গ্যাসের দ্বীপেও অন্ধকার
৯ মাস ধরে অচল ভোলার ৩৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র
স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় :
২৫-০৪-২০২৬ ০৭:০৬:২৮ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
২৫-০৪-২০২৬ ০৭:০৬:২৮ অপরাহ্ন
সংবাদচিত্র: সংগৃহীত
প্রাকৃতিক গ্যাস সমৃদ্ধ দ্বীপজেলা ভোলা সদরের খেয়াঘাটে স্থাপিত গ্যাসভিক্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সাড়ে ৩৪ মেগাওয়াটের রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টটি মুখ থুবড়ে পড়ে আছে গত ৯ মাস ধরে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ থাকায় ঘনঘন লোডশেডিংয়ে মারাত্মকভাবে ব্যহত হচ্ছে এখানকার জনজীবন ও ব্যবসা বাণিজ্য। সম্প্রতি বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় দুর্ভোগ বেড়েছে বহুগুনে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, লোডশেডিংয়ের সমস্যা সমাধানে প্ল্যান্টটি চালুর ব্যাপারে নেই সংশ্লিষ্টদের তোরজোড়। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় প্ল্যান্টটি ফের চালু করা যাচ্ছে না।
সরেজমিনে বন্ধ থাকা বিদ্যুৎ প্ল্যান্টটি ঘুরে জানা যায়, ২০০৯ সালের ১২ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যাত্রা শুরু করে বেসরকারি কোম্পানি ভেঞ্জার এনার্জি রিসোর্সেস লিমিটেডের সাড়ে ৩৪ মেগাওয়াটের গ্যাসভিক্তিক এই বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি। এরপর বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ মেগাওয়াটে। বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে এ প্ল্যান্টটি থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে ভোলা সদর উপজেলায় ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহ করতো ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড ও ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। সর্বশেষ চার বছর মেয়াদের চুক্তি শেষ হয় ২০২৫ সালের ১২ জুলাই, নতুন করে চুক্তি না হওয়ায় এরপর থেকে পুরোপুরি বন্ধ গ্যাসভিক্তিক এ বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট।
আরও জানা যায়, শুরুর দিকে ভোলা সদর উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে এখান থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো ৩৩ কেভির লাইনের মাধ্যমে পটুয়াখালীতে জাতীয় গ্রিডে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় ইতোমধ্যে এ বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের পাঁচটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটরের মধ্যে একটি বিকল হয়ে পড়ে আছে। ভোলা ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড ও ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানায়, প্ল্যান্টটি বন্ধ থাকায় সদর উপজেলার বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে বর্তমানে বিদ্যুৎ আনতে হচ্ছে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরের বোরহানউদ্দিনের জাতীয় গ্রিড থেকে। সেখানকার ২২০ ও ২২৫ মেগাওয়াটের দুটি গ্যাসভিক্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চাহিদা অনুযায়ী লোড না পাওয়ায় তাদের প্রায় ১ লাখ গ্রাহক লোডশেডিংয়ের সম্মুখীন হচ্ছেন। এ ছাড়া, চাহিদার বিপরীতে বোরহানউদ্দিন জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাচ্ছেন শতকরা প্রায় ৬৫ ভাগ। ভোলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ অন্য জেলায় নেওয়া হচ্ছে অথচ আমরা ভোলাবাসী ঠিকমত বিদ্যুৎ পাচ্ছি না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সদর উপজেলার বাসিন্দা মো. জামাল ও বিল্লাল। তারা বলেন, আমরা পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে কাজ করে সংসার চালাই। বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে প্রায়ই মিল বন্ধ থাকে, ডেলিভারি বন্ধ থাকে। আসলে আমাদের রোজকার বেতন আসে পণ্য ডেলিভারির ওপর নির্ভর করে। ঘণ্টার আগামাথায় প্রতিবার বিদ্যুৎ গেলে এক দেড়ঘণ্টা পর আসে, এতে আমরা ঠিকমতো উপার্জন করতে পারছি না। সারাদিনের পরিশ্রম শেষে বাড়িতে গিয়ে রাতে ঘুমানোর সময় বিদ্যুৎ থাকে না, আসে যায়।
বিদ্যুৎ প্ল্যান্টটি চালু থাকাকালীন ভোলা সদর উপজেলার মানুষ শান্তিতে ছিল জানিয়ে মো. অলিউর রহমান ও খোরশেদ বলেন, এটি বন্ধ হওয়ার পর থেকেই লোডশেডিং দেখা দিয়েছে, মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই। এই প্ল্যান্টটি ভালো, কেননা এটি গ্যাসে চলে। ভোলা গ্যাসসমৃদ্ধ জেলা, এখানে গ্যাসের সমস্যা নেই। একমাত্র সরকারের সুদৃষ্টিই পারে ভোলাবাসীর ভোগান্তি দূর করতে। ভোলায় দিন দিন লোডশেডিং বৃদ্ধি পাচ্ছে, এতে উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে জানিয়ে ভোলা বিসিক শিল্পনগরীর বৃহৎ খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স খান ফ্লওয়ার মিলের সত্ত্বাধিকারী ফাহিম খান বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুৎনির্ভর উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠান। দিনের বেলায় তিন-চারবার লোডশেডিংয়ের কবলে পড়তে হচ্ছে, প্রতিবার লোডশেডিংয়ে প্রায় এক ঘণ্টার ওপরে বিদ্যুৎহীন থাকতে হচ্ছে।
ফাহিম খান আরও বলেন, বিদ্যুতের নিয়ম হলো, বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পিক আওয়ার, এ সময় বিদ্যুতের বিল দিগুন। এ সময়ে পণ্য উৎপাদন করতে গেলে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়ে যায়। বিগত দিনে ওজোপাডিকো আমাদেরকে সদর উপজেলার খেয়াঘাটের সাড়ে ৩৪ মেগাওয়াটের রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতো, সেটি সচল না থাকায় আমরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছি না, সব মিলিয়ে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। সরকার চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করলে ভোলা খেয়াঘাটের সাড়ে ৩৪ মেগাওয়াটের গ্যাসভিক্তিক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টটি চালুর সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান ভেঞ্চার এনার্জি রিসোর্সেস লিমিটেডের ভোলার উপমহাব্যবস্থাপক মো. হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে এ পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে বিদ্যুৎ নিয়ে ভোলা সদর উপজেলায় ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহ করতো ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড ও ভোলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় প্ল্যান্টটি বন্ধ রয়েছে। চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য আমাদের কোম্পানির পক্ষ থেকে সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে। অতি দ্রুত সরকারের যথাযথ উদ্যোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ প্ল্যান্টটি ফের চালু হবে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাবেন ভোলাবাসী—এমন প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দাদের।
বাংলাস্কুপ/প্রতিনিধি/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স