১০ কারণে ভেঙে পড়ল মমতার সাম্রাজ্য
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
০৪-০৫-২০২৬ ০৮:২৪:১৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০৪-০৫-২০২৬ ০৮:২৪:১৫ অপরাহ্ন
ছবি: সংগৃহীত
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন পর তৃণমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো রাজ্যে ক্ষমতায় আসতে পারে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, টিএমসির তুলনায় বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে বিজেপি। ফলে কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তৃণমূল এত বড় পরাজয়ের মুখে—তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
এই প্রতিবেদনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্ভাব্য পরাজয়ের প্রধান কারণগুলো তুলে ধরা হলো, যা রাজ্যে তাঁর অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কয়েক সপ্তাহের জোরালো প্রচারণার পর মনে করা হচ্ছে, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যাচ্ছে। প্রাথমিক প্রবণতা অনুযায়ী, বিজেপি ১৯১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে, যেখানে টিএমসি প্রায় ৯৭টি আসনে পিছিয়ে। ২৩৪টি আসনের ভোট গণনা ৪ মে সকাল ৮টায় শুরু হয়। এর আগে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়, যার সময় রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনাও ঘটে।
প্রবণতা অনুযায়ী, বিজেপি প্রথমবারের মতো বাংলায় সরকার গঠন করতে পারে এবং তৃণমূল কংগ্রেসের টানা চতুর্থবার ক্ষমতায় আসার পথ রুদ্ধ হতে পারে।
এদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দলীয় কর্মীদের উদ্দেশ্যে এক জরুরি বার্তায় ভোট গণনা কেন্দ্র না ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, গণনায় কারচুপি, তথ্য গোপন এবং প্রশাসনিক অপব্যবহার করা হচ্ছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সম্ভাব্য পরাজয়ের প্রধান কারণ
১. সরকারবিরোধী মনোভাব
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) গত ১৫ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গ শাসন করে আসছে। দলটি ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১ সালে টানা তিনবার নির্বাচনে জয়লাভ করে। তবে ২০২৬ সালের নির্বাচনে দলটি হারের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দীর্ঘদিন একই সরকারের অধীনে থাকার ফলে ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা এবং এক ধরনের ক্লান্তি তৈরি হয়েছে।
২. ধর্মীয় মেরুকরণের বিতর্ক
নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি অভিযোগ করেছে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনামলে হিন্দুদের প্রতি অবহেলা করা হয়েছে এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় মেরুকরণ বেড়েছে এবং তা নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
৩. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অপরাধ
গত কয়েক বছরে সহিংসতা ও অপরাধ বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে আর জি কর মেডিকেল কলেজের এক চিকিৎসকের ধর্ষণের ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে। বিরোধীরা এই ঘটনাকে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করে।
৪. দুর্নীতির অভিযোগ
দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূল কংগ্রেস দুর্নীতির অভিযোগের মুখে রয়েছে। দলের একাধিক শীর্ষ নেতা বিভিন্ন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছেন। সাবেক মন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জীর স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি) নিয়োগ কেলেঙ্কারি এবং অনুব্রত মণ্ডলের গবাদি পশু পাচার মামলার মতো ঘটনাগুলো সরকারের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
৫. অর্থনীতি ও শিল্পক্ষেত্রে চাপ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সালের পর থেকে প্রায় ৬,৬০০-এর বেশি সংস্থা, যার মধ্যে ১১০টি তালিকাভুক্ত কোম্পানিও রয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। শিল্পপতিদের মতে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও সহিংসতার আশঙ্কা বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া রাজ্যের ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় আর্থিক চাপও বেড়েছে।
৬. নারী ভোটারদের ভূমিকা
বিজেপির দাবি, এই জয়ে ‘নারী শক্তি’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নারীদের জন্য সংরক্ষণসহ বিভিন্ন উদ্যোগ জনমনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, গত ২০২১ সালের তুলনায় এবার নারী ভোট প্রায় ৫% বেশি বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে।
৭. সরকারি কর্মচারীদের অসন্তোষ
দীর্ঘদিনের ডিএ বকেয়া এবং সপ্তম পে-কমিশন কার্যকর না হওয়ায় সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। অমিত শাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম পে-কমিশন চালু করা হবে। এছাড়া শূন্যপদ পূরণের আশ্বাস তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে।
৮. উন্নয়ন ইস্যু ও প্রচারণা কৌশল
নির্বাচনী প্রচারে ‘উন্নয়ন বনাম অনুন্নয়ন’ ইস্যুকে সামনে আনা হয়। কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা জনগণের কাছে না পৌঁছানো এবং শিল্প পরিকাঠামোর ঘাটতিকে বড় করে দেখানো হয়। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে চালানো প্রচারণা ইতিবাচক ফল দিয়েছে।
৯. নিরাপত্তা ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি
নির্বাচনী সহিংসতার ইতিহাস বিবেচনায় এবার রেকর্ড সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়। এতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে বিজেপি মনে করছে।
১০. ভোটার তালিকা সংশোধন ও বিতর্ক
ভোটার তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে প্রায় ২৭ লাখ ‘ভুয়া’ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়। বিজেপির মতে, এতে নির্বাচন আরও স্বচ্ছ হয়েছে এবং প্রকৃত ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে।
বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচএইচ/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স