ঢাকা , সোমবার, ০৪ মে ২০২৬ , ২১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

​টিকে গ্রুপের জালিয়াতি

চিঠি দিয়ে দায় সারল কেজিডিসিএল, নিশ্চুপ বিপিডিবি

ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় : ০৪-০৫-২০২৬ ০৪:১৯:৪৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০৪-০৫-২০২৬ ০৪:১৯:৪৫ অপরাহ্ন
চিঠি দিয়ে দায় সারল কেজিডিসিএল, নিশ্চুপ বিপিডিবি
গ্যাসের চাপ কারসাজিতে টিকে গ্রুপের জালিয়াতি ধরা পড়ার পরও শুধু চিঠি দিয়ে দায় সেরেছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)। এদিকে চিঠি পাওয়ার কয়েক মাস পরও নিশ্চুপ বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।

অথচ টিকে গ্রুপের ক্যাপটিভ গ্যাস সংযোগ অনুমোদনে সংঘবদ্ধ গ্রুপের জালিয়াতির বিষয়টি স্পষ্ট। যার এনওসি দেওয়ার ক্ষমতা নেই, তিনি দিয়েছেন ভুয়া এনওসি। আবার যা গ্রহণ করার সুযোগ নেই সেই চিঠি গ্রহণ করে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে ফাইল।

এমন জালিয়াতি সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠন, দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। অথচ তার কোনো নাম নিশানা দেখা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের ওই জালিয়াতি ধামাচাপা দিতে তৎপর দেখা যাচ্ছে অনেককে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র যখন বেকার বসে থাকছে, অন্যদিকে ক্যাপটিভ বিদ্যুতের সংযোগ থামানো যাচ্ছে না। তখন ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়ে পরিপত্র (২০২১ সাল ৩১ আগস্ট) জারি করা হয়। এতে ১০ মেগাওয়াটের বেশি ক্যাপটিভ বিদ্যুতের সংযোগ পেতে হলে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির পূর্বানুমতি বাধ্যতামূলক করা হয়।

সেই এনওসি না পেয়ে অন্ধকার পথ ধরে টিকে গ্রুপ।

ফৌজদারহাট বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের এখতিয়ার না থাকলেও তাদের নামে এনওসি দাখিল করা হয়। কথিত রয়েছে এর পেছনে একটি বিশাল সিন্ডিকেট কাজ করেছে, যারা কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে ফাইলটি অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন।

২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কেজিডিসিএলের ১৬৯তম বোর্ডসভায় টিকে গ্রুপের প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী স্টিল মিলস লিমিটেডের ১৬.৮ মেগাওয়াট ক্যাপটিভ বিদ্যুতের গ্যাস সংযোগ অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. আনিসুর রহমান।

আনিসুর রহমান গণঅভ্যুত্থানে পলাতক শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

অবসরের পর যাকে প্রাইজ পোস্টিং হিসেবে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের রাতের ভোটের অন্যতম কুশীলব বলে বিবেচনা করা হয় তাকে। গ্যাস ঘাটতির কারণে প্রবল আপত্তির মধ্যেও আনিসুর রহমানের চাপে ভুয়া কাগজপত্রের বিপরীতে সংযোগটি অনুমোদন করা হয়েছিল তখন।

২০২৫ সালের ১৫ জুলাই এনওসি প্রদানকারী আসাদুজ্জামানের সঙ্গে কথা হয়। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ফৌজদারহাট বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলাম। তারপর বদলি করে বরফকুন্ডে পোস্টিং দেওয়া হয়। আমিতো ফৌজদারহাটে নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করিনি, সে কারণে ২০২০ সালে স্বাক্ষর দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।’

গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর তদন্ত কমিটির কাছে ভিন্ন তথ্য দেন প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির এক চিঠির জবাবে প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান লিখেছেন, কর্ণফুলী স্টিল মিলসের (বড় কুমিরা সীতাকুন্ড) অনুকূলে যে পত্র দেওয়া হয়েছে, তা ক্যাপটিভ বিদ্যুতে গ্যাস সংযোগের উদ্দেশে প্রদান করা হয়নি। এটি ক্যাপটিভ বিদ্যুতে গ্যাস সরবরাহের কোনো এনওসি নয়।

পরে আবার তার সঙ্গে কথা বলে। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমিতো ক্যাপটিভ বিদ্যুতের জন্য চিঠি দেইনি। চিঠিতে কোথাও ক্যাপটিভের কথা লেখা নেই। আর ওই চিঠি এখন আর ভ্যালিড (কার্যকর) নেই। ওই চিঠি দিয়ে তারা গ্যাস সংযোগ নিতে পারবে না। ভাই বিষয়টি নিয়ে ঘাটাঘাটি না করলে হয় না!’

প্রকৌশলী আসাদুজ্জামানের চিঠির পর সংঘবদ্ধ জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ্য হয়ে পড়ে। এরপর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান বরাবরে চিঠি দেয় কেজিডিসিএল। কয়েক মাস গত হলেও সেই চিঠির কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে নিশ্চিত করেছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সালাউদ্দিন।

তিনি বলেন, সংযোগ অনুমোদন হলেও কার্যকর করা হয়নি। বিপিডিবির জবাবের ওপর নির্ভর করছে পরবর্তী পদক্ষেপ।

টিকে গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার হাসিবুল ইসলাম হাসিব বলেছেন, ‘এখানে আমার কোনো দোষ নেই। সব নিয়ম মেনে আবেদন করি। লোকাল অফিসের এনওসি দেওয়ার এখতিয়ার আছে কি-না আমরা জানব কি করে। আমাদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দরকার, তারা দিতে পারছিল না। এতে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হতো, একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে ফের চালু করতে ২৪ ঘণ্টা সময় প্রয়োজন হয়। যে কারণে ক্যাপটিভের আবেদন করি।’

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির একজন সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ক্যাপটিভ বিদ্যুতের গ্যাস সংযোগ পেতে জালিয়াতির নতুন নজির সৃষ্টি করেছে টিকে গ্রুপ। আমার সময়ে তাদের অনেক ভুয়া কাগজ ধরেছিলাম। তাদের কাগজপত্র যাচাই করলে আরও অনেক জালিয়াতি পাওয়া যাবে। তারা আগের সরকারের সময়ে জ্বালানি উপদেষ্টার (তৌফিক ই-ইলাহী চৌধুরী) দফতর থেকে নানা বিষয়ে চাপ প্রয়োগ করতো।’

টিকে গ্রুপের জালিয়াতির কিছুটা নজির পাওয়া যায় গ্যাসের চাপ কারসাজিতে। তাদের সামুদা কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে গ্যাসের চাপ জালিয়াতির মাধ্যমে ১৩ কোটি ৭২ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ওই টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কেজিডিসিএল।

২০১৮ সালের ২২ জুলাই ডিজিটাল ডাটাবেজড তৈরির সময় পরস্পর যোগসাজসে প্রেসার ফ্যাক্টর ২.৬২৯ এর আলোকে বিল ইস্যু করা হয়। এতে করে ২০১৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে সরবরাহকৃত গ্যাসের সঠিক পরিমাণে বিল আদায় হয়নি। প্রতি মাসে প্রায় ২০ লাখ টাকার মতো বিল কম জমা দিয়েছে সামুদা কেমিক্যাল।

প্রেসার জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে টিকে গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার হাসিবুল ইসলাম হাসিব বলেন, ‘বিষয়টি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে বিচারাধীন থাকায় এখন কোনো মন্তব্য করতে পারছি না।’

বাংলা স্কুপ/ডেস্ক/এইচএইচ/এসকে


প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স



 

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ