ঢাকা , মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬ , ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যশোরে ভর্তুকিতে কেনা ৮১ কম্বাইন হারভেস্টারের অর্ধেক উধাও

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ১২-০৫-২০২৬ ০৩:১০:০৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১২-০৫-২০২৬ ০৩:১০:০৮ অপরাহ্ন
যশোরে ভর্তুকিতে কেনা ৮১ কম্বাইন হারভেস্টারের অর্ধেক উধাও ছবি : সংগৃহীত
যশোরের মাঠে মাঠে এখন পুরোদমে চলছে বোরো ধান কাটার উৎসব। কিন্তু ধান কাটার মৌসুমজুড়ে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও বৃষ্টি হওয়ায় পানিতে ভাসছে পাকা ধান। কৃষকের মুখে হাসির বদলে জমছে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। 

এমন পরিস্থিতিতে ফসল দ্রুত ঘরে তুলতে আধুনিক কৃষিযন্ত্রের প্রয়োজনীয়তা বাড়লেও মাঠে মিলছে না প্রত্যাশিত সুবিধা। সরকারি ভর্তুকিতে কেনা ৮১টি কম্বাইন হারভেস্টার কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে যশোরে ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র ৪১টি। বাকি ৪০টি মেশিন হয় অকেজো, নয়তো অন্য জেলায় নিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে যশোরের আট উপজেলায় ৮১টি কম্বাইন হারভেস্টার সরবরাহ করা হয়। প্রতিটি মেশিনের দাম প্রায় ৪০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ১৫ লাখ টাকা এবং কৃষকদের বহন করতে হয়েছে ২৫ লাখ টাকা।

যশোর কৃষি অফিসের তথ্যমতে, জেলার ৮১টি মেশিনের মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে ৪১টি। বাকি ৪০টি হাওরাঞ্চলসহ অন্য জেলায় নিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে যশোরের জন্য কেনা প্রায় অর্ধেক মেশিনই এখন জেলার বাইরে।

উপজেলাভিত্তিক তথ্যে দেখা গেছে, যশোর সদর উপজেলার ১২টির মধ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে ৫টি, চৌগাছায় ১৬টির মধ্যে ১০টি, বাঘারপাড়ায় ১৩টির মধ্যে ৯টি, শার্শায় ১১টির মধ্যে ৯টি, মনিরামপুরে ৮টির মধ্যে ২টি এবং ঝিকরগাছায় ১৬টির মধ্যে ৬টি মেশিন। তবে কেশবপুরের একটি ও অভয়নগরের চারটি মেশিনের কোনোটিই সংশ্লিষ্ট উপজেলায় ব্যবহৃত হচ্ছে না।

অভয়নগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লাভলী খাতুন বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, আমাদের এলাকায় যে চারটি কম্বাইন হারভেস্টার ছিল, সেগুলো এখন অন্য এলাকায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি প্রকৌশলী সুজাউল হক জানান, এবার জেলায় এক লাখ ৫৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ১০ মে পর্যন্ত কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। প্রতিটি মেশিন ঘণ্টায় প্রায় এক একর জমির ধান কাটতে সক্ষম। 

তবে কৃষকদের দাবি, কৃষিকে আধুনিকায়ন, শ্রম-সংকট মোকাবিলা ও উৎপাদন ব্যয় কমানোর উদ্দেশ্যে সরকার প্রকল্পটি চালু করলেও যশোর অঞ্চলে তা কার্যকর হয়নি।

মেশিন মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত কাজ না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে অন্য জেলায় মেশিন নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু পরিবহন ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেখানে গিয়েও লোকসান গুনতে হচ্ছে।

বাঘারপাড়ার কৃষক ফিরোজ হাসান বলেন, এই মেশিন বড় জমির জন্য ভালো হতে পারে। কিন্তু আমাদের এখানে জমি ছোট ছোট, তাই ব্যবহার করা কঠিন। আবার এই মেশিনে ধান কাটলে বিচালি পাওয়া যায় না।

চৌগাছার বাড়িয়ালী গ্রামের কৃষক ও হারভেস্টার মালিক হারুণ অর রশিদ বলেন, সরকার ভর্তুকিতে যে মেশিন দিয়েছে, তা আমাদের অঞ্চলের জন্য উপযোগী নয়। মেশিন প্রচুর নষ্ট হয়। এই মেশিন কিনে আমি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।

মাঠপর্যায়ের কৃষকেরা জানান, তারা শুধু ধানের জন্য নয়, গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত বিচালির জন্যও ধান চাষ করেন। কিন্তু অনেক কম্বাইন হারভেস্টারে বিচালি নষ্ট হয়ে যায়।

ঝিকরগাছার কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের কাছে বিচালিও সোনার ফসল। কিন্তু হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটলে সেই বিচালি নষ্ট হয়ে যায়।

এ বিষয়ে কৃষি প্রকৌশলী সুজাউল হক বলেন, কম্বাইন হারভেস্টার সরবরাহ বা ক্রয় প্রক্রিয়ায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা ছিল না। প্রকল্পের মাধ্যমে সরাসরি কোম্পানি থেকে কৃষকদের কাছে মেশিন সরবরাহ করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কম্বাইন হারভেস্টার দুই ধরনের- ফুল ফিড ও হেড ফিড। হেড ফিড মেশিনে বিচালি নষ্ট হয় না। যশোর অঞ্চলের জন্য মূলত ওই ধরনের মেশিনই বেশি উপযোগী।
 
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ