ঢাকা , রবিবার, ১০ মে ২০২৬ , ২৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফোনে বলছে ‘পুরস্কার জিতেছেন’? এক চাপেই খালি হতে পারে বিকাশ-নগদ অ্যাকাউন্ট

আপলোড সময় : ১০-০৫-২০২৬ ০১:৪৯:৩২ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ১০-০৫-২০২৬ ০১:৪৯:৩২ অপরাহ্ন
ফোনে বলছে ‘পুরস্কার জিতেছেন’? এক চাপেই খালি হতে পারে বিকাশ-নগদ অ্যাকাউন্ট ফাইল ছবি
“অভিনন্দন! আপনি একটি বিশেষ পুরস্কার জিতেছেন। পুরস্কার নিতে ১ চাপুন, কাস্টমার কেয়ারে কথা বলতে ৩ চাপুন”— সাম্প্রতিক সময়ে এমন “স্বয়ংক্রিয় ফোন কল” পাচ্ছেন দেশের হাজারো মোবাইল ব্যবহারকারী। প্রথমে নিরীহ বা আকর্ষণীয় মনে হলেও, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন— এটি ভয়ংকর সাইবার প্রতারণার নতুন ফাঁদ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কলের উদ্দেশ্য হলো ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া, মোবাইল অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করা কিংবা মোবাইল ব্যাংকিং সেবার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া। অসতর্ক হয়ে কেউ যদি নির্দেশনা অনুসরণ করেন, তাহলে মুহূর্তের মধ্যেই মোবাইল ব্যালান্স, বিকাশ, নগদ, রকেট বা উপায়ের মতো আর্থিক সেবার অ্যাকাউন্ট ঝুঁকিতে পড়ে যেতে পারে।

কীভাবে কাজ করে এই প্রতারক চক্র?

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতারক চক্র সাধারণত রেকর্ড করা ভয়েস ব্যবহার করে হাজার হাজার নম্বরে একযোগে কল পাঠায়। কল রিসিভ করলে শোনানো হয়— গ্রাহক লটারিতে পুরস্কার জিতেছেন, বিশেষ অফার পেয়েছেন অথবা তার মোবাইল নম্বর নির্বাচিত হয়েছে।

এরপর বিভিন্ন অপশন চাপতে বলা হয়। কেউ যদি ১, ২ বা ৩ চাপেন, তখন প্রতারকরা বুঝে যায় নম্বরটি সক্রিয় এবং ব্যবহারকারী প্রতিক্রিয়া দিচ্ছেন। পরে তারা সরাসরি ফোন করে নিজেদের মোবাইল অপারেটর, ব্যাংক কর্মকর্তা, কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধি কিংবা সরকারি সংস্থার লোক পরিচয় দেয়।

অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীর কাছে ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড (ওটিপি), পিন নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য বা মোবাইল ব্যাংকিং সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়। আবার কখনও ভুয়া অ্যাপ ইনস্টল করিয়ে ফোনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টাও করা হয়।

কল ব্যাক করাও ঝুঁকিপূর্ণ

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু কল রিসিভ করাই নয়, অপরিচিত নম্বরে কল ব্যাক করাও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কিছু আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্র এমন নম্বর ব্যবহার করে যেখানে কল ব্যাক করলেই অতিরিক্ত চার্জ কেটে নেওয়া হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে কল ব্যাকের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর নম্বর সক্রিয় হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং পরে আরও বড় প্রতারণার টার্গেট বানানো হয়।

মোবাইল ব্যাংকিং গ্রাহকেরা বেশি ঝুঁকিতে

বর্তমানে দেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। কোটি কোটি মানুষ বিকাশ, নগদ, রকেট ও উপায়ের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করছেন। এই সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছে প্রতারক চক্র।

তারা সাধারণ মানুষের প্রযুক্তিগত অজ্ঞতা, ভয় বা লোভকে ব্যবহার করে অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে। অনেকেই বুঝতে না পেরে নিজের অজান্তেই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে দেন। ফলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই অ্যাকাউন্ট খালি হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্কতা

সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো মোবাইল অপারেটর, ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান কখনও ফোন করে পিন, ওটিপি বা গোপন তথ্য জানতে চায় না। কেউ এমন দাবি করলে সেটিকে প্রতারণা হিসেবে ধরে নিতে হবে।

তারা গ্রাহকদের প্রতি কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন— পুরস্কার, লটারি বা অফারের নামে আসা সন্দেহজনক কল এড়িয়ে চলুন; অচেনা নম্বরে কোনো অপশন চাপবেন না; অপরিচিত নম্বরে কল ব্যাক করবেন না; ফোনে কোনো ওটিপি, পিন বা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করবেন না; সন্দেহজনক অ্যাপ বা লিংক ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন; প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানান।

ভেতরের তথ্য ফাঁসের অভিযোগ

অনেক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, প্রতারকরা কখনও কখনও গ্রাহকের নাম, আংশিক ব্যক্তিগত তথ্য বা লেনদেনের কিছু তথ্য জানে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে, কিছু অসাধু ব্যক্তি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকে তথ্য পাচার করছে। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনও প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে দায়ী করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষায় মোবাইল অপারেটর, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা

প্রযুক্তি যত এগোচ্ছে, প্রতারণার কৌশলও তত আধুনিক হচ্ছে। তাই শুধু প্রযুক্তি নয়, ব্যবহারকারীর সচেতনতাকেও সবচেয়ে বড় সুরক্ষা হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, “ফোনে পুরস্কার জেতার খবর শুনে উত্তেজিত না হয়ে সতর্ক হতে হবে। কয়েক সেকেন্ডের অসতর্কতায় জীবনের সঞ্চয় হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”

বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন 


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স

প্রতিবেদকের তথ্য



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ