেছেন। তিনি বলেন, “পরিবহন সেক্টর পরিচালনার বর্তমান পদ্ধতি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে পড়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে বেরিয়ে এসে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের হাতে এই খাতের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিতে হবে।”
প্রতিবেদনে দুর্ঘটনারোধে ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
১. সড়কে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং স্মার্ট ভাড়া পদ্ধতি চালু করা।
২. বিআরটিএ-র ফিটনেস প্রদান পদ্ধতি ডিজিটাল করা এবং প্রশিক্ষণ ছাড়া লাইসেন্স বন্ধ করা।
৩. পরিবহন খাতে মালিক সমিতির একচেটিয়া আধিপত্য ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা।
৪. চালকদের সুনির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করা।
৫. গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে সার্ভিস লেন এবং পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা রাখা।
শেষ কথা
দেশের সড়কগুলো কি কেবলই লাশের পাহাড় জমানোর জন্য? এই প্রশ্ন এখন সর্বসাধারণের। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, সংবাদপত্রে যে হতাহতের চিত্র উঠে এসেছে, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হতে পারে। পরিবহন খাতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনা দূর করতে নতুন সরকার পুরোনো পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসবে—এমনটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। সংস্কার না হলে, এই মৃত্যুর মিছিল থামানো যে অসম্ভব, তা এপ্রিলের এই রক্তক্ষয়ী পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে।
বাংলা স্কুপ/প্রতিবেদক/এইচএইচ/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স